ছোট্ট এক শিশুর বুকফাটা কান্না। পাশে বয়সে তার চেয়ে ছোট আরও দুটি শিশু। একটি ভ্যানগাড়ির ওপর পড়ে আছেন এক নারী, অচেতন। চারপাশে উৎসুক মানুষের ভিড়, তার মধ্যে একজন পুলিশ সদস্যকেও দেখা যাচ্ছে। আবেগঘন এই দৃশ্যের একটি ভিডিও কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক প্ল্যাটফর্মে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে।
ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, শরীয়তপুরের জাজিরায় এক নারীকে তাঁর সন্তানের সামনে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। পোস্টগুলোর ক্যাপশনে লেখা হচ্ছে, ‘দিনে-দুপুরে ছোট ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ করে হত্যা’। বিভিন্ন পোস্টের মন্তব্যের ঘরে জমা হচ্ছে আবেগঘন কথা। কেউ লিখেছেন, ‘দেশে বিচার নেই’, ‘জননিরাপত্তা ভেঙে পড়েছে’।
গত ২৪ মে ‘গুরুদাসপুর উপজেলা যুবলীগ’ নামে একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেটি ৩ লাখ ১৭ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে।
লিংক: এখানে
এই ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়, ‘এবার জাজিরায় দিনে-দুপুরে ছোট ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ করে হত্যা করলো দুর্বৃত্তরা। থানায় সামনে মার লাশ নিয়ে এসে বর্ণনা দিচ্ছে ছোট্ট শিশু! আহা দেশ, আহা প্রশাসন। কোন দেশে বাস করি আমরা, এখন সবাই নীরবতা পালন করছে...।’
‘নড়িয়া জামায়াত শিবির’ নামে একটি প্রোফাইলেও ভিডিওটি পোস্ট করা হয়, যেখানে প্রায় ২ লাখ ৯২ হাজার দেখা হয়েছে ভিডিওটি।
লিংক: এখানে
ভিডিওর ঘটনাটি সত্য বলে ধরে নিয়ে অনেকে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দিপ্ত রনি নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘যেই সন্তানের সামনে মা ধর্ষিত হয়, সে সন্তান একদিন সন্ত্রাসী হলে দায় কার?’ সাকিব আহমেদ নামের আরেকজন লিখেছেন, ‘কবে থামবে এই ধর্ষণ করে হত্যার রেশ?’
শুধু ব্যক্তিগত আইডি নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ও সমর্থনকারী বিভিন্ন পেজ ও প্রোফাইল থেকেও একই দাবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ৩২ লাখ অনুসারী থাকা ‘তালাশ বিডি’ নামে একটি ফেসবুক পেজও ভিডিওটি প্রকাশ করে এই ক্যাপশনে, ‘জাজিরায় দিনে-দুপুরে ছোট ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ করে হত্যা...।’
তাদের পোস্টে ভিডিওটি প্রায় ৯ লাখ বার দেখা হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা দাবি করা ভিডিওটিতে প্রতিক্রিয়া পড়েছে ৩৮ হাজারের বেশি, শেয়ার হয়েছে প্রায় ১০ হাজার এবং মন্তব্য পড়েছে ১ হাজার ৮০০।
ফরহাদ নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘দেশে কি শুধু ধর্ষণ আর খুন ছাড়া আর কিছু না-ই...’। জাহিদ বাবুল নামের একজন লিখেছেন, ‘সরকার কেন ধর্ষণের বিচার করে না, কেন কঠিন একটা আইন পাস করা হয় না, কেন কেন?’
লিংক: এখানে
এই ভিডিও একাধিক পেজ ও আইডি থেকে একই দাবি করে ২৪ মে থেকে ধারাবাহিক পোস্ট করা হচ্ছে।
একই ভিডিও জাতীয় হিন্দু মহাজোটের কেন্দ্রীয় মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক তাঁর প্রোফাইল থেকে পোস্ট করেন। ক্যাপশনে লেখেন, ‘এটা কি শরীয়তপুরের জাজিরার ঘটনা? কারো জানা থাকলে বিস্তারিত জানান।’
লিংক: এখানে
ভিডিওর ঘটনার খোঁজ নিতে প্রথমে শরীয়তপুরের জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ আহাম্মেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, জাজিরায় এ ধরনের কোনো ঘটনা সাম্প্রতিক কালে ঘটেনি। ভিডিওতে দেখানো ঘটনার সঙ্গে জাজিরার কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
এরপর ভিডিওটির বিভিন্ন কি-ফ্রেম ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, একই ভিডিও ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া আশরাফুর রহমান নামে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত হয়েছিল।
সেই পোস্টে দাবি করা হয়, ওই নারী মাদারীপুরের কালকিনি থানায় এসেছিলেন পারিবারিক বিরোধে তাঁর আত্মীয়দের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে। পরবর্তী অনুসন্ধানে ‘সংবাদ মাদারীপুর’, ‘মাদারীপুর সমাচার’, ‘সিটিজেন ভয়েস’সহ একাধিক স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও ফেসবুক পেজে একই ঘটনার আরও ভিডিও পাওয়া যায়।
‘সংবাদ মাদারীপুর’ পেজে ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে এক নারী অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছেন এবং তাঁর সন্তান কান্নাকাটি করছে। পোস্টের ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়, পারিবারিক ও জমিজমা-সংক্রান্ত অভিযোগ দিতে থানায় এসে ওই নারী অসুস্থ হয়ে পড়েন।
লিংক: এখানে
ঘটনার পরদিন প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নারীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
লিংক: এখানে
এ ছাড়া পরবর্তীকালে প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে ওই নারীকে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি জানান, স্থানীয় প্রশাসন ও সাংবাদিকদের সহায়তায় তাঁদের সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং তাঁর আর কোনো অভিযোগ নেই।
লিংক: এখানে
গতকাল যোগাযোগ করা হলে কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল আলম জানান, ঘটনাটি এক বছর আগের। ওই নারী তাঁর জমিজমা ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে আসেন। যাওয়ার সময় তিনি মাথা ঘুরে পড়ে যান। তখন তাঁর অবুঝ সন্তান কান্নাকাটি শুরু করলে পুলিশ সদস্য এগিয়ে যান এবং ওই নারীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
পুলিশ কর্মকর্তা জহিরুল বলেন, তখন স্থানীয় সাংবাদিক ইব্রাহীম খলিল ওই নারীর পড়ে যাওয়া এবং শিশুটির কান্নার ভিডিও করে তা ফেসবুকে প্রচার করেছিলেন। সম্প্রতি ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য দিয়ে বিকৃত আকারে প্রকাশ করা হচ্ছে।
প্রথম আলোর মাদারীপুর প্রতিনিধি অজয় কুন্ডু জানান, গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর ওই নারী তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে থানায় আসেন। তিনি লিখিত অভিযোগ দিয়ে থানা চত্বরের ভেতরে বসে ছিলেন। হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় তাঁর ছেলে আতঙ্কে মাকে ধরে কান্নাকাটি শুরু করেছিল। তখন কালকিনি থানার পুলিশ সদস্যরা ওই নারীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
সুতরাং ভাইরাল ভিডিওটি শরীয়তপুরের জাজিরার নয় এবং এর সঙ্গে ধর্ষণ-হত্যার কোনো সম্পর্ক নেই। অন্য ঘটনার পুরোনো ভিডিওকেই অসত্য ক্যাপশন জুড়ে দিয়ে নতুন করে পোস্ট করা হচ্ছে।
এদিকে ভিডিও প্রকাশ নিয়ে যোগাযোগ করার পর ‘তালাশ বিডি’ পেজ থেকে গতকাল ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হয়। নিজেকে এর বার্তা সম্পাদক পরিচয় দিয়ে মনির হোসেন নামের একজন বলেন, ভুল করে ভিডিওটি প্রকাশ করেছিলেন তাঁরা। সত্যতা যাচাইয়ের পর সেটি তাঁদের ফেসবুক পেজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।