হাম ছড়ানো শুরু হওয়ার প্রায় সাত মাস পর বাদ পড়া শিশুদের টিকা দিতে আবার বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করছে সরকার। টিকা দেওয়া হবে ৩৪ লাখ শিশুকে। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, সংক্রমণের এলাকা শনাক্ত করে সব ঝুঁকিপূর্ণ শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া এবং রোগী থেকে সংক্রমণ ঠেকানোর উদ্যোগ ছাড়া হাম নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।
গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, আজ শনিবার রাজধানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে দেশব্যাপী বিশেষ হাম–রুবেলার টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬–এর উদ্বোধন করবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সঙ্গে থাকবেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত। এই ক্যাম্পেইন চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। এই সময় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। এই শিশুরা ৫ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত চলা হাম–রুবেলার টিকার মূল ক্যাম্পেইন থেকে বাদ পড়েছিল। উল্লেখ্য, হামের টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল করেছিল স্বাস্থ্য বিভাগ।
এখন উচিত ‘হটস্পট’ শনাক্ত করা। সেসব স্পটের কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে। মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানানো জরুরি।মুশতাক হোসেন, জনস্বাস্থ্যবিদ
মার্চ মাসের শুরুতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সাত মাস পরেও হাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের গতকাল শুক্রবারের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে ১ হাজার ২০১ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে তিনজন।
সাত মাসের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এ বছর হামে ১ হাজার ৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮৩ জন এবং নিশ্চিত হামে ১০১ জন মারা গেছে। এই সময় সারা দেশে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৮৩৩ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসে। এই সময় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয় ২১ হাজার ১৫ জনের। গতকাল সারা দেশে পাঁচ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রধান উপায় টিকা। আমরা ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনতে চাই। ইপিআইয়ের মাধ্যমে নিয়মিত টিকাদান চলবে, পাশাপাশি ক্যাম্পেইনও চলবে।’
এই ক্যাম্পেইন চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। এই সময় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। এই শিশুরা ৫ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত চলা হাম–রুবেলার টিকার মূল ক্যাম্পেইন থেকে বাদ পড়েছিল। উল্লেখ্য, হামের টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল করেছিল স্বাস্থ্য বিভাগ।
পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই স্বাস্থ্য বিভাগ ৫ এপ্রিল হাম–রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু করে। প্রথমে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায়; ১২ এপ্রিল থেকে চারটি সিটি করপোরেশনে (ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল) এবং ২০ এপ্রিল সারা দেশে। তখন ওই বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে হাম–রুবেলার টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। পরে হিসাব করে দেখা গেছে, ওই বয়সী শিশুর সংখ্যা আরও ৪৪ লাখ বেশি।
ওই ক্যাম্পেইন শেষ হয় ২০ মে। ওই সময় টিকাদানের হিসাবে দেখা যায়, কোনো কোনো এলাকায় ১০০ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। কারণ জানতে চাইলে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, কোনো কোনো এলাকায় ৫৯ মাসের বেশি বয়সী শিশুরা টিকা নিয়েছে, তাই হিসাব বেশি দেখা গেছে। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ জরিপ করে বিভিন্ন শহরে ও গ্রামে টিকা না পাওয়া অনেক শিশুর সন্ধান পায়। ক্যাম্পেইনের পরেও বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়া চলতে থাকে। গতকাল পর্যন্ত ১ কোটি ৯৮ লাখ ৬১ হাজার ৫৩০ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল ইপিআইয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি উপজেলা থেকে শিশুদের হিসাব নেওয়া হয়েছে। তার ভিত্তিতেই টিকা কার্যক্রম চলবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমীম প্রথম আলোকে বলেন, কিছু ভুল ছিল। শিশুর সংখ্যা নির্ধারণে ভুল থাকতে পারে। আবার মাঠপর্যায়ে টিকা দেওয়ার সময় কিছু ত্রুটি থাকতে পারে। আশা করা যায় এবার সেই ভুলত্রুটি থাকবে না।
গতকাল ইপিআইয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি উপজেলা থেকে শিশুদের হিসাব নেওয়া হয়েছে। তার ভিত্তিতেই টিকা কার্যক্রম চলবে।
একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি অর্থাৎ ছয় মাস বয়সের কম—এমন শিশুদেরও হাম হয়েছে। আবার ৫৯ মাস বয়সের বেশি অনেক মানুষের হাম হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ছয় মাসের কম বয়সীদের টিকা দিয়ে লাভ নেই। অন্যদিকে ৫৯ মাসের বেশি বয়সীদের টিকা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। কিন্তু এই বয়সীরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে, হাম ছড়াচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা প্রাদুর্ভাবের প্রায় শুরু থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগীদের আইসোলেশনে রাখা, দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা—এ ধরনের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। কেউ কেউ ৬ মাস বয়স থেকে ১৫ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন। কিন্তু সেসব পরামর্শকে স্বাস্থ্য বিভাগ গুরুত্ব দেয়নি।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ছয় মাসের কম বয়সীদের টিকা দিয়ে লাভ নেই। অন্যদিকে ৫৯ মাসের বেশি বয়সীদের টিকা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। কিন্তু এই বয়সীরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে, হাম ছড়াচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘দরিদ্র পরিবারে কারও হাম হলে তাকে আইসোলেশনে নেওয়া কঠিন। কারণ, ঘর ছোট, এক ঘরেই একাধিক মানুষকে থাকতে হয়। তবে আমরা আশা করছি, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সব শিশুকে টিকার আওতায় আনলে হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।’
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হতে হবে হাম পরিস্থিতি প্রাদুর্ভাবের পূর্বের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া। প্রাদুর্ভাবের আগের বছর হামে কোনো মৃত্যু ছিল না, এক বছরে আক্রান্ত ছিল মাত্র ১৩২ জন। অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশের জন্য ওই পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এপ্রিলে ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার পর একটি পর্যায়ে সংক্রমণ কমে এসেছিল। এরপর আবার বেড়েছে। এখন উচিত ‘হটস্পট’ শনাক্ত করা। সেসব স্পটের কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে। আর ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা দরকার। মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানানো জরুরি।
দরিদ্র পরিবারে কারও হাম হলে তাকে আইসোলেশনে নেওয়া কঠিন। কারণ, ঘর ছোট, এক ঘরেই একাধিক মানুষকে থাকতে হয়। তবে আমরা আশা করছি, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সব শিশুকে টিকার আওতায় আনলে হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস