বিশাল আকৃতির লাল ঝুঁটির মোরগ, পায়রা, দোতারা নিয়ে পয়লা বৈশাখ ১৪৩৩ নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা নামবে রাজধানীর রাজপথে। তবে এর নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এবার রাজধানীতে উদ্যাপিত হবে বৈশাখবরণ উৎসব।
আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন ও নববর্ষ উদ্যাপন কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ প্রথম আলোকে বলেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় সভায় পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম চূড়ান্ত হবে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্যাপন কমিটির সভায় প্রতিপাদ্য, শোভাযাত্রার প্রতীক ও কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে সেখানে শোভাযাত্রার নাম নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় সভায় নামের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
গত বছর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টার নির্দেশে পয়লা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ করা হয়েছিল। নাম পরিবর্তন এবং শোভাযাত্রার প্রতীক নিয়ে তখন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। নির্মাণাধীন প্রধান প্রতীকটিতে কে বা কারা রাতে অগ্নিসংযোগ করার ফলে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে দ্রুত আরেকটি প্রতীক তৈরি করা হয়েছিল।
পয়লা বৈশাখের উৎসব বর্ণাঢ্য করে তুলতে চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ১৯৮৯ সাল থেকে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই শোভাযাত্রায় দেশের ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি ও লোকশিল্পের বিভিন্ন চরিত্র, প্রতীক, নকশা বড় আকারে নান্দনিকভাবে তুলে ধরা হয়। অনেক সময় এই শোভাযাত্রায় স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতিবাদ করেও বিশেষ প্রতীক বহন করা হয়েছে। ইউনেসকো ২০১৬ সালে পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তাদের বিশ্ব–ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে।
নববর্ষ উদ্যাপন কমিটির সদস্যসচিব আজহারুল ইসলাম শেখ জানান, এবার শোভাযাত্রায় কোনো রাজনৈতিক চেতনার প্রতীক থাকবে না। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর জনসাধারণের বহুল কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব পালন করছে, নতুন বছর শুরু হচ্ছে। দেশের ধর্মবর্ণ–নির্বিশেষ সব শ্রেণিপেশার মানুষ এই উৎসবে অংশ নেবেন। সে কারণে সর্বস্তরের মানুষের অন্তর্ভুক্তি ও গণতন্ত্রের উত্তরণের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে উৎসবের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিন বলেন, আবহমানকাল থেকে ভোরে মোরগের ডাক শুনেই গ্রামাঞ্চলের মানুষ ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। পায়রা শান্তির প্রতীক। আর বিগত সময়ে বাউল সম্প্রদায়ের প্রতি নানা রকমের হামলা ও তাদের অপদস্থ করার চেষ্টা চলেছে। বাউলদের প্রতি সংহতি প্রকাশের বিষয়টি থাকবে শোভাযাত্রায় দোতারার প্রতীক বহনের মধ্য দিয়ে। এ ছাড়া সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী কাঠের হাতি ও ঘোড়ার আদলে হাতি-ঘোড়া থাকবে শোভাযাত্রায়।
আজ চারুকলা ক্যাম্পাসে ঘুরে দেখা গেল, বরাবরের মতোই শিক্ষার্থীরা শোভাযাত্রার প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গত ৩০ মার্চ থেকে প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়। উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়েমা হক বিদিশা এর উদ্বোধন করেন। এবার এই কাজের তত্ত্বাবধান করছেন ৭১ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের সমন্বয়কদের একজন মো. ফুয়াদ হাসান জানালেন, প্রধান প্রতীকগুলো ২০ ফুট দীর্ঘ করে তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া শোভাযাত্রা বর্ণাঢ্য করে তুলতে বড় আকারের ১০ জোড়া রাজা-রানি, ১০০টি বিভিন্ন ধরনের বড় মুখোশ এবং অনেক সংখ্যায় ফুল পাখি, বাঘ, প্যাঁচার মুখ থাকবে শোভাযাত্রায়। তিনি জানান, বরাবরে মতো এবারও তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান হবে। নববর্ষের আগের দিন সন্ধ্যায় বকুলতলায় হবে চৈত্রসংক্রান্তির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পয়লা বৈশাখের সকাল নয়টায় শুরু হবে শোভাযাত্রা। আর পরদিন সন্ধ্যায় বকুলতলায় থাকবে যাত্রাপালা।