সদ্যোজাত সন্তানকে নিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে বাড়ি ফিরছেন মা মুর্শিদা (পেছনের মোটরসাইকেলে) ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা
সদ্যোজাত সন্তানকে নিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে বাড়ি ফিরছেন মা মুর্শিদা (পেছনের মোটরসাইকেলে) ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা

এই চরে নৌকাতে হয় সন্তানের জন্ম, মোটরসাইকেলে হাসপাতালে যেতে হয় অন্তঃসত্ত্বাকে

সুন্দরীর মেয়ের ঘরের নাতির জন্ম হয়েছিল নৌকায়। কীভাবে হয়েছিল, সে গল্প প্রথম আলোকে শোনান ধাত্রী আনোয়ারা খাতুন (৬৫)। তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ৩ মে। সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ঘোরজান ইউনিয়নে বরংগাইল গ্রামে।

নৌকায় গামছা দিয়ে ছাউনি করে হাত পেতে সদ্যোজাত সন্তানকে নিয়েছিলেন আনোয়ারা। সুন্দরী নামের সেই নারীর সঙ্গে কথা হয় পরে। চর থেকে ফিরে মুঠোফোনে শোনা হয় তাঁর নাতির জন্মের ঘটনা। সুন্দরী বলেন, তাঁর তিন সন্তানের মধ্যে বড় রহিমার বাল্যবিবাহ হয়। রহিমা তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। গত বছর বাড়িতেই তার সন্তান জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মেয়ের অবস্থা ভালো ছিল না। তাই মেয়েকে ওই অবস্থায় মোটরসাইকেলে করে নৌকায় নিয়ে গিয়েছিলেন হাসপাতালে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু নৌকাতেই জন্মায় নাতি। এর পর থেকেই তাঁর মেয়ে দুর্বল। সুন্দরী বলেন, ‘গরিব মানুষের জন্য কিছু নেই!’

নৌকার মাঝি আল আমিন। অন্তঃসত্ত্বাদের নৌকাতে হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি। নৌকাতে জন্মায়ও অনেক শিশু

মাঝি আল আমিন ১০ বছর ধরে এই এলাকায় নৌকা চালান। তিনি বলেন,অন্তঃসত্ত্বাদের অনেক কষ্ট হয়। অনেক সময় নৌকার মধ্যেই সন্তানের জন্ম হয়। রাতে–দিনে অনেক হবু মাকেই নৌকায় করে নিয়ে গেছেন তিনি।

এই দুজনের কথা থেকেই বোঝা যায়, দুর্গম এই চর এলাকায় এমন ঘটনা নতুন নয়। প্রসববেদনা সময় হিসাব করে আসে না, তাই ভোর হোক বা মধ্যরাত, সড়কে বা নৌকায় সন্তান প্রসবের মতো ঘটনা ঘটে। খুব জটিল না হলে হাসপাতালেও অন্তঃসত্ত্বাকে নেওয়া হয় না। বাড়িতেই সন্তান প্রসব করানো হয়।

এ পরিস্থিতির মধ্যেই আজ ২৮ মে দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে সন্তান প্রসব, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ হলেও চরে এর কোনো প্রতিফলন নেই।

এ বছরের মার্চে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩–এর গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল’ প্রতিবেদন অনুসারে, এখনো বাড়িতে সন্তান প্রসবের হার প্রায় ৩৩ শতাংশ। চারবার ও বেশিবার প্রসবপূর্ব সেবা নেওয়ার হার মাত্র ৩৯ শতাংশ। তবে ওই জরিপে চর এলাকায় বাড়িতে প্রসব বা প্রসবপূর্ব সেবা নেওয়ার হারের ক্ষেত্রে আলাদা কোনো তথ্য নেই।

দুর্গম চরে বাড়িতে সন্তানের জন্ম বেশি

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্লস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বান্দরবানে প্রায় ৮৫ শতাংশ প্রসবের ঘটনা ঘটে বাড়িতে। এ ছাড়া বাড়িতে সন্তান প্রসবের হার ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় জাতীয় গড়ের চেয়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেশি। গবেষণা প্রতিবেদনটির নাম ‘ক্লাস্টারিং অব হোম ডেলিভারি ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইটস প্রেডিক্টরস: এভিডেন্স ফ্রম দ্য লিংকড হাউসহোল্ড অ্যান্ড হেলথ ফেসিলিটি লেবেল সার্ভে ডেটা।’ উচ্চ নিরক্ষতার হার, নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমে যুক্ত না থাকা, বেশিসংখ্যক সন্তান জন্ম দেওয়া, বাড়ি থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দূরত্ব বেশি হওয়ায় এমনটা হয় বলে ওই গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়।

ঘোরজানচরের মানুষের গল্পগুলোও এমনই। এই চরে যাতায়াতব্যবস্থার একটা বর্ণনা দিলেই অন্তঃসত্ত্বাদের কষ্ট বোঝা যায়। ঢাকা থেকে ১৩৬ কিলোমিটার দূরে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর উপজেলার ভার্সিটা ঘাটে যেতে হয় প্রথমে। এই ঘাট ব্যবহার করে সিরাজগঞ্জ ও মূল শহরের সঙ্গে যোগাযোগ হয় ঘোরজানচরের মানুষের। যমুনা নদীর তীরবর্তী চরের এই গ্রামে নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর বসবাস রয়েছে। ঘোরজানচরে পৌঁছাতে ভার্সিটি ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করে পৌনে এক ঘণ্টায় পার হতে হয়েছে উত্তাল নদী। নৌকা থেকে নেমে চড়তে হয়েছে মোটরসাইকেলে। ফসলের খেতের আল ধরে উঁচু–নিচু পথ, কোথাও কাদায় থকথকে হয়ে থাকা পথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয়েছে গন্তব্যে। সময় লেগেছে ২০ থেকে ২৫ মিনিট। অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রসববেদনায় কাহিল মায়েদেরও এভাবেই মোটরসাইকেল ও নৌকায় করে ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার করতে হয়।

ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে এসেছেন এই দম্পতি

ঘোরজান ইউনিয়নে মোট পরিবারের সংখ্যা ৬ হাজার ৬৫০। মোট জনসংখ্যা ৩১ হাজার ২০০। ৩ মে পর্যন্ত ইউনিয়নটিতে মোট অন্তঃসত্ত্বার সংখ্যা ছিল ২২৪।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক গত বছরের ১৯ নভেম্বর চর হেলথ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ফর মাদার্স অ্যান্ড সোসাইটি (চার্মস) প্রকল্পের আওতায় সুস্বাস্থ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের আগপর্যন্ত এই চরে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল না। সরকারি কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রও নেই। প্রতিকূল পথ পাড়ি দিয়ে অন্তঃসত্ত্বাদের সেবা নিতে যেতে হয় এনায়েতপুর বা শাহাজাদপুর উপজেলায়।

এই চর এলাকার বরংগাইল গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ারা খাতুন বলেন, তিনি ৪০ বছর ধরে ধাত্রীর কাজ করছেন। পাঁচ শতাধিক প্রসব হয়েছে তাঁর হাতে। সবই বাড়িতে।

ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে এসেছিলেন মরিয়ম আক্তার (২১)। তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বড় সন্তান বাড়িতেই হয়েছে বলে জানান।

এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৮ টায় মুরশিদা (২০) ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। মুর্শিদাকেও নবজাতককে নিয়ে দুপুরে বাড়িতে ফিরতে হয়েছে মোটরসাইকেলে করে।

স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এক অন্তঃসত্ত্বার সঙ্গে এসেছিলেন রোজিনা খাতুন। জানালেন, তাঁরা পাঁচ জা। কারও দুটি, কারও চারটি সন্তান। এর মধ্যে এক জায়ের শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। অন্যদের কোনো না কোনো সন্তান বাড়িতে জন্মেছে। বাড়িতে ভয় লাগে না—জিজ্ঞাসা করতেই রোজিনা উত্তর দিলেন, ‘মইরা গেলে আর কী করা বলেন! ভাগ্য খারাপ!’

তৃতীয়বারের মতো অন্তঃসত্ত্বা বিলকিস খাতুন (২৪) বলেন, কোথায় সন্তান হবে, এখানে সেই সিদ্ধান্ত মা নেন না। স্বামী, শ্বশুর–শাশুড়ি, মা–বাবা যেটা বলেন, সেটা তাঁরা মেনে নেন।

মোটরসাইকেলচালক মো. হৃদয় বলেন, প্রসবব্যথায় কাতর অনেক অন্তঃসত্ত্বাকে তিনি মোটরসাইকেলে করে নৌকার কাছে নিয়ে যান।

মা–সন্তান ঝুঁকিতে

বিলকিস খাতুন, জাহেদা খাতুন, লতা খাতুনসহ কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, পাঁচ বছর আগে মোটরসাইকেল চালু হয়। ভাড়া নেওয়া হয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। তবে মধ্যরাতে প্রয়োজন হলে ভাড়া ২৫০ টাকা দিতে হয়। নৌকাভাড়া জনপ্রতি ৫০ টাকা। তবে রিজার্ভ করে নিতে হলে ৮০০ টাকা লাগে।

প্রতিকূল যাতায়াতের কারণে বাড়িতে সন্তান জন্ম হয় সেলিম–খাদিজা দম্পতির। স্ত্রী খাদিজা খাতুনকে (১৯) নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছিলেন তিনি। এর আগে তাঁর স্ত্রী যমজ সন্তান ধারণ করেছিলেন। তারা বাঁচেনি। নতুন স্বাস্থ্য ক্লিনিকের সুবিধার কথা উল্লেখ করে বলেন, ওই সময় এই ক্লিনিক (ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র) থাকলে তাঁকে সন্তান হারাতে হতো না।

ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির মিডওয়াইফ তাহরিমা খাতুন বলেন, প্রতিকূল যাতায়াতব্যবস্থার কারণে বাড়িতে প্রসবের প্রবণতার পাশাপাশি চরে ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোরীদের বিয়ের হার বেশি। এখানে বেশিসংখ্যক সন্তান নেওয়া ও বেশি বয়সে মা হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ৪৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মা আছেন। ৭ নম্বর, ৯ নম্বর সন্তান নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে মায়ের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।

তাহরিমা খাতুন জানান, ছয় মাস আগে চালু হওয়া ব্র্যাক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চালুর পর তাঁরা নিরাপদ প্রসবের জন্য সচেতন করার চেষ্টা করছেন। তাঁদের কেন্দ্রে শুধু স্বাভাবিক প্রসব করানোর ব্যবস্থা আছে। অস্ত্রোপচারে শিশু জন্ম বা সিজারিয়ান সেকশনের প্রয়োজন হলে তাঁরা শাহজাদপুর, এনায়েতপুরে সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তঃসত্ত্বাদের পাঠান।

ফিস্টুলা, রক্তক্ষরণ, খিঁচুনির ঝুঁকি

ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটিতে প্রতি সপ্তাহের বুধবার চিকিৎসক আসেন সিরাজগঞ্জ শহর থেকে। চিকিৎসক জান্নাতুল ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, গর্ভধারণের ক্ষেত্রে প্রথম তিন মাস ও শেষের তিন মাস ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত এড়িয়ে যেতে বলা হয়। এখানে একজন অন্তঃসত্ত্বার বাইক ও ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া চলাচল করার কোনো উপায় নেই। এ যাত্রা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। বাড়িতে প্রসবের ক্ষেত্রে ব্লেড, ন্যাকড়া ব্যবহার করা হয়, যা মাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে জোর করে গর্ভের শিশুকে বের করতে গিয়ে জরায়ুমুখ ছিঁড়ে যায়। ফিস্টুলা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও খিঁচুনি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এই চরে অন্তঃসত্ত্বার মোটরবাইক ও ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া চলাচল করার কোনো উপায় নেই

সিরাজগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন মো. নুরুল আমীন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, দুর্গম এলাকা হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ মাতৃত্ব রয়েছে। সরকারিভাবে চর এলাকাটিতে পরিবারকল্যাণ সহকারী নেই। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতন করার চেষ্টা করেন।