বিশেষ লেখা

বিদ্রোহ আর পিছুটান

ড. রাজি আজমির জন্ম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বাবা–মায়ের ঘরে। তিনি পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। জেলেও যান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তাঁরা ইসলামাবাদে চলে যান। লেখাটি রাজি আজমির স্মৃতিকথা আ লাইফ আনভেইলড: মাই এনকাউন্টারস অ্যাক্রস কান্ট্রিজ অ্যান্ড কালচারস-এর সর্বহারা পার্টির স্মৃতিচারণ অংশের অনুবাদ। অনুবাদ: জাভেদ হুসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ত্ব বিভাগে বিএসসি সম্মানে ভর্তি হই ১৯৬৭ সালের শরতে। অনার্স পর্যায়ে ভূতত্ত্ব বিষয়টি তখন একেবারেই নতুন ছিল। তাই আমার কাছে এর একটা আলাদা আকর্ষণ ছিল। আরও একটা ব্যাপার ছিল। আমার ছিল ঘুরে বেড়ানোর নেশা। মনে হয়েছিল যে ভূতাত্ত্বিকের পেশাটা হয়তো আমার সেই নেশা মেটাতে সাহায্য করবে।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমার হাতেখড়ি হয় সেই বছরের শুরুর দিকে। বড় ভাই সামির উৎসাহে আমি একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের এক স্মরণসভা আর পরে মিছিলে অংশ নিই। পুলিশ তখন লাঠিসোঁটা আর বন্দুক নিয়ে মারমুখী অবস্থায় ছিল। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম মিছিলের সারির একেবারে মাঝখানে থাকতে। তাদের থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার জন্যই আমার সেই চেষ্টা। চারপাশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন বেশ উত্তপ্ত। ভয় হচ্ছিল, সামান্য উসকানি পেলেই হয়তো পুলিশ আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

স্বস্তির ব্যাপার যে শেষমেশ তেমন কিছুই ঘটল না। তবে সেই স্বস্তির সঙ্গে কোথাও একটা সূক্ষ্ম অতৃপ্তিও মিশে ছিল। মনে হচ্ছিল, আমার এই প্রথম রাজনৈতিক পদযাত্রাকে সরকার বোধ হয় খুব একটা গুরুত্ব দিল না!

রাজি আজমি

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আমাদের অনেকের কাছেই চেয়ারম্যান মাও সে–তুং আর ১৯৬৬ সালে চীনে তাঁর শুরু করা ‘মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ ছিল এক বড় অনুপ্রেরণা। ভিয়েতনামে মার্কিন সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ভিয়েতকংদের সাফল্যও আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নকশালবাড়িতে কৃষকদের গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল। সেটাও আমাদের যথেষ্ট সাহস জুগিয়েছিল। ঠিক এই সময়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো নিজের রাজনৈতিক দল ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’ (পিপিপি) গঠনের জন্য জনসমর্থন খুঁজছিলেন। ৩৯ বছর বয়সের ভুট্টো ছিলেন বেশ তরুণ, ক্যারিশম্যাটিক ও বাগ্মী। এর ওপর আবার তাঁর পরিচিতি ছিল একজন প্রগতিশীল, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং চীনপন্থী নেতা হিসেবে।

তাই যখন খবরের কাগজে ছোট্ট একটা সংবাদে দেখলাম যে ভুট্টো ঢাকা এসেছেন, সামি তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। আমাদের আন্দাজ ছিল তিনি ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলেই থাকবেন। কারণ, তখন ওটাই ছিল শহরের একমাত্র অভিজাত হোটেল। বড় ভাই সামির উৎসাহে আমি সাহস সঞ্চয় করে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনে বাবার অফিসের ফোন থেকে হোটেলে কল করলাম। সামি তখন পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে সাহস দিচ্ছিল। সেই আমলে টেলিফোন পাওয়া ছিল দুষ্কর। আর আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের এক তরুণের জন্য ফোন করা ছিল অনেকটা বিমানে চড়ার মতোই বিরল অভিজ্ঞতা। ঢাকার সেরা হোটেলে ফোন করে পাকিস্তানের সদ্য বিদায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চাওয়াটা ছিল রীতিমতো এক আতঙ্কজনক ব্যাপার। ওপাশে রিসেপশনিস্টের আওয়াজ পেলাম। কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম যে আমি মিস্টার ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলতে চাই। মনে মনে চাইছিলাম যেন উত্তর আসে যে তিনি এখন ব্যস্ত বা কথা বলতে পারবেন না।

কিন্তু কপালে তা সইল না। চোখের পলকে রিসেপশনিস্ট আমাকে লাইনে দিয়ে দিলেন। ওপাশ থেকে সেই চারটি শব্দ ভেসে এল, যা আমি একদমই শুনতে চাইনি, ‘জুলফিকার আলী ভুট্টো স্পিকিং।’ কোনোমতে সাহস সঞ্চয় করে আমি কথাগুলো বলতে পারলাম, যা আজও আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে, ‘স্যার, আমি আর আমার ভাই আপনার গুণমুগ্ধ ভক্ত। আমরা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’ আবারও অবাক হওয়ার এবং কিছুটা ভড়কে যাওয়ার পালা। কোনো মার্জিত অজুহাত দেখানোর বদলে উত্তর এল, ‘আগামীকাল দুপুর ১২টা ১০-এ হলে কেমন হয়?’ আমার দিক থেকে শুধু এটুকুই বলার বাকি ছিল, ‘জি স্যার, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।’

জুলফিকার আলী ভুট্টো

অনেক ভেবেচিন্তে আমরা মিস্টার ভুট্টোকে উপহার দেওয়ার জন্য নিউমার্কেট থেকে দুটি বই কিনলাম। একটি হলো টিচ ইয়োরসেলফ বেঙ্গলি এবং অন্যটি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নির্বাচিত কবিতার ইংরেজি অনুবাদ। সে রাত আর পরের দিন সকালটা চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে কাটল।

পরদিন দুপুর পৌনে ১২টা নাগাদ আমরা একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে গিয়ে নামলাম। বুক ধুকপুকানি নিয়ে দ্বিধাভরে আমরা ঢুকলাম হোটেলের ঝলমলে লবিতে। ভেতর থেকে একটা আধুনিক হোটেল দেখার এটাই ছিল আমাদের প্রথম সুযোগ। আর কী অপূর্ব তার সাজসজ্জা! শুধু অন্দরসজ্জাই নয়, ওখানকার লোকজনের চালচলন দেখেও আমরা তো থ! সোজা সামনেই ছিল রিসেপশন ডেস্ক। সেখানে গিয়ে আমি বেশ উদ্বিগ্ন হয়েই জিজ্ঞেস করলাম, আমরা মিস্টার ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করতে পারি কি না? আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে কি না—রিসেপশনিস্টের এমন প্রশ্নে আমি একটু গর্বের সঙ্গেই হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলাম। তিনি প্রথমে টাইপরাইটারের কি-বোর্ডের দিকে তাকালেন। তারপর সামনে লবিতে বসে থাকা লোকজনের দিকে ইশারা করে মিস্টার ভুট্টোকে দেখিয়ে দিলেন। হোটেলে ফোন করা আর রিসেপশনে খোঁজ নেওয়া—শুধু এ দুটি ক্ষেত্রেই সামি আমাকে সামনে এগিয়ে দিয়েছিল। এর কারণ আমার জানা নেই। বাকি সব সময় ও-ই ছিল নেতা। ও সব সময় নেতৃত্ব দিতে পছন্দ করত। আর আমিও ওর পিছু পিছু চলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। তবে নিজের চিন্তাভাবনায় আমি ছিলাম যথেষ্ট অটল।

আমরা লক্ষ করলাম, মিস্টার ভুট্টো তাঁর স্ত্রী নুসরাত ভুট্টো এবং আরও কয়েকজন রূপসী নারীর (হ্যাঁ, সবাই নারী) সঙ্গে বসে আছেন। তখনো ১২টা ১০ বাজেনি। আমরা তাঁদের খুব কাছেই একটা জায়গায় অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঠিক নির্ধারিত সময়ের মিনিট দু–এক আগে ভুট্টো উঠে দাঁড়িয়ে কাউকে খুঁজছেন—এমনভাবে চারদিকে তাকাতে লাগলেন। তিনি আমাদেরই খুঁজছেন ভেবে আমরা এগিয়ে গিয়ে নিজেদের পরিচয় দিলাম। তিনি বেশ ভদ্রভাবে সাড়া দিলেন, আমাদের সঙ্গে করমর্দন করলেন। আমরা যেখানে বসেছিলাম, সেখানেই আমাদের সঙ্গে এসে বসলেন। বসামাত্রই ভুট্টো প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে একনাগাড়ে কড়া সমালোচনা শুরু করলেন। এর কিছুক্ষণ পরই ঢাকা থেকে প্রকাশিত বামপন্থী ইংরেজি সাপ্তাহিক হলিডে সম্পাদক সেখানে হাজির হলেন। তাঁকে দেখে ভুট্টোর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পর ভুট্টো আমাদের তিনজনকে কফি পানের জন্য তাঁর রুমে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু আমরা মনে করলাম, এটাই বিদায় নেওয়ার সঠিক সময়। তাই তাঁকে বিদায় জানিয়ে চলে এলাম।

সংক্ষিপ্ত এই সাক্ষাৎকারের পুরোটা সময় ধরে সামি আর আমি ভুট্টোর ব্যক্তিত্বে মোহাচ্ছন্ন হয়ে বসে ছিলাম। দেশের সদ্য বিদায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বর্তমানের একজন তুখোড় রাজনৈতিক নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি মাত্র যৌবনে পা দেওয়া আমাদের মতো দুজন তরুণকে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও সম্মানের সঙ্গে আপ্যায়ন করেছিলেন।

সিরাজ সিকদার

১৯৬৭ সালের শেষের দিকে সঙ্গে সঙ্গে আমি আজিমপুরে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (ইপসু-মেনন গ্রুপ) এক রুমের ছোট্ট অফিসে প্রথমবার যাই। এক শীর্ষস্থানীয় ছাত্রনেতা তখন কথা বলছিলেন। হঠাৎ লক্ষ করলাম, আমাদের পেছনে এক অপরিচিত যুবক একটা ছোট দলের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত। তাঁর কথাবার্তা আমাদের আগ্রহী করে তুলল। আমরা তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে কথা শোনা শুরু করলাম। মুহূর্তেই তাঁর ব্যক্তিত্ব আর বাগ্মিতায় অভিভূত হয়ে পড়লাম। তিনিই ছিলেন সিরাজ সিকদার। সেই ছিল তাঁকে প্রথমবার দেখা। তখন পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমান বুয়েট) ছাড়া ছাত্র ইউনিয়নের অন্য বলয়ে তিনি খুব একটা পরিচিত ছিলেন না। সেখানে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেন। বিই (সিভিল) ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েই সিকদার তখন ‘পূর্ব বাংলার শোষিত মানুষের’ মুক্তির জন্য আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে একদল অতি উৎসাহী বিপ্লবী যুবক সংগ্রহের কাজে আদাজল খেয়ে নেমেছিলেন। সেই আকস্মিক মোলাকাতটি আমার জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক মুহূর্ত। আর সামির জন্য তো তা জীবনই বদলে দেওয়ার মতো ঘটনা। সামির দক্ষ সহযোগিতায় সিরাজ সিকদার পরবর্তীকালে ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তারপর যা ঘটেছে, তা তো ইতিহাস। রক্তাক্ত এক ইতিহাস।

১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি সিরাজ সিকদারের আকস্মিক মৃত্যুর খবরটি ছিল বাংলাদেশের প্রধান সংবাদ। পরিস্থিতি এমন ছিল যে খোদ রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সংসদে জনসমক্ষে তা নিয়ে দম্ভ করে বলেছিলেন, ‘কোথায় এখন সিরাজ সিকদার?’ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, মাত্র আট মাস পর মুজিব নিজেও বিদ্রোহী সেনাদের হাতে সপরিবার নিহত হন। তার পর থেকে সিরাজ সিকদার এবং তাঁর দল পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সম্পর্কে বা দলের শুরুর দিনগুলো নিয়ে খুব কমই জানা যায়। যেহেতু এই আন্দোলনটি সব সময় আন্ডারগ্রাউন্ড বা গোপন ছিল, তাই প্রকাশিত প্রায় সব তথ্যের মধ্যেই কিছু ভুলভ্রান্তি আর অস্পষ্টতা থেকে গেছে।

সামি আজমি

১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নামের দলটি প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৯১ সালে এর ২০তম বার্ষিকীতে পার্টি স্ফুলিঙ্গ নামে একটি স্মারক সংখ্যা প্রকাশ করে। সেখানে শহীদদের এক দীর্ঘ তালিকায় ‘পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান শহীদ কমরেড সিরাজ সিকদার’-এর নামের ঠিক পরেই এক নম্বরে লেখা আছে: ‘তাহের, আসল নাম: সামি আজমি, ঢাকা।’ সেই সংক্ষিপ্ত তথ্যে এটুকু ছাড়া আর বিশেষ কিছু ছিল না। হলে লেখা থাকত যে তিনি ‘ভারত থেকে আসা এক উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান, যিনি বাংলাদেশের মানুষের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।’

১৯৬৭ সালের শেষের দিকে সিরাজ সিকদারের সঙ্গে সেই প্রথম আকস্মিক সাক্ষাতের দু–এক দিনের মধ্যেই আমরা ঢাকার রামপুরা শহরতলিতে তাঁর বাসায় মিলিত হতে শুরু করি। সেখানে তিনি তাঁর স্ত্রীসহ থাকতেন। ছাত্র ইউনিয়নের (ইপসু) মাধ্যমে নিজের হাতে বেছে নেওয়া একদল তরুণের সঙ্গে ধারাবাহিক কয়েকটি সভায় সিরাজ সিকদার আমাদের সামনে তাঁর বিপ্লবী তত্ত্ব তুলে ধরেন। মূলত চেয়ারম্যান মাও সে–তুংয়ের পুস্তিকা অন কন্ট্রাডিকশন বা দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গের ওপর ভিত্তি করে তিনি শত্রুমিত্র বেশ নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছিলেন। সেই পুস্তিকায় শত্রুর তালিকা ছিল দীর্ঘ। পরিভাষাগুলো মাওবাদী। আর তত্ত্বের নির্ভুলতা এমন ছিল, যা দেখলে খোদ মার্কসও হয়তো গর্ববোধ করতেন। তাঁর মতে, পূর্ব বাংলার মানুষের প্রধান দ্বন্দ্ব বা প্রধান শত্রু ছিল ‘পাকিস্তানি উপনিবেশবাদ’ (পড়ুন পশ্চিম পাকিস্তান)। এরপর ছিল সামন্তবাদ (স্থানীয় জমিদার)। তারপর একে একে ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ (যুক্তরাষ্ট্র), সোভিয়েত সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদ (সোভিয়েত ইউনিয়ন) এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ (ভারত)’। সবশেষে ছিল ‘দালাল আমলা পুঁজি’ (স্থানীয় পুঁজিপতি)।

বিপ্লবের অগ্রসেনা এবং সর্বহারা শ্রেণির (কলকারখানার শ্রমিক) ভ্যানগার্ড হিসেবে ‘আমাদের’ কাজ ছিল কৃষকদের সংগঠিত করা, গেরিলাযুদ্ধের মাধ্যমে গ্রামগুলো দখল করা, শহর ঘেরাও করা এবং শেষে জনগণের জন্য পূর্ব বাংলাকে মুক্ত করা। আমাদের সংখ্যা তখন মাত্র জনাদশেক। তাতে কী আসে-যায়! কিংবা আমাদের অধিকাংশের বয়স যে তখন বিশের কোঠায়, তাতেই–বা কার কী! আমরা তো এই সামান্য তথ্য নিয়েও মাথা ঘামাইনি যে আমাদের মধ্যে কারোরই কখনো কলকারখানায় কাজ করা বা জমিতে লাঙল দেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। এমনকি ছিল না কোনো ধরনের সামরিক প্রশিক্ষণও!

দক্ষিণ ভিয়েতনামের গেরিলাযুদ্ধের একনিষ্ঠ অনুসারী এবং ভিয়েতকংদের ভক্ত হিসেবে আমরা জানতাম যে পাকিস্তানি সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই সফল করতে পাহাড় আর জঙ্গল অপরিহার্য। চীনা সাময়িকীগুলোয় ছাপা হওয়া গেরিলা আর তাদের সুড়ঙ্গপথসহ জঙ্গলের ক্যাম্পগুলোর ছবি ছিল অসাধারণ। সেসব আমাদের রীতিমতো মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। আরও বড় অনুপ্রেরণার জন্য আমাদের সামনে ছিল মাওয়ের নেতৃত্বে চীনা কমিউনিস্টদের সেই মহাকাব্যিক ‘লং মার্চ’।

পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি গেরিলাযুদ্ধের জন্য উপযোগী মনে হওয়ায় সিরাজ সিকদার একেবারে দক্ষিণের জনপদ টেকনাফের কাছে একটি বেসরকারি ব্রিজ নির্মাণ কোম্পানিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি নেন। এতে বেশ কিছু সুবিধা ছিল। প্রথমত, সিকদারের বেতনের মাধ্যমে একটি নিয়মিত আয়ের উৎস তৈরি হওয়া এবং দ্বিতীয়ত, সেখানকার পাহাড়ি ও জঙ্গলঘেরা পরিবেশ। তা ছাড়া টেকনাফ ছিল বার্মার (মিয়ানমার) খুব কাছে। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টি তখন বিশাল এক ‘মুক্ত অঞ্চল’ নিয়ন্ত্রণ করছিল। আমাদের তথ্যের মূল উৎস ছিল পিকিং রিভিউ। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ তা গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ত। শুধু পড়ত না, এর প্রতিটি শব্দকে ধর্মীয় বাণীর মতো ধ্রুব সত্য বলে বিশ্বাস করত।

সিরাজ সিকদারের সম্মতি নিয়ে আমি আর আনোয়ার বিস্ফোরক বিষয়ে প্রাথমিক দক্ষতা অর্জনের সিদ্ধান্ত নিলাম। আনোয়ারের সঙ্গে আমার কলেজের সময় থেকে দুই বছরের বেশি চেনাজানা। বেশ আটঘাট বেঁধেই আমরা কাজে নেমে পড়লাম। পুরান ঢাকা থেকে কিছুটা সালফার, সলতে এবং প্রায় এক মিটার লম্বা একটি লোহার পাইপ কিনলাম। একজন ওয়েল্ডারের দোকান থেকে পাইপটির এক প্রান্ত বোল্ট দিয়ে ভালোমতো আটকে নিলাম। সেই প্রান্তের কাছে পাইপের গায়ে একটি ছোট ছিদ্র করে নিলাম। এসব নিয়ে আমি আর আনোয়ার বিস্ফোরকের পরীক্ষার জন্য সিকদারের বাসার সেই আলাদা গেস্টরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ফেললাম। রুমটা ছিল দোতলা সেই বাড়ির নিচতলায় সিঁড়ির পাশেই। ওপরতলায় থাকত অন্য একটি পরিবার। সিকদার তত দিনে টেকনাফের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছেন। তবে তাঁর স্ত্রী রওশন আরা টেকনাফে সিকদারের কাছে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি জানতেন আমরা ভেতরে কী করছি।

১৯৭৫ সালে সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর খবরটি ছিল আকস্মিক, ইত্তেফাক

আমরা দেয়ালের এক প্রান্তে পুরোনো মোটা গাদাখানেক রেজিস্টার খাতা রাখলাম, যাতে দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আর ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে পাইপ বা ব্যারেলটি তাক করলাম সেদিকে। এরপর ওজন মেপে নির্দিষ্ট অনুপাতে রাসায়নিকগুলো মিশিয়ে তা রেজিস্টারে লিখে রাখলাম। পাইপের সিল করা প্রান্তের ছিদ্র দিয়ে ফিউজ ঢুকিয়ে সামনের দিক দিয়ে প্রথমে বিস্ফোরক মিশ্রণ আর তারপর ছোট পাথর বা নুড়ি ঢুকিয়ে দিলাম। এবার আসল কাজ। সলতেতে আগুন ধরিয়ে বিস্ফোরণের জন্য অপেক্ষা করা। একের পর এক পরীক্ষা চলতে লাগল। কোন মিশ্রণে কত জোরে বিস্ফোরণ হচ্ছে তা আমরা নোটবুকে টুকে রাখছিলাম। এভাবে আমাদের ‘ব্যালিস্টিক’ ক্ষমতা ক্রমে উন্নত হতে লাগল। শেষমেশ এমন এক বিস্ফোরণ ঘটল যে এক বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। ভয়ংকর সেই শব্দের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার সময় আমাদের ছিল না। ওপরতলার লোকজনকে দৌড়ে নিচে নামতে শুনলাম।

তারা রওশন আরাকে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে, তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘কিছু না তো।’ তারা আবার জিজ্ঞেস করল, তবে এত বিকট শব্দটা কিসের? তিনি বললেন, শব্দটা নিশ্চয়ই বাইরে থেকে এসেছে। তারা পুরোপুরি আশ্বস্ত না হয়ে আমাদের রুমটির দিকে ইশারা করে জানতে চাইল, ওই ঘরে কী আছে। ভেতর থেকে আমরা রুদ্ধশ্বাসে শুনছিলাম, রওশন আরা কোনো রকম ভড়কে না গিয়ে ব্যাখ্যা করলেন যে ওটা একটা স্টোররুম, এখন খালি পড়ে আছে, ওখানে কিছু ঘটার কোনো সুযোগই নেই। তারা কিছুটা অসন্তুষ্টি আর নিচতলার কর্মকাণ্ড নিয়ে সামান্য সন্দেহ নিয়েই ওপরে চলে গেল। আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেখানেই হঠাৎ থেমে গেল। তবে সেটা ছিল সফল ও রোমাঞ্চকর।

আমাদের দশ-বারোজন ‘কমরেড’-এর দলটি তখন বলতে গেলে সব রকম অভিযানের জন্য প্রস্তুত। কমরেড মুজিব প্রথমেই রওশন আরাকে নিয়ে টেকনাফে তাঁর স্বামীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার আর নিজে এলাকাটির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার দায়িত্ব নিলেন। সিরাজ সিকদার তাঁর সহকর্মীদের কাছে মুজিবকে রওশন আরার ভাই হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তবে এটি সন্দেহ তৈরি করার কথা ছিল। আর হয়েছিলও তাই। কারণ, মুজিবের গায়ের রং ছিল বেশ কালো। সে কারণে তাঁর ডাকনামটাই হয়ে গিয়েছিল ‘কালা মুজিব’। অন্যদিকে রওশন আরার গায়ের রং ছিল ফরসা।

এর কয়েক সপ্তাহ পর, ১৯৬৮ সালের মার্চ মাসে, আমরা মুজিবের সঙ্গে ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম এবং সেখান থেকে বাসে করে কক্সবাজার গেলাম। কক্সবাজার থেকে জিপে করে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণে সিকদারের সরকারি বাসভবনের উদ্দেশে রওনা হলাম। জায়গাটি টেকনাফ শহর থেকে তিন কিলোমিটার আগে; পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর আর পূর্বে নাফ নদীর মাঝখানে একচিলতে সরু জমি। নদীর ওপারেই বার্মা। ঠিক ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শেষ সীমানা।

সিকদার তাঁর সহকর্মীদের আগেই আমাদের আসার কথা বলে রেখেছিলেন। আমাদের পরিচয় দেওয়া হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে, যারা এই এলাকায় ‘মাঠপর্যায়ের গবেষণার’ জন্য এসেছে। আমরা কোম্পানির গেস্টহাউসে আস্তানা গাড়লাম। সেখান থেকে দু-তিনজনের ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আমরা চলে যেতাম ধানের খেতে। তারপর কৃষকদের কাছে মার্কসবাদী-মাওবাদী পরিভাষায় তাদের দারিদ্র্যের মূল কারণ ব্যাখ্যা করতাম। শোষক ও জালিমদের উৎখাত করতে আমরা যে তাদের সাহায্য করতে চাই, সে কথা বলতাম। কৃষকেরা আমাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত। মনে হলো না এই ‘শোষণের শিকার’ মানুষদের কাউকেই এটা বোঝাতে পেরেছি যে ‘উৎপাদনযন্ত্রের’ মালিকেরা নিজেদের ‘পুঁজি’ বাড়াতে এদের ‘উদ্বৃত্ত শ্রম’ আত্মসাৎ করছে। শোষকদের উৎখাত করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে নামার তো প্রশ্নই আসে না!

সংসদে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, কোথায় এখন সিরাজ সিকদার?

ঠিক এই সময়েই আমাদের দলে প্রথম ভাঙন ধরল। মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে রফিক বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমাদের বাকিদের মায়েদের অবশ্য কোনো ধারণাই ছিল না আমরা কোথায় আছি বা কী ছাই করছি। তবে তাঁরা এটা জানতেন যে পূর্ব বাংলায় একটি মাওবাদী-কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটানোই আমাদের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান!

কয়েক দিন পর শুরু হলো আসল কাজ—গেরিলাযুদ্ধের জন্য টেকনাফের  ছোট পাহাড়গুলোয় সুড়ঙ্গ খুঁড়তে হবে। সিকদার নিজেই আমাদের হাঁটিয়ে গহিন বনের ভেতর দিয়ে নিয়ে গেলেন। ঝিরিপথ ধরে আর বড় বড় পশুর—সম্ভবত হাতির—বিষ্ঠার স্তূপ মাড়িয়ে ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর আমরা একটি পাহাড়ের চূড়া বেছে নিলাম। ঠিক হলো সেখানেই আমাদের ক্যাম্প হবে। এরপর সামিকে ক্যাম্পের দায়িত্বে রেখে সিকদার একাই ফিরতি পথে রওনা দিলেন। এমন বিপৎসংকুল পথে তাঁর একাকী ফিরে যাওয়ার সাহস দেখে আমি সত্যি অবাক হয়েছিলাম। রুটি আর গুড় দিয়ে রাতের খাবার সেরে আমরা একটা নড়বড়ে ক্যাম্প বানালাম। নেমে পড়লাম ভিয়েতকংদের কায়দায় সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজে। সুড়ঙ্গ তৈরি করা যে কত কঠিন কাজ, তা আমাদের ধারণাতেও ছিল না। মাটির স্তর ছিল আমাদের চেনা বাগানের মাটির চেয়ে অনেক বেশি পাথুরে।

কয়েক ঘণ্টার হাড়ভাঙা খাটুনি, হাতের তালুতে কড়া পড়া আর শরীরের পেশিতে তীব্র ব্যথার পর দেখা গেল আমরা মাটির ওপর সামান্য আঁচড়ই কাটতে পেরেছি। বুঝতে পারলাম এই পদ্ধতিতে কাজ করা অসম্ভব। তবু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি পরের দিনের জন্য তোলা রইল।

রাতটি ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার আর গা ছমছমে। এর ওপর শুরু হলো প্রচণ্ড বৃষ্টি। পোকামাকড় আর পাখির কিচিরমিচির শব্দকে ছাপিয়ে সেই বৃষ্টি আমাদের পুরোপুরি ভিজিয়ে একাকার করে দিল। শীত আর বিভ্রান্তি নিয়ে আমাদের সেই রাত কাটল। সম্বল বলতে মাত্র গুটিকয় গাঁইতি, কোদাল আর রান্নার কাজে ব্যবহারের ছুরি। আমাদের একমাত্র শক্তি ছিল সামষ্টিক বিপ্লবী সাহস। সেই সাহসের পরীক্ষা হওয়া তখনো বাকি ছিল। কৃষকদের সঙ্গে আমাদের কথোপকথন যদি আমাদের হতাশ করে থাকে, তবে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার এই ব্যর্থ চেষ্টা আমাদের মনোবল পুরোপুরি ভেঙে দিল।

পরদিন আমরা ভগ্নহৃদয়ে গেস্টহাউসে ফিরে এসে সিকদারকে সব জানালাম। এবার রণকৌশল নতুন করে ভাবার সময় এল। তবে সে কাজটা সিকদার আর সামির ওপর ছেড়ে দেওয়াই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। আমরা ছিলাম বিপ্লবের অনুগত পদাতিক সৈনিক মাত্র। এবার আমাদের দৃষ্টি পূর্ব দিকে ফিরল। মানে, বার্মা আর সে দেশের কমিউনিস্ট পার্টির দিকে। নাফ নদীর ওপারে লড়াই করে পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ কমরেডদের কাছ থেকে আমাদের কিছুটা দিকনির্দেশনা আর সাহায্য দরকার ছিল।

পরবর্তী করণীয় কী হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আমরা সময় কাটাচ্ছিলাম। তখন লক্ষ করলাম সিকদার আর সামি আজমি এক অপরিচিত লোকের সঙ্গে কী নিয়ে যেন কথা বলছে। লোকটি ছিল বার্মার, মানে আজকের মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের একজন রোহিঙ্গা। সে দাবি করেছিল যে বার্মার কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি-হোয়াইট ফ্ল্যাগ) সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে। এই লোকটি আমাদের সেখানে নিয়ে গিয়ে বার্মিজ কমরেডদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে রাজি হলো। ‘সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদ’-এর চেতনায় আমরা কমিউনিস্ট পার্টি অব বার্মার (সিপিবি) কাছ থেকে দিকনির্দেশনা, প্রশিক্ষণ আর সহযোগিতার আশা করছিলাম। সুড়ঙ্গযুদ্ধের মতোই তাত্ত্বিকভাবে এই পরিকল্পনাও বেশ চমৎকার মনে হয়েছিল।

এবার নাফ নদী পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হলো। রাতের আঁধারে সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে যাওয়ার এই কাজ ছিল অবৈধ, বিপজ্জনক তো বটেই। ওই পয়েন্টে নদীটি দু-তিন কিলোমিটার চওড়া।

এক ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে আমরা দুটি সাম্পানে চড়ে বসলাম। নদীটি সিরাজ সিকদারের বাসভবনের মাত্র কয়েক মিটার পেছন দিয়েই বয়ে যাচ্ছিল। আমার মনে বেশ ভয় কাজ করছিল। উত্তাল ঢেউয়ের ওপর দিয়ে আমাদের যেতে হবে। নদীর মোহনা বা সাগরের মিলনস্থলটিও ছিল ওখান থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। তার ওপর আরেকটা বড় সমস্যা ছিল। আমি বা আমার ভাই—কেউই সাঁতার জানতাম না। এ ছাড়া জলপথ বা স্থলপথ, যেকোনো জায়গায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ভয় তো ছিলই।

প্রায় এক ঘণ্টা পার হলো। সেই সময়টাই আমাদের কাছে অনন্তকাল মনে হচ্ছিল। আমরা নাফ নদীর পূর্ব পাড়ে অর্থাৎ বার্মা সীমান্তে পৌঁছালাম। সীমান্ত টহলদারদের নজর এড়াতে আমরা খুব ধীরে নিঃশব্দে নৌকা থেকে নামলাম। এমন সন্তর্পণে, এমনকি বাতাস যেন খুব বেশি না নড়ে। পিঠে ব্যাগ নিয়ে গোড়ালিসমান পানি ভেঙে আমরা একটা গাছের ছায়ার নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। তখন আমাদের পেটে প্রচণ্ড খিদে। রওশন আরা আমাদের জন্য চাপাতি, গুড় আর চা প্যাক করে দিয়েছিলেন। সেই ব্যাগ থেকে খাবার বের করলাম। তবে একের পর এক চমক আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। তার প্রথমটি হলো যখন আমাদের মেজবানরা, মানে গাইডরাই আমাদের সেই যৎসামান্য রেশনে ভাগ বসাতে শুরু করল। ভরপেট খেয়ে একটা জম্পেশ ঢেকুর তুলে আমাদের গাইডরা কোথাও অদৃশ্য হয়ে গেল কে জানে। আর আমরা সবাই একজোট হয়ে কুঁকড়ে বসে রইলাম। জানি না সামনে আর কী অপেক্ষা করছে।

অল্প সময় পরেই তারা ফিরে এল। আমাদের হাঁটিয়ে নিয়ে গেল একটা ছোট ফাঁকা জায়গায়। সে জায়গা দৈর্ঘ্য-প্রস্থে হবে বড়জোর পঞ্চাশ বাই কুড়ি মিটার। জায়গাটি তিন দিক থেকে ছোট ছোট পাহাড় দিয়ে ঘেরা। সেখানে আমাদের ফেলে রেখে তারা আবার উধাও হয়ে গেল। শিগগিরই নতুন দিনের আলো ফুটল, কিন্তু পাহাড়ের ছায়ায় আমাদের সেই গোপন কোণে সূর্যের আলো পৌঁছাচ্ছিল না বললেই চলে। দুপুরের দিকে কিছু গ্রামবাসী আমাদের জন্য খাবার নিয়ে এল। বাড়িতে রান্না করা চমৎকার গরম ভাত আর মুরগির মাংস। স্থানীয় এই রোহিঙ্গা মুসলমানরা মুখে বিশেষ কিছু বলছিল না। কিন্তু দেখতে পাচ্ছিলাম যে তাদের চোখে আমাদের নিয়ে এক অদ্ভুত কৌতূহল খেলে যাচ্ছিল।

রাতেও তারা আমাদের জন্য খাবার নিয়ে এল। পরের দিনও এর পুনরাবৃত্তি ঘটল। অবশেষে তৃতীয় দিনে তারা মুখ খুলল। আমরা যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে তারা আমাদের কাছে জানতে চাইল, আমরা এই ‘খারাপ লোকগুলোর’ পাল্লায় কেন আর কীভাবে পড়লাম? তাদের কথা যদি বিশ্বাস করি, অবিশ্বাস করার কোনো কারণ ছিল না, বার্মিজ কমিউনিস্টদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার জন্য ওই ‘মধ্যস্থতাকারীরা’ আসলে ছিল এক ডাকাতের দল। এই অসহায় দরিদ্র গ্রামবাসীকে দিয়ে ওই ডাকাতেরাই আমাদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করছিল। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ অস্পষ্টভাবে এমন কিছু সন্দেহ করতে শুরু করেছিল। গ্রামবাসীর কথায় তার সত্যতা মিলল। আমরা লক্ষ করেছিলাম যে ওই লোকগুলো সব সময় নিজেদের কেমন গুটিয়ে রাখত। ওদের আচরণও কেমন রহস্যজনক মনে হতো। যেমন অন্ধকারে কেউ আসার আওয়াজ পেলেই তারা পরিচয় জানার জন্য হাঁক দিত, ‘ইবা খোন?’ মানে, ‘কে রে?’ আর তার সঠিক উত্তর বা সংকেত ছিল, ‘ইবা রশিদ’, মানে ‘আমি রশিদ’। অন্তত আমাদের অবস্থানকালে এটাই ছিল তাদের পাসওয়ার্ড।

স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে, তবে তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় আমাদের গ্রামবাসী মেজবানরা খুব চিন্তিত মুখে আমাদের কাছে এল। তারা আমাদের তৎক্ষণাৎ সব গুছিয়ে নিয়ে তাদের সাহায্যে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিল। তারা জানাল যে ডাকাত দল ওই রাতেই আমাদের অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এই দরিদ্র মানুষগুলো আমাদের সীমান্ত পার করে দেওয়ার জন্য নিজেদের জীবন বিপন্ন করতেও প্রস্তুত ছিল। সিংহের মতো বড় হৃদয়ের এই ‘ছোট’ মানুষগুলো শুধু বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে আমাদের পাহারা দিয়ে বের করে আনল।

পথে আমরা তাদের গ্রামে সামান্য সময়ের জন্য থামলাম। তারা চাইল আমাদের মধ্যে কেউ একজন যেন তাদের সঙ্গে একটি বাড়িতে যায়। কারণ, ওখানকার নারীরা আমাদের শুভকামনা জানাতে চান এবং আমাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য দোয়া করতে চান। আবু সাঈদ (ওরফে জামান) যাওয়ার জন্য রাজি হলো। ফিরে এসে ও আমাদের জানাল, আমাদের বিপদ আর অসহায় অবস্থার কথা শুনে ওই নারীরা অঝোরে কাঁদছিলেন।

সেই অন্ধকার রাতে আমরা আবার হাঁটা শুরু করলাম। চারপাশের থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেই খবর এল যে ডাকাতেরা আমাদের পালানোর কথা জেনে পিছু নিয়েছে। বুক ধড়ফড়ানি আর হাঁটার গতি বাড়তে লাগল সমানতালে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা নদীর পাড়ে এক ঘুমন্ত গ্রামে পৌঁছালাম। এক মাঝিকে ঘুম থেকে জাগিয়ে নদী পার করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। আমাদের উদ্ধারকারীরা আমাদের বিদায় জানাল। তবে বলল যে আমরা নিরাপদে ওপারে না পৌঁছানো পর্যন্ত তারা নদীর পারেই অপেক্ষা করবে। সিকদারের আস্তানার কয়েক কিলোমিটার উত্তরে আমরা নিরাপদে নামলাম। তারপর হেঁটে ফিরে এসে আরও একটি ‘ব্যর্থ অভিযানের’ খবর দিয়ে তাঁকে চমকে দিলাম।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক হলো। সিদ্ধান্ত হলো যে আমাদের একেবারে গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। অন্য কথায়, শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের, মানে সর্বহারা শ্রেণির সঙ্গে থেকে আর কাজ করে আমাদের নিজেদের ‘শ্রেণিচেতনা’র পুনর্গঠন করতে হবে। এই কাজের জন্য চট্টগ্রামের চেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না। টেকনাফ থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উত্তরের এই শিল্পনগরীতে ছিল বিশাল এক শ্রমিক এলাকা।

কয়েক দিন পর আমরা চট্টগ্রামে পৌঁছালাম। সামি আমাদের নেতা। ওর নেতৃত্বে আমরা রাতে থাকার জন্য একটি সস্তা হোটেলে উঠলাম। পরদিন খুব ভোরে উঠে দেখি, কমরেড মতিউর রহমানের বিছানা খালি। সেখানে একটা চিরকুট পড়ে আছে, যার সারমর্ম হলো, ‘দুঃখিত কমরেডগণ, আমার আর সহ্য হচ্ছে না।’ দলত্যাগের কারণে আমাদের শক্তি তখন অনেকটাই কমে এসেছে। সেই অবস্থাতেই আমরা ঢাকা থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিক পরিচয় দিয়ে একজনের কাছ থেকে একটি অব্যবহৃত দোকানঘর ভাড়া নিলাম। আমাদের চেহারা দেখে মালিকের মনে শুরুতেই খটকা লেগেছিল। পরে যখন তিনি দেয়ালের তাকে মার্কস, লেনিন আর মাওয়ের বই গোঁজা দেখলেন, তখন তাঁর সন্দেহ আরও ঘনীভূত হলো। সেখানে কয়েক দিন থেকে শ্রমিকদের সঙ্গে থাকার সুযোগ খুঁজতে লাগলাম। শেষমেশ এক শ্রমিক কলোনিতে মাটি আর খড়ের তৈরি একটা ছোট ঝুপড়িঘর খুঁজে পেলাম। এখানেও শ্রমিকদের শিক্ষিত করে তোলার এবং শ্রেণিসংগ্রামের জন্য তাদের সংগঠিত করার আমাদের প্রচেষ্টা খুব একটা হালে পানি পেল না। কোনো কাজ পেলাম না। টিকে থাকার মতো কোনো রসদও নেই আমাদের হাতে। আর কোনো বিকল্প পথ খোলা রইল না।

কয়েক দিন পর সিদ্ধান্ত হলো যে আমরা ঢাকায় ফিরে যাব। তবে তার আগে টেকনাফে গিয়ে সিকদারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আমি বাসে কক্সবাজার গেলাম। সেখান থেকে আরেক বাসে চড়ে নাফ নদীর মোহনায় পৌঁছালাম। জোয়ারের সময় সেখান থেকে টেকনাফ যেতে লঞ্চে ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগে। টেকনাফ পৌঁছে আমাকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে আরও কয়েক কিলোমিটার উত্তর দিকে হাঁটতে হলো। বাঁ পাশে গহিন বনের পাহাড়গুলো যেন ভয়ংকর ফণা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল। জীবনে এমন আতঙ্কজনক পথে খুব কমই চলেছি। হয়তো এক ঘণ্টার কম সময় লেগেছিল। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছিল সময় যেন আর ফুরাচ্ছে না।

আমি সিকদারের কাছে মৌখিকভাবে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব পেশ করলাম। তিনি তাতে রাজি হলেন। আমাদের প্রথম বিপ্লবী অভিযানটি সবদিক দিয়েই ব্যর্থ হলো। কিন্তু চেয়ারম্যান মাও কি বলেননি যে একটিমাত্র পদক্ষেপে হাজার মাইলের দীর্ঘ অভিযাত্রা শুরু হয়? বিপ্লবের প্রতি আমাদের আস্থা ছিল অগাধ। ছিল সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে বিশ্বাস। আমরা ভাবতাম, একদিন আমাদের জয় হবেই! তবে আপাতত সেই সুদীর্ঘ বিপ্লবী যাত্রার বাকি পথটুকু কোনো এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখাই শ্রেয় মনে হলো। আর সত্যি বলতে কি, ব্যক্তিগতভাবে আমি তখন পরিবারের কাছে ফিরে গিয়ে আবারও পড়াশোনা শুরু করার জন্য মনে মনে বেশ মুখিয়ে ছিলাম।

এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে বিপ্লব কোনো ছেলেখেলা নয়। একদল নিবেদিতপ্রাণ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যুবক চাইলেই চটজলদি এর সমাধান করে ফেলবে—বিষয়টি তেমনও নয়। আমাদের টেকনাফ অভিযানের ঝুলি ছিল প্রায় শূন্য। প্রাপ্তি বলতে ছিল কেবল ক্ষতবিক্ষত হাত আর ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া কিছু মোহ। আমাদের আদি দলটি তখন ছত্রভঙ্গ। মনোবল ছিল একদম তলানিতে। একদিন শান্ত সন্ধ্যায় সিরাজ সিকদারের রামপুরার বাসার লনে এক অনুপ্রেরণামূলক আলোচনার পর সামি আর আমি তাঁর সঙ্গে রক্ত দিয়ে এক শপথনামায় স্বাক্ষর করলাম। আমাদের অঙ্গীকার ছিল, বিপ্লবের পথে আমরা একসঙ্গে থাকব। নিজেদের এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হবে বিপ্লব, যে বিপ্লব কিনা ‘অনিবার্য’।

সেই অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে আমরা কেবল তিনজনই উপস্থিত ছিলাম। ছদ্মনামে সেই শপথনামায় সই করেছিলাম। সিরাজ সিকদার প্রথমে সই করলেন। নিজের জন্য তিনি নাম বেছে নিলেন ‘রুহুল আলম’ (পরে হাকিম ভাই)। সামি পছন্দ করল ‘রুহুল আমিন’ (তাহের)। আমি নিজের জন্য কোনো নাম ঠিক করার আগেই সিকদার ‘রুহুল কুদ্দুস’ নামটির প্রস্তাব দিলেন। আমাদের তিনজনের নামের শুরুতেই এই ‘রুহুল’ শব্দটি আমাদের ঘনিষ্ঠ কমরেডদের ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হয়ে থাকবে—এমনটাই আমরা আশা করেছিলাম। আমি রক্ত দিয়ে সই ঠিকই করেছিলাম, কিন্তু তাতে আমার মন সায় দিচ্ছিল না। বড় ভাইয়ের প্রভাবে আমার ভেতরে যে বিপ্লবী উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল, তা ওই সময় নিউটনের গতির প্রথম সূত্রের মতো কেবল গতিজড়তা নিয়ে টিকে ছিল। এটি যে ধীরলয়ে কিন্তু নিশ্চিতভাবেই নিভে আসছিল, তা আমি টের পাচ্ছিলাম।

১৯৬৮ সালের শেষার্ধের দিকে তরুণ বিপ্লবীদের আকৃষ্ট করতে আর তাদের পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি উন্মুক্ত ফোরাম বা প্ল্যাটফর্ম তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলের গোপন কার্যক্রম আড়াল করতে আর নতুন সদস্য সংগ্রহের কৌশল হিসেবে গড়ে তোলা হলো ‘মাও সে–তুং চিন্তাধারা গবেষণাকেন্দ্র’। আমার মনে আছে, মালিবাগে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান কার্যালয়ের একদম কাছেই এক মালিকের সঙ্গে দরদাম করে একটি খালি দোকানঘর ভাড়া নিয়েছিলাম। তারপর বড় একটা সাইনবোর্ড তৈরি করতে দিলাম। তাতে বাংলায় লেখা হলো ‘মাও সে–তুং চিন্তাধারা গবেষণাকেন্দ্র’।

সিরাজ সিকদার কখনো এই কেন্দ্রে আসতেন না। সামিই ছিল এর অঘোষিত প্রধান। সে মাঝেমধ্যে আসত, বিশেষ করে শুরুর দিকে। তবে আমিই সেখানে বেশি সময় দিতাম। স্তালিনীয় স্টাইলের গোঁফওয়ালা ফজলুল হক রানা ছিলেন এই কেন্দ্রের অন্যতম ‘আলোকবর্তিকা’। তিনি সিকদারের প্রথম দিককার অনুসারী। তাঁর সহপাঠীও ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে। টেকনাফ আর বার্মা অভিযানেও তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এখানে মুস্তাফিজুর রহমানের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। তিনি সিকদার ও রানা—দুজনেরই সহপাঠী ছিলেন। বেশ অদ্ভুত ও অলস প্রকৃতির এই ছদ্মবিপ্লবী নিজেকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শের বড় মাপের তাত্ত্বিক মনে করতেন। রহমানের কাছে বিশাল এক রেজিস্টার খাতা ছিল। সেই খাতায় তিনি নিজের নীতিবাক্য আর চিন্তাভাবনার সঙ্গে পাঁচ মহান নেতার—কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ভ্লাদিমির লেনিন, জোসেফ স্তালিন ও মাও সে–তুংয়ের উদ্ধৃতি লিখে রাখতেন। সাংগঠনিক কাজে তাঁর ভূমিকা ছিল শূন্য। সেই ব্যক্তিগত ডায়েরিই ছিল বিপ্লবী আন্দোলনে তাঁর একমাত্র অবদান।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় কয়েক ঘণ্টার জন্য আমরা ‘গবেষণাকেন্দ্র’টি খুলতাম। এর কোনো নির্দিষ্ট গঠনতন্ত্র, ইশতেহার বা এজেন্ডা ছিল না। এই কেন্দ্র ছিল মূলত প্রগতিশীল চিন্তার মানুষের আড্ডা দেওয়ার একটা জায়গা। গবেষণাকেন্দ্রে আসবাবপত্র বলতে তেমন কিছুই ছিল না। মেঝেতে বিছানো ছিল কিছু চট আর তাকে সাজানো ছিল আমাদের পাঁচ মহান নেতার রচনাবলি। তবে মাও সে–তুংয়ের বই-ই ছিল বেশি। দেয়ালজুড়ে শোভা পেত তাঁদের বাঁধানো ছবি। ছাত্র ইউনিয়নের (ইপসু) মতো অন্যান্য বামপন্থী সংগঠন—তা সে পিকিংপন্থী বা মস্কোপন্থী যা–ই হোক না কেন, আমাদের বিদ্রূপ করে ‘টেস্টটিউব গ্রুপ’ বলে ডাকতে শুরু করল। মাসখানেক পর আমি আর সামি দুজনেই ভিন্ন ভিন্ন কারণে পর্দার আড়ালে চলে গেলাম। সামি আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ল আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। আর আমি ক্রমেই আমার পড়াশোনার দিকে মন দিতে লাগলাম। গবেষণাকেন্দ্রের দায়িত্ব নিল নতুন কিছু কর্মী।

আমাদের পরবর্তী বড় উদ্যোগ ছিল ‘পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন’-এর প্রথম কংগ্রেস। সংগঠনটি ছিল মূলত ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’র পূর্বসূরি। ১৯৬৯ সালের ৮ জানুয়ারি ঢাকার সদরঘাটের ঠিক ওপারে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় সেই কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এক স্থানীয় হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার তাঁর বাড়িটি ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। সদ্য যোগ দিয়েছেন আমাদের সঙ্গে। কংগ্রেস অত্যন্ত গোপনে করা হলেও সেখানে একধরনের উৎসবের আমেজ ছিল। সিরাজ সিকদার ছিলেন সেই আয়োজনের প্রধান নেতা। সামি ছিল তাঁর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হবে জেনে আমি সামিকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললাম, আমাকে যেন কোনো পদে না রাখা হয়। তাকে বুঝিয়ে বললাম যে আমি এই কাজে পুরোপুরি সময় বা একাগ্রতা দিতে পারছি না, তবে সাধ্যমতো সাহায্য করতে রাজি আছি। সামি খুব হতাশ হলো। শেষমেশ ওর পীড়াপীড়িতে আমি ‘ঢাকা আঞ্চলিক সাংগঠনিক কমিটি’র একজন সদস্য হতে রাজি হলাম।

এটাই ছিল সর্বহারা পার্টির সঙ্গে আমার সম্পর্কের মোড় পরিবর্তনের সময়, কিংবা বলা ভালো সম্পর্কচ্ছেদের শুরু। অন্যদিকে সামি ঠিক উল্টোপথে ছুটল। বিপ্লবী কাজ থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ ছিল না তার। ধীরে ধীরে দীর্ঘ সময়ের জন্য সে ঘরছাড়া হতে শুরু করল। মাঝেমধ্যে ফিরে এলেও রাত কাটাত না। একসময় এমন দিন এল, যখন সে বাড়িতে ফোন করাও বন্ধ করে দিল। সে তখন পুরোদস্তুর বিপ্লবী। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছিল দলের গোপন সাংগঠনিক কাজ। পার্টির সঙ্গে আমার শেষ দায়সারা অংশগ্রহণ ছিল সিরাজ সিকদার ও সামির সঙ্গে গোপালগঞ্জ এলাকায় একটি সাংগঠনিক সফরে যাওয়া। মাদারীপুর হয়ে স্টিমারে করে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। এলাকাটিতে হিন্দু জনগোষ্ঠীর আধিক্য ছিল। আমরা সেখানে এক প্রভাবশালী হিন্দু পরিবারের আতিথ্য নিয়েছিলাম। ফেরার পথে গোয়ালন্দঘাটে মা-বাবার সঙ্গে কয়েক দিন কাটিয়ে ঢাকা ফিরি আমি।

আমি পড়াশোনায় ফিরে এলাম। পার্টির সঙ্গে সব সম্পর্কও প্রায় চুকিয়ে ফেললাম। তবে খিলগাঁওয়ে সিকদার আর সামির ডেরায় কয়েকবার ওদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। নিম্নমধ্যবিত্ত সেই এলাকায় এই ডেরা ছিল বাঁশ আর শণের তৈরি দুই কক্ষের একটি বাসা। ছাদের ঠিক নিচেই একটি তাকে সাজিয়ে রাখা হাতে বানানো কয়েকটি পেট্রলবোমা আমার নজরে এল, যাকে বলে মলোটভ ককটেল। তবে পুলিশের অভিযানের বিরুদ্ধে এগুলো কতটা কার্যকর হতো, তা নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল। হয়তো কিছু আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল। সেগুলো ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। আমি ওদের আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহের জন্য সম্ভাব্য অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে শুনতাম। হাতে গোনা কয়েকজন বিশ্বস্ত কমরেড সেখানে আসা-যাওয়া করতেন। আমি ছিলাম একমাত্র ব্যতিক্রম। বিশ্বস্ত তো বটেই, তবে আমি তখন আর তাঁদের ‘কমরেড’ নই।

সেই সফরের সময়েই আমি প্রথমবারের মতো কমরেড খালেদা (ওরফে বুলু) এবং জাহানারাকে (রাহেলা) দেখি। খালেদা শিগগিরই সামির স্ত্রী হতে যাচ্ছিলেন। জাহানারা একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছিলেন সিকদারের জীবনে। সিকদার তখন তাঁর স্ত্রী রওশন আরাকে ত্যাগ করেছেন। শিখা নামে তাঁদের একটি কন্যাসন্তান ছিল। টেকনাফে সেই মেয়ের জন্মের সময় সিকদার আর আমি ছাড়া কেউ সেখানে উপস্থিত ছিল না। সিকদার নিজেই তখন দাইয়ের ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই সময় আমার সেখানে থাকা ছিল নিছক এক কাকতালীয় ঘটনা। সামির একটি মৌখিক বার্তা নিয়ে আমি দু-এক দিনের জন্য সিকদারের কাছে টেকনাফে গিয়েছিলাম। খালেদা ছিলেন পার্টির এক শুভাকাঙ্ক্ষী কালামের বোন। আমার সঙ্গে কালামের দেখা হয়েছিল মাত্র একবার। তাঁর বোন আমার ভাইয়ের সঙ্গে ঘর ছেড়েছেন শুনে তিনি আমার কাছে ছুটে এসেছিলেন। খালেদা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাঁর ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। কালাম অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে তাঁর এই ‘বিপ্লবীমনা’ বোনকে সামির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন তিনি আতঙ্কে অস্থির। পরিবার এই ঘটনার জন্য তাঁকেই দায়ী করবে।

খালেদা যে নিজের ইচ্ছাতেই চলে গেছে, সেটা স্বীকার করেও কালাম তাঁর বোনের সঙ্গে কথা বলার জন্য আমার সাহায্য চাইলেন। আমি তাঁকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারিনি। কালামের কাছে যা শুনলাম, তার বাইরে আমি নিজেও তখনো কিছুই জানতাম না। পরে যখন খিলগাঁওয়ের গোপন আস্তানায় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে পুরো বিষয় জানতে চাইলাম, সেখানেই প্রথমবারের মতো খালেদার সঙ্গে আমার দেখা হলো। সে তার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার বা পরিবারে ফিরে যাওয়ার কোনো যুক্তিই খুঁজে পাচ্ছিল না। অন্যদিকে আমি ‘প্রতিক্রিয়াশীল আর প্রতিবিপ্লবীদের’ চাপে পড়েছি ভেবে সিরাজ সিকদার ভাবলেন, এটাই আমাকে আবার বিপ্লবীদের কাতারে ফিরিয়ে আনার মোক্ষম সুযোগ। সামি আর বাকিদের সামনেই তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি আর কত দিন এ রকম দোলাচলে থাকবে? তোমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসে গেছে।’ আমি শুধু হাসলাম। কিছুই বললাম না। সিদ্ধান্ত আমি আগেই নিয়ে ফেলেছিলাম। এটা স্পষ্ট ছিল যে এই বিভাজনের দুই পাশে পা দিয়ে চলা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। আমার ভাইয়ের এই গোপন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কারণে মা-বাবার মানসিক যন্ত্রণা আমি দেখছিলাম। তাতে নিজের সম্পৃক্ততা বজায় রেখে তাঁদের সেই দুঃখ আরও বাড়ানো আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল। তা ছাড়া এই পথ ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

এর বাইরেও আমি সব সময়ই সহিংসতা অপছন্দ করতাম। মার্কস বা মাওয়ের উদ্দীপনামূলক উদ্ধৃতি যা-ই বলুক না কেন, ন্যায়বিচার বা সুন্দর সমাজের মতো মহৎ কিছু অর্জনের জন্যও সহিংস পথ বেছে নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে আমার মনে গভীর সন্দেহ ছিল। এ ছাড়া আমি ইতিমধ্যেই কিছু ব্যাধির প্রাথমিক উপসর্গগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত সেসব ব্যাধি সব বিপ্লবী-আদর্শিক আন্দোলনে, বিশেষ করে গোপন সংগঠনগুলোতে দেখা যায়। ধীরগতিতে হলেও নিশ্চিতভাবেই নেতার চারপাশে একধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক আদর্শ গড়ে ওঠে, যেকোনো ভিন্নমতকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হয় এবং যারা ভিন্নমত পোষণ করে, তাদের ‘গাদ্দার’ বা শত্রুর ‘এজেন্ট’ আখ্যা দিয়ে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াকে জায়েজ মনে করা হয়। সিরাজ সিকদার ঠিক সেই পথেই হাঁটছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে জোসেফ স্তালিনের আমলের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দেওয়ার জন্য অনেকভাবেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হতো। আমি সেসব ত্রাসের কাহিনি কখনোই মেনে নিতে পারিনি।

১৯৬৬ সালে শুরু হওয়া চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু তার সঙ্গে জড়িত উচ্চপদস্থ বিপ্লবী নেতাদের যেভাবে নিন্দা ও অপমান করা হচ্ছিল, তা মেনে নেওয়া আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। চীনে ‘প্রতিবিপ্লবীদের’ নির্মূল করার প্রক্রিয়াটা ঘটছিল সমসাময়িক সময়েই। মাও সে–তুংয়ের ঠিক পরেই যাঁর অবস্থান ছিল, সেই লিউ শাওচি বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত হলেন। তখন আমার মনে এমন কিছু প্রশ্ন জাগল, যার কোনো সন্তোষজনক উত্তর আমি কখনো পাইনি। আমার সেই ধাক্কাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল বার্মার কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং একে অপরকে সরিয়ে দেওয়ার খবরগুলো। অথচ আমরা শুরুতে এই দলটির কাছেই দীক্ষা নিতে চেয়েছিলাম! তাদের এই কোন্দলের ফলেই ১৯৬৮ সালে দলের চেয়ারম্যান থাকিন থান তুন খুন হন। আমরা সে খবর পিকিং রিভিউর মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম এক বছরের বেশি সময় পরে।

এদিকে সামি আজমি তখন সর্বহারা পার্টির গভীরে ঢুকে গেছে। তার চোখেমুখে একধরনের ধর্মপ্রচারকসুলভ তেজ। বিপ্লবই তখন তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। পার্টিই ছিল তার ঘর, আর কমরেডরাই পরিবার। এমনকি সে এখন বিয়েও করেছে একজন সহবিপ্লবী খালেদাকে। সামি আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের একটি নির্দিষ্ট রুমে দেখা করার খবর পাঠাল। সেটা ছিল ১৯৭০ সালের ৫ মে। আমি রুমে ঢুকে দেখি সে তার কয়েকজন কমরেডের সঙ্গে বসে মলোটভ ককটেল তৈরির শেষ মুহূর্তের ঘষামাজা করছে। তাদের মধ্যে ছিল ফজলুল হক রানা, রুকনউদ্দিন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্র) আর ফারুক ভাই (মেডিক্যাল ছাত্র)। শেষের দুজন ছিল নতুন রিক্রুট। তারা বোমাগুলো সাধারণ, সাদামাটা শপিং ব্যাগে ভরে নিল। সামি তখন তার জনাদশেক কর্মীকে নিয়ে সলিমুল্লাহ হলের উল্টো দিকের বাসস্ট্যান্ডের দিকে রওনা দিল। তাদের কয়েকজনের হাতে ছিল সেই ব্যাগগুলো। তারা কোথায় যাচ্ছে বা কেন যাচ্ছে, তা না জিজ্ঞেস করেই আমি রাস্তা পার হয়ে উল্টো দিকের বাসে উঠে মোহাম্মদপুরে আমার বোনের বাসায় চলে গেলাম। আমি তখন সেখানেই থাকতাম।

খালেদা, ওরফে বুলু: সামি আজমির স্ত্রী ও সহবিপ্লবী

সেদিন সন্ধ্যায় একজন খবর নিয়ে এল যে আমাকে বাসার কাছের গলির মোড়ে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে সামিকে দেখতে পেলাম। তার মুখে তৃপ্তির হাসি। সে আমাকে ঢাকার কেন্দ্রস্থলে তোপখানা রোডে অবস্থিত ‘পাকিস্তান কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’-এ সফল অগ্নিসংযোগের কথা শোনাল। সে নিজে নেতৃত্ব দিয়ে একদল কর্মীকে নিয়ে পাকিস্তান কাউন্সিলের ওপরতলার লাইব্রেরিতে ঢুকেছিল। দুজনকে রাখা হয়েছিল নিচে গেটে পুলিশের ওপর নজর রাখার জন্য আর লোকজনকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেওয়ার জন্য। লাইব্রেরির কর্মকর্তা, কর্মচারী ও পাঠকদের উদ্দেশে সে সংক্ষিপ্ত এক বক্তৃতা দেয়। বলা হয় যে এই পাকিস্তান কাউন্সিল হলো পূর্ব বাংলার মানুষকে গোলাম করে রাখার ‘পাকিস্তানি উপনিবেশবাদের’ একটি হাতিয়ার। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তাদের সরে দাঁড়াতে বলে সামি আর তার কমরেডরা বোমাগুলো ছুড়ে মারে। তারপর তারা দ্রুত ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে বাসে চড়ে এলাকা ত্যাগ করে। পাশের ভবনে ছিল ‘ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিস’ (ইউএসআইএস)। সেখানকার চমৎকার লাইব্রেরিতে আমরা প্রায়ই যেতাম। অন্য একটি দল সেখানেও একই ধরনের অভিযান চালায়। তবে তা খুব একটা জোরালো বা সফল হয়নি। তাদের উদ্দেশ্য কাউকে আঘাত করা ছিল না। কেউ আহতও হয়নি।

‘বিপ্লবী সহিংসতা’র এই কাজের জন্য ৫ মে তারিখটি বেছে নেওয়ার কারণ ছিল বেশ অদ্ভুত। ওটা ছিল কার্ল মার্কসের জন্মদিন। তারা তখন পুরোপুরি প্রস্তুত। অ্যাকশন করার জন্য মরিয়া। তাই সম্ভবত অ্যাকশন শুরু করার জন্য মার্কসের ১৫২তম জন্মবার্ষিকীর চেয়ে ঐতিহাসিক বা অর্থবহ আর কোনো তারিখ খুঁজে পায়নি। অথচ চরমপন্থী মার্কসবাদীরাও সম্ভবত এই তারিখটি সম্পর্কে সচেতন নন। পূর্ব বাংলা বা এখানকার মানুষের কাছে এই তারিখটির কোনো প্রাসঙ্গিকতা না থাকলেও সর্বহারা পার্টি একে বেছে নিয়েছিল নিজেদের পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক শক্তিমত্তা জাহির করার উদ্দেশ্যে। তারা জানান দিতে চেয়েছিল যে তারা আর ‘টেস্টটিউব গ্রুপ’ নয়, বরং পূর্ব বাংলার মানুষকে ‘উপনিবেশবাদের জোয়াল’ থেকে ‘মুক্ত’ করার জন্য ‘বিপ্লবী’ সহিংসতা ঘটাতে প্রস্তুত। আর তারা যেমনটি চেয়েছিল, পরদিন খবরের কাগজগুলোর প্রথম পাতায় এই খবরটি বড় করে ছাপা হলো। পূর্ব পাকিস্তানে এই ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড এটাই ছিল প্রথম। তবে জামায়াতে ইসলামীর বাংলা মুখপত্র সংগ্রাম এই ঘটনায় তাদের নিজস্ব রং চড়াল। তারা মিথ্যা দাবি করে জানাল যে আক্রমণকারীরা নাকি পবিত্র কোরআন রাখা তাকগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর সিদ্দিক সালিক তখন সামরিক তথ্য বিভাগে কাজ করতেন। ভুলবশত এই হামলার জন্য তিনি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের’ দায়ী করে এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের যোগসূত্র আছে বলে ইঙ্গিত দেন।

তারপর আমার ভাইয়ের সঙ্গে শেষবারের মতো আমার দেখা হয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক ওয়ার্ডে। কমরেড খালেদা ‘অপহরণ’ মামলার সহযোগী হওয়ার মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার এড়াতে আমি তখন অসুস্থতার ভান করে সেখানে ভর্তি হয়েছিলাম। সামি এসেছিল টাকার খোঁজে। আমি তাকে বললাম, আমার স্কলারশিপের কিছু টাকা জমা আছে, সে টাকা আমি পরে তুলে দিতে পারব। কিন্তু সে তখনই টাকার জন্য জেদ ধরল। ফলে হাসপাতালের নিয়ম ভেঙে আমি সামির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে আমার ছয় মাসের বকেয়া স্কলারশিপের টাকা তুললাম। সেই টাকা নিয়ে সামি হাসিমুখে বিদায় নিল। আমি আগের চেয়ে কিছুটা নিঃস্ব হয়ে চুপিচুপি হাসপাতালের বিছানায় ফিরে গেলাম।

এর কিছুদিন পর সামি নিজে এসে মাকে নিয়ে গেল তার কমরেড স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করাতে। ঢাকার উপকণ্ঠ মিরপুরে এক আত্মীয়ের বাসায় সে তখন অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছিল। যাওয়ার পথে সে আম্মার কাছে অনুরোধ করল তাঁর পুত্রবধূর জন্য বিয়ের একটা উপহার দিতে। যদিও সেই ‘বিয়েতে’ মায়ের দাওয়াত পর্যন্ত ছিল না, তবু তিনি সানন্দে নিজের সোনার হারটি খুলে দিলেন। তিনি জানতেন না যে এই হার আসলে জমা হবে পার্টির তহবিলে।

শাশুড়ির সঙ্গে সেই একমাত্র সাক্ষাতের দুটি স্মৃতি খালেদার এখনো মনে আছে, ‘চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল। আম্মা আমাকে বলছিলেন, “তুমি আমাদের সঙ্গে চলে এসো। তুমি এলে সে–ও তোমার সঙ্গে আসবে। এত কষ্ট করে এসবের মধ্যে তোমরা থাকবে কী করে?”’ যতটা সম্ভব বিনয়ের সঙ্গে তারা দুজনই সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। ছেলেকে তার এই বিপজ্জনক বিপ্লবী জীবন ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে ব্যর্থ হয়ে মা তাঁর সাধ্যমতো শেষ চেষ্টাটি করলেন। তিনি পবিত্র কোরআনের একটি ছোট দোয়া নিজের হাতে লিখে খালেদাকে দিলেন। বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে এটি পড়লে তারা দুজনেই নিরাপদে থাকবে। কিন্তু খালেদা যখন জানাল যে সে আরবি পড়তে জানে না, তখন মা ভেঙে পড়লেন। তাঁর আদরের ছেলে ঘর ছাড়ার পর তিনি প্রতি রাতে তার জন্য জায়নামাজে চোখের জল ফেলতেন। এই দেখা হওয়ার অল্প কিছুদিন পরেই চিরতরে হারিয়ে গেল সেই ছেলে। কিন্তু খালেদা বেঁচে ফিরেছিল। আমি জানি না এই খবরে মায়ের কোনো সান্ত্বনা হতো কি না।

১৯৭০ সালে সামি দলের সংগঠন গুছিয়ে পরিধি বাড়াতে দক্ষিণের জেলা বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে লাগল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তথাকথিত ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ ওপর সামরিক হামলা শুরু করে। বিচ্ছিন্নতাবাদীর সংজ্ঞায় তারা বাঙালি দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী, কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী এবং হিন্দুদের এক কাতারে ফেলেছিল। সামি তখন চট্টগ্রামে। সেনাবাহিনীর প্রচণ্ড অভিযানের মুখে সামি খালেদা ও কয়েকজন কমরেডকে নিয়ে রামগড়-ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। পরে সে আবার বেনাপোল-যশোর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসে।

ভারতে থাকাকালে সামি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে খালেদাদের বাড়িতে কিছুদিন সময় কাটিয়েছিল। সেখানে সে তার শাশুড়ির খুব প্রিয় হয়ে ওঠে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, খালেদার মায়ের নামও ছিল আমাদের মায়ের নামে—মেহেরুন্নেসা। আমাদের মায়ের মতোই তিনিও তাঁর মেয়েকে ‘না হওয়া বিয়ের’ উপহার হিসেবে একটি সোনার হার দিয়েছিলেন। অলংকারের এই টুকরোটিও শেষ পর্যন্ত পার্টির তহবিলেই জমা পড়েছিল। এ ছাড়া তিনি তাঁর জামাইকে একটি আংটিও উপহার দিয়েছিলেন।

সামি ঢাকায় ফিরে আবার খালেদাকে নিয়ে মিরপুরে আমাদের এক আত্মীয়ের বাসায় কয়েক দিনের জন্য আশ্রয় নিল। মে মাসের শেষের দিকে তারা মোহাম্মদপুরে আমার বোনের বাসায় দেখা করতে যায়। সামি সম্ভবত তখনই জানতে পারে যে আমিসহ মা-বাবা এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্য পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে চলে গেছি। পূর্ব পাকিস্তানের সেই অনিশ্চিত আর ভয়ংকর পরিস্থিতির কারণেই আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। এর কিছুদিন পর আমাদের বড় ভাই ওয়াসিউল্লাহ এবং আরও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মিরপুরে তাদের সঙ্গে দেখা করেন। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে তাঁরাই তাকে শেষবার দেখেছিলেন। এর অল্প কয়েক দিন পরেই, ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের কোনো এক অজানা তারিখে, ঢাকা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে সাভারে সামিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা ছিল আওয়ামী লীগের অনুসারী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।

১৯৯১ সালে দল প্রতিষ্ঠার ২০তম বার্ষিকী উপলক্ষে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি থেকে প্রকাশিত স্ফুলিঙ্গর এক বিশেষ সংখ্যায় উল্লেখ করা হয় যে ‘সামি আজমির নেতৃত্বে বিভিন্ন জেলায় শূন্য বা প্রায়-শূন্য অবস্থা থেকে পার্টির কাজ বিস্তৃত হয়েছিল…আগস্ট ১৯৭১-এ তাঁর মৃত্যুর ফলে কমরেড সিরাজ সিকদারের বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে পার্টি যে সংকটের মুখে পড়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।’

এভাবেই সামি আজমির সংক্ষিপ্ত কিন্তু অসাধারণ জীবনের অবসান ঘটে। ২৫তম জন্মদিনে পা দেওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। তার জীবনের শেষ দুই বছর বাদ দিলে, আমরা ছিলাম অবিচ্ছেদ্য দুই ভাই, সবচেয়ে ভালো বন্ধু ও কমরেড। সামির অকালমৃত্যুর পর আমাদের মা আরও ২১ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কখনো বিশ্বাস করেননি যে তাঁর ছেলে আর নেই। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে তিনি পরম করুণাময়ের কাছে ছেলের জন্য দোয়া করতেন এই আশায় যে সামি হয়তো কোথাও না কোথাও, কোনো না কোনোভাবে বেঁচে আছে।

যাহোক, ঘটনার ধারাবাহিকতায় ফিরে আসি। হঠাৎ একদিন সকালে পুলিশ আমার খোঁজে দরজায় কড়া নাড়লে আমার সাজানো পৃথিবীটা ওলট-পালট হয়ে গিয়েছিল। আমি যখন চিলেকোঠায় লুকিয়ে ছিলাম। আমার বোন পুলিশকে জানাল যে আমি বাড়িতে নেই। আমাদের অগোচরেই পরিবারের চাপে পড়ে কালাম থানায় একটি এজাহার দায়ের করেছিল। সেখানে সে এমন একটি মিথ্যা দাবি করে যে আমি আর আমার ভাই আরও কিছু অপরিচিত লোক নিয়ে ছুরি-চাপাতিসহ তার বাড়িতে চড়াও হয়ে তার স্ত্রীকে ভয় দেখিয়ে বোনকে অপহরণ করেছি। কালাম খুব ভালো করেই জানত যে এই ঘটনায় আমার কোনো ভূমিকা ছিল না। কিন্তু সে আমাকে মিথ্যাভাবে জড়িয়েছিল আমার ভাইয়ের ওপর চাপ তৈরি করতে; যদি এতে করে তার বোনকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া যায়, সেই আশায়। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে আমি বন্ধুদের বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। আর ওদিকে বাবা একজন আইনজীবী নিয়োগ করলেন। আমরা আদালতে গিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেলাম। বাড়িতে ফেরার সুযোগ পেলাম আমি।

পরবর্তী শুনানির দিন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আমার উকিলের যুক্তিতে খুব একটা সন্তুষ্ট হলেন বলে মনে হলো না। সঙ্গে সঙ্গেই আমার জামিন বাতিল করে দিলেন। আমার হাতে হাতকড়া পরিয়ে আদালতকক্ষ থেকেই সরাসরি হাজতে নিয়ে যাওয়া হলো। আদালতের কাজ শেষ হলে অন্য বন্দীদের সঙ্গে প্রিজন ভ্যানে করে আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হলো। আমি ধরে নিয়েছিলাম যে আমার জামিন বহাল থাকবে। তাই জেলে যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। ম্যাজিস্ট্রেটের এই সিদ্ধান্তে আমি এতটাই স্তম্ভিত হয়েছিলাম যে পুরো বিষয়টি বুঝে উঠতে আমার বেশ সময় লেগেছিল। আমার বন্ধু রেলি আমার সঙ্গে কোর্টে এসেছিল। সে যেকোনো পরিস্থিতিতেই রসিকতা করার স্বভাব ছাড়তে পারল না। পুলিশ যখন আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, সে তখন ঘোষণা দিল যে জেলে বগলে করে রুটি নিয়ে ‘গেঞ্জি’ পরা কর্মীরা আমার রাতের খাবার দিয়ে যাবে।

প্রিজন ভ্যান আমাদের জেলগেটে নামিয়ে দিল। তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। আমাদের শুধু অন্তর্বাস পরে দাঁড়াতে হলো। তারপর সবাইকে গুনে শনাক্ত করে রেজিস্টারে নাম তোলা হলো। তারপর সারিবদ্ধভাবে আমাদের বিভিন্ন ভবনের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আমাদের রাত কাটাতে হবে। দৃশ্যটা ছিল বেশ ভীতিপ্রদ। কিছু বন্দীকে হিংস্র দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল শিকারিদের সামনে কোনো অসহায় শিকারকে ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। মনে সাহস রাখার চেষ্টা করলেও আমার বুক ধড়ফড় করছিল। মেঝের ওপর এক টুকরো কম্বল দেওয়া হলো শোয়ার জন্য। একেক সারিতে প্রায় বিশজন করে তিন-চার সারিতে আমরা গাদাগাদি করে শুয়েছিলাম। মাঝখানে এক মিটারেরও কম ফাঁকা জায়গা। সেখানে কেউ ছিল সাজাপ্রাপ্ত আসামি, কেউ আমার মতোই বিচারাধীন বন্দী।

ভাগ্য ভালো, এমন ভয়াবহ পরিবেশে আমাকে মাত্র এক রাত কাটাতে হয়েছিল। পরদিন আমার বড় ভাই তাঁর পরিচিত লোক খাটিয়ে আমাকে জেল হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। অজুহাত দেওয়া হলো যে আমার নাকি পাকস্থলীতে মারাত্মক অসুখ হয়েছে। হাসপাতালের পরিবেশ কিছুটা ভালো ছিল। তবে সেই মিথ্যা ‘আলসার’-এর চিকিৎসায় আমাকে প্রতি বেলা খাবারের পর একগাদা ওষুধ গিলতে হতো। জেল হাসপাতালে দুই রাত কাটানোর পর একজন সেশন জজ আমাকে জামিনে মুক্তি দিলেন। তবে এটিও ছিল পূর্ণাঙ্গ শুনানি হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন জামিন।

জাহানারা হাকিম: সিরাজ সিকদারের দ্বিতীয় স্ত্রী; সঙ্গে ছেলে বরুণ

উকিল আমাকে পরামর্শ দিলেন কোনো হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যেতে। তাহলে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে স্থায়ী জামিনের আবেদন করা যাবে। সেই একই মিথ্যা অজুহাতে আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলাম। না থাকা এক অসুখের জন্য এক সপ্তাহ সেখানে কাটালাম।

এখানেই একদিন সামি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে তার জরুরি টাকার দরকার ছিল বলে জানিয়েছিল। আমি তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করলাম। আগেই যেমনটি বলেছি, সেই দেখাই ছিল ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। এরপর বাবা একজন সিনিয়র আইনজীবী নিয়োগ করলেন। তিনি আমাকে হাসপাতাল ছাড়ার পরামর্শ দিলেন। তাঁর মতে, হাসপাতালে থাকা মানে জেল থেকে সাময়িক মুক্তি মাত্র। তিনি চেয়েছিলেন কোনো ডাক্তারি কারণ না দেখিয়ে মামলার গুণাগুণ বিচার করে আমার স্থায়ী জামিন ও খালাস আদায় করতে। পরবর্তী শুনানিতে আমার জামিন মঞ্জুর হলো। খালেদার ভাইয়েরা আর মামলাটি এগিয়ে নেয়নি। যেহেতু অভিযোগের কোনো ভিত্তি ছিল না, তাই পুলিশও একটি ‘ফাইনাল রিপোর্ট’ জমা দিয়ে মামলাটি বন্ধ করে দিল। কথাটি সত্য হলেও পুলিশ আমাকে বিনা ‘প্রণামিতে’ ছাড়েনি। বাবা যথারীতি তা দিয়ে দিয়েছিলেন।

অনেকটা পিছিয়ে পড়েছিলাম। আমি আবার পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম। কিন্তু এই গল্পের তখনো একটি হুল ফোটানো বাকি ছিল। আমার বিপদ তখনো কাটেনি। এক রাতে পুলিশ আমাদের কমলাপুরের বাসায় হানা দিল। তাদের সঙ্গে জিম্মায় থাকা এক ব্যক্তিও ছিল। মাঝরাতে সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে পুলিশ ওই লোকটিকে বলল উপস্থিত সবার মধ্য থেকে সামিকে শনাক্ত করতে। কিন্তু সামি তো অনেক আগেই এই বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিয়েছিল, রাত কাটানো দূরের কথা। পুলিশ খালি হাতেই ফিরে গেল। কিন্তু কয়েক দিন পর পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) একজন এসপি এক প্রভাবশালী বন্ধুর মাধ্যমে আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। সিকদার আর তাঁর দলের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের স্বার্থে এসপি আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলেন। আগে থেকে নোটিশ দিয়ে একজন পুলিশ ফটোগ্রাফার আমার থাকার জায়গায় এসে আমার কয়েকটি ‘মাগশট’, মানে অপরাধী শনাক্তকরণের ছবি তুলে নিয়ে গেল। এর কয়েক দিন পর সামি আচমকা মতিঝিলে আমার বড় ভাইয়ের অফিসে গিয়ে হাজির হয়ে আমি গ্রেপ্তার হয়েছি কি না, জানতে চাইল। সামির ভাষ্যমতে, পুলিশ তাদের হেফাজতে থাকা সর্বহারা পার্টির কয়েকজন সদস্যকে আমার ছবিসহ কিছু ছবি দেখিয়ে বলেছিল যে পার্টি তছনছ হয়ে গেছে আর অধিকাংশ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সামি ধরে নিয়েছিল আমিও তাদের মধ্যে একজন।

কয়েক দিন পর এসপি আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করলেন। বড় ভাই পুরো বিষয়টি জানতেন। তিনি নিজে আমার সঙ্গে মালিবাগে এসবির সদর দপ্তরে গিয়েছিলেন। এতে আমি বেশ স্বস্তি অনুভব করছিলাম। এসপির অফিসে কিছুক্ষণ কুশল বিনিময়ের পর বড় ভাইকে বাইরে যেতে বলা হলো। একজন জিজ্ঞাসাবাদকারী আমাকে অন্য একটি রুমে নিয়ে গেলেন। আমি সেই সময়টুকু কাজে লাগালাম নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে। কীভাবে তাঁকে বিশ্বাস করানো যায় যে আমি পার্টির কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত নই। তাঁরা আমার সম্পর্কে ঠিক কতটুকু জানেন, তা আমার জানা ছিল না। তাই ঠিক করলাম ‘ভালো মানুষ’ সাজার জন্য বেশি বকবক না করে উত্তরগুলো যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত রাখব। নিজের আর অন্যদের নিরাপত্তার স্বার্থে একেবারে প্রয়োজন না হলে কোনো তথ্য ফাঁস না করাটা ছিল জরুরি। জিজ্ঞাসাবাদকারী শুরুতেই জানতে চাইলেন, আমি সিরাজ সিকদারকে কীভাবে এবং কতটুকু চিনি? আমি দাবি করলাম যে কলাভবনের পাশের ছাত্ররাজনীতির প্রাণকেন্দ্র মধুর ক্যানটিনে কয়েকবার তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। কথাটি ছিল পুরোপুরি মিথ্যা। তাঁর অন্যান্য প্রশ্নও আমি এড়িয়ে গিয়ে অস্পষ্ট উত্তর দিচ্ছিলাম। লোকটা ছিলেন বেশ ঝানু। তিনি হুঁশিয়ার করে বললেন, আমি যেন তাঁকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা না করে সত্য বলি।

অনেকগুলো প্রশ্নের পর আমাকে মগবাজার থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। কয়েক মিনিট পর পুলিশের হেফাজতে থাকা এক ব্যক্তিকে আনা হলো। আমি তাকে খুব ভালো করেই চিনতাম। সে কিছুদিন আগেও পার্টির সঙ্গে জড়িত ছিল। শিক্ষিত ও ভদ্র এই লোকটি বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে একটি ছোট দোকানে পুরোনো বই বিক্রি করত। আমি একবার তার বাড়িতেও গিয়েছিলাম। লোকটাকে দেখে বিধ্বস্ত ও ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের ধরন দেখে আমি বুঝতে পারলাম, এই সেই ব্যক্তি, যাকে নিয়ে পুলিশ সামিকে খুঁজতে আমাদের কমলাপুরের বাসায় হানা দিয়েছিল। তাকে দেখে আমি সম্ভাব্য প্রশ্নের জন্য নিজেকে তৈরি করে নিলাম। বিশেষ করে আমাদের চেনাজানার বিষয়টি নিয়ে।

তাকে প্রথমে জিজ্ঞেস করা হলো, সে আমাকে চেনে কি না। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারলাম, সে আমাকে আপ্রাণ রক্ষা করতে চায়। সুযোগ বুঝে সে মুখ খোলার আগেই আমি তাকে মনে করিয়ে দেওয়ার ছলে বললাম, সে কি চিনতে পারছে যে আমি তার দোকানে গিয়ে কার্ল মার্কসের ভারতে ব্রিটিশ শাসন বইটির খোঁজ করেছিলাম? আমার ইশারা বুঝতে পেরে সে আমার কথায় সায় দিল। আমি আরও দু–একবার কথার মধ্যে কথা বললে জেরা করা পুলিশ অফিসার আমাকে ধমক দিয়ে চুপ করতে বললেন। সেটাই ছিল পুলিশ বা আইনের সঙ্গে আমার শেষ বোঝাপড়া। বড় ভাইয়ের দুশ্চিন্তা আর তাঁর যোগাযোগগুলো কাজে না লাগলে পরিস্থিতি আমার জন্য আরও অনেক বেশি কঠিন হতে পারত।

তারপর সামি বা সর্বহারা পার্টির আর কারও কাছ থেকে আমি কখনো কোনো খবর পাইনি। তাদের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সব ধরনের সম্পর্কের একেবারে চূড়ান্ত অবসান ঘটল।

টীকা

১. ড. এম আনোয়ার হোসেন, কর্নেল আবু তাহেরের ছোট ভাই, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য।

২. রওশন আরা সিরাজ সিকদারের প্রথম স্ত্রী।

৩. মুজিবুর রহমান, তৎকালীন কায়েদে আজম কলেজে (বর্তমানে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ) পড়তেন।

৪. আরাকানে তখন দুটি কমিউনিস্ট পার্টি ছিল। একটি সোভিয়েত ইউনিয়নের ত্রৎস্কিপন্থী রেড ফ্ল্যাগ, আরেকটি চীনের মাওবাদী হোয়াইট ফ্ল্যাগ।

৫. পুরো নাম আবু সাঈদ আহমেদ। কর্নেল আবু তাহেরের ছোট ভাই।

৬. পুরো নাম আ কা মো. ফজলুল হক। রানা ছদ্মনাম।

৭. পুরো নাম মনজি খালেদা বেগম। ছদ্মনাম বুলু। জন্ম পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার শ্যামনগরে। ১৯৭৬ সালে তিনি ভারতের কোচবিহারে ফিরে যান।

৮. পুরো নাম জাহানারা হাকিম। সিরাজ সিকদারের দ্বিতীয় স্ত্রী।

৯. ‘সর্বহারা পার্টির সূত্রে জানা যায়, ঢাকার সাভার এলাকায় এ রকম একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেখানে সর্বহারা পার্টির একটি গ্রুপ সক্রিয় ছিল। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা কাশিমপুর ইউনিয়নের গিয়াসউদ্দিন ওরফে গেসু চেয়ারম্যান আলোচনার আহ্বান জানালে সর্বহারা পার্টির কয়েকজন গেরিলা তাঁর কাছে যান। তাঁদের নেতা ছিলেন সামিউল্লাহ আজমি। সামিউল্লাহ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে ছিলেন বরিশালে। পরে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। দলে তাঁর নাম তাহের। তিনি সাঈদ, পলাশ, খোকন, এনায়েত, মণীন্দ্রসহ কয়েকজনকে নিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে যান। অভিযোগ আছে, খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়। তাঁদের সন্ধানে পার্টি থেকে পরপর দুজন কুরিয়ার পাঠানো হলে তাঁদেরও হত্যা করা হয়। ঘটনাটি ঘটে একাত্তরের আগস্ট মাসে।’  লাল সন্ত্রাস: সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি, মহিউদ্দিন আহমদ, পৃষ্ঠা ৮৩, বাতিঘর।