ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল
ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল

আদালতের পর্যবেক্ষণ

এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা ‘বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ’

‘যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব’, ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এ কথা বলেন আদালত।

ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আজ রোববার মর্মান্তিক এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুই আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। দণ্ড ঘোষণার আগে বিচারক ঘটনাটি নিয়ে ওই পর্যবেক্ষণ দেন।

পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে আদালত বলেন, একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে করা এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা ‘বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ’। মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এ মামলায় তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম ও সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল সন্তোষের সঙ্গে লক্ষ করেছে যে তদন্তকারী সংস্থা অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। একইভাবে প্রসিকিউশন মামলার সব গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আদালতের সমক্ষে উপস্থাপন করে বিচারকার্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এ মামলা কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়, এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে করা এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ।’

এ মামলা বিশেষ গুরুত্ব তুলে ধরে বিচারক বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীন গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল বর্তমানে ১ হাজার ৮০০–এর অধিক বিচারাধীন মামলার দায়িত্ব পালন করছেন, যার প্রতিটি মামলাই শিশুদের প্রতি সংঘটিত সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন অথবা অন্যান্য গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিটি মামলার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর অসহনীয় যন্ত্রণা, একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস এবং ন্যায়বিচারের জন্য প্রতীক্ষারত অসংখ্য মানুষের প্রত্যাশা। ওই মামলাগুলোর ক্ষেত্রে এ মামলার দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আদালতের দায়িত্ব আবেগ দ্বারা নয়, বরং আইন, প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের চিরন্তন নীতিমালার আলোকে সত্য উদ্‌ঘাটন করা বলে উল্লেখ করেন বিচারক। তিনি বলেন, ‘এই আদালত অত্যন্ত সতর্কতা, সংবেদনশীলতা ও বিচারিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাক্ষ্যপ্রমাণ, আলামত, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং মামলার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রায় প্রদান করছে।’

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আদালত থেকে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। আজ রোববার সকালে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে

রায়ে আদালত বলেন, আসামির জবানবন্দি, তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য ও সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী চিকিৎসকের সাক্ষ্য ও প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রমাণিত হয় আসামি সোহেল রানা দোষী। এ ছাড়া সাক্ষীদের সাক্ষ্য থেকে উঠে এসেছে আসামি সোহেল রানা ধর্ষণ ও হত্যা করে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। আসামি স্বপ্না আক্তার ওই ফ্ল্যাটেই ছিলেন এবং তিনি ধর্ষণ, হত্যা ও লাশ গুমের কাজে বাধা না দিয়ে সহযোগিতা করেন। ফলে আসামি স্বপ্না আসামি সোহেলের সঙ্গে একই অপরাধে অপরাধী।

সার্বিক বিবেচনায় আসামি সোহেল রানাক ও স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আদেশ দেওয়া হলো। একই সঙ্গে সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ ও স্বপ্না আক্তারকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হলো। ট্রাইব্যুনাল বলেন, ভুক্তভোগী ওই শিশুর পরিবার এই জরিমানার টাকা পাবে। টাকা দিতে না পারলে আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে তা দেওয়ার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

গত ১৯ মে পল্লবীর একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটির বাসিন্দা আসামি সোহেল ঘটনার পর বাসার শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। বাসা থেকে তাঁর স্ত্রীকে তখনই আটক করা হয়। আর সেদিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা করেন। ২০ মে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। ১ জুন সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর চার্জ গঠন, সাক্ষ্য গ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক শেষে আজ রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছিলেন আদালত।