যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। গতকাল শনিবার সকালে ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল। এর কিছু পরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যৌথভাবেই এ হামলা চলছে। পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরানও। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে ইরান। আজ রোববার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি।
এই পরিস্থিতিতে ইরানে এখন কী ঘটবে, সেই প্রশ্ন উঠছে সবার আগে। খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে ক্ষমতার পালাবদল কীভাবে ঘটবে, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি কোনদিকে যাবে, বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে কী প্রভাব পড়তে পারে—এসব নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন রেডিও তেহরানের সাবেক সম্পাদক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সিরাজুল ইসলাম
সিরাজুল ইসলাম বলেন, খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে ক্ষমতার পালাবদল অনিবার্য হয়ে উঠেছে, ব্যাপারটা আসলে তা নয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে আমেরিকা ক্ষমতার পালবদল ঘটাতে চায় এবং সে কারণেই খামেনিকে হত্যা করা হয়েছে। এটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বলেই মনে করি। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পরেই যে ইরানে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে যাচ্ছে না; বরং এরপরে ইরান নিজের মতো করেই এগিয়ে যাবে। এরই মধ্যে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনার খবরে জানা যাচ্ছে , ইরানের প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জুরি নিয়ে তিন সদস্যের পর্ষদ সর্বোচ্চ নেতা যে দায়িত্ব পালন করতেন আপাতত সেই দায়িত্ব পালন করবেন। সে ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী একটা ব্যবস্থা সংবিধান মোতাবেক চালু হবে। খবর পাওয়া যাচ্ছে যে খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হতে পারেন।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইবে ইরানের জনগণ নামুক। এই সরকারের বিরুদ্ধে একটা পাল্টা বিপ্লব, অর্থাৎ একরকমের ক্ষমতা দখলের কর্মকাণ্ড ঘটাক। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহর নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য প্রস্তুত। ইসরায়েলের পরিকল্পনাও অনেকটা তা–ই। তবে সেটা সহজ হবে না বলেই মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সিরাজুল ইসলাম। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ইরানের ভেতরে স্থল অভিযান না চালিয়ে সব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, সরকারের সামরিক বাহিনীর কমান্ডারদে আটক না করা পর্যন্ত এবং ইরানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ না করানো পর্যন্ত এই ক্ষমতার পালাবদল হবে না।
ইরানের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংকট হলো দেশের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন। এতে দেশটির ক্ষমতায় একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তবে ইরানে আগেই ঠিক করা আছে যে একজন মারা গেলে তার পরিবর্তে তাঁর জায়গায় আবার কে দায়িত্ব পালন করবেন। ফলে এই জায়গায় খুব বেশি রাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে না বলে মনে করেন সিরাজুল ইসলাম। তেহরান রেডিওর সাবেক এই সম্পাদক বলেন, ইরানে যদিও কিছু ইসলামী বিপ্লববিরোধী লোক আছে, তবে সেটা মুষ্টিমেয়। অনেকেই ইসলামী শাসন চায় না এ রকমও আছে। কিন্তু তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন চায় না। সে ক্ষেত্রে যুদ্ধ চলছে ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের বিরুদ্ধে থাকবে এবং সেটাই হচ্ছে ইরানি জাতীয়তাবাদ। আর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানে সামরিক ও অর্থনৈতিক সংকট রয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ইরানের বাহিনী প্রায় ছয় সাত লাখ লোকের একটা সশস্ত্র বাহিনী। এর পাশাপাশি আধা সামরিক বাহিনী 'বাসিজ' রয়েছে। তারা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে কাজ করে। ফলে সামরিক সংকট খুব বেশি বাড়বে বলে মনে করেন না এই বিশ্লেষক। ইরানে অর্থনৈতিক সংকট মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণেই হয়েছে। দুঃখজনক হচ্ছে যে আমেরিকা এই সংকট তৈরি করে আবার যখন সংঘাত হচ্ছে, তখন উদ্ধারের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে।
গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের একটি স্কুলে ১৪৮ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে সিরাজুল ইসলাম বলেন, বেসামরিক লোকজন হত্যা করার একটা প্রবণতা ইসরায়েল ও আমেরিকার আছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিন্দার যোগ্য। সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে রুষ্ট করতেই এমনটা করা হয়।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যাবে, সেটা নির্ভর করবে মূলত ইরানের ওপর। অনেকটা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বড় খেলোয়াড় রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির ওপর। ইরান ও সৌদি আরবের ভেতরে যখন সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি স্বাভাবিক স্থিতিশীল থাকে। আর সৌদি আরবের সঙ্গে যখন ইরানের সম্পর্ক ভালো থাকে, তখন সৌদি আরবের অনুসারী দেশ বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, জর্ডান—এসব দেশের সঙ্গেও ইরানের সম্পর্ক ভালো থাকে।
এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ইদানীং মিসরের সঙ্গেই সৌদি আরবের সম্পর্ক ভালো হচ্ছিল। আবার তুরস্কের সঙ্গেও ভালো ছিল। সবকিছু মিলে ইরান যদি এখন বেকায়দায় পড়ে যায়, রাজতান্ত্রিক সরকার চলে আসে বা ইরানে শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন হয়, তাহলে আবার বিপ্লব–পূর্ববর্তী যে অবস্থা ছিল সেই অবস্থায় চলে যাবে। তার মানে মিসর, সৌদি আরব বা আরব সব দেশের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে । আর যদি না হয় এবং যদি ইরানের সরকার পরিবর্তন না হয়, তাহলে যেটা হবে সেটা হচ্ছে যে ইসরায়েল ও আমেরিকার প্রভাব–প্রতিপত্তি ক্ষুণ্ন হবে। তখন আবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে যাবে এবং এখানে চীনের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা আরও বাড়বে। এখন সবকিছুই নির্ভর করছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যে যুদ্ধ চলছে, এই চলমান যুদ্ধের ফলাফল কী হয় ,তার ওপর।
যদি যুদ্ধ মারাত্মক রকমের আঞ্চলিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বাংলাদেশের বড় জনশক্তি, যাঁরা সৌদি আরব, কাতার, দুবাই, ওমানসহ বিভিন্ন মধ্যপ্রাচ্যের দেশে রয়েছেন, তাঁদের ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হবে বলে মনে করেন সিরাজুল ইসলাম।
এ ছাড়া ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হরমুজ প্রণালি যখন বন্ধ থাকবে, তখন সারা বিশ্বে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে যাবে, সংকট তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ধ্বংস হবে। এর প্রভাব থেকে বাংলাদেশ মুক্ত নয়, বলেন সিরাজুল ইসলাম।
এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করছে। এর কারণ শুধু ধর্মীয় অনুভূতি নয়; বরং মানুষ ইরানকে পছন্দ করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো আধিপত্যকামী শক্তির বিরুদ্ধে ইরানের শক্ত অবস্থান মানুষ পছন্দ করে। এর একটি সামাজিক প্রভাব জনগণ ও গণমাধ্যমের ওপর পড়বে । তিনি বলেন, ইরানের সরকার পরিবর্তন হলে বা না হলে আমাদের কূটনীতি কোনদিকে যাবে সেটিও নতুন ভাবনার বিষয়। কারণ, আমেরিকার বাইরে গিয়ে অনেক কিছু করা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য কঠিন। সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে।