চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

চাকসু নির্বাচনের তফসিলে ‘গড়িমসি’, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা

দেশের স্বায়ত্তশাসিত চার বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়েছে। ক্যাম্পাসগুলোতে এখন নির্বাচনী আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রার্থীদের নানা তৎপরতা চলছে। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এসবের কিছুই নেই। প্রশাসন এখনো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেনি। এ নিয়ে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ।

আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ১১ সেপ্টেম্বর হবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। অন্যদিকে ১৫ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। এখন কোন সংগঠন কার সঙ্গে প্যানেল করবে, প্রার্থী কে হবেন, নির্বাচনের কৌশল কী হবে—এসব বিষয় নিয়েই ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থীরা তৎপর।

অন্যদিকে চাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবিতে বিক্ষোভ করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। ১২ আগস্ট ক্যাম্পাসের মূল ফটকে তালা দিয়ে বিক্ষোভ করেন ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি জানান। এর আগে গত জানুয়ারিতেও ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।

ছাত্র অধিকার পরিষদ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্যসচিব রোমান রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে গড়িমসি করছে। তারা শুধু সভা করেই সময় পার করছে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা চাকসু নির্বাচন আয়োজনের জন্য কাজ করছেন। ইতিমধ্যে গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও গঠন করা হয়েছে। কমিশন সবার সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে।

নির্বাচন কবে হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি। ভোটার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ৫৪টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের মধ্যে ১১টি এখনো ভোটার তালিকা জমা দেয়নি। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ও ঠিক হয়নি।
অধ্যাপক মনির উদ্দিন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনার, চাকসু

১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম চাকসু নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে। প্রতি শিক্ষাবর্ষে চাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়বার নির্বাচন হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর ছাত্রসংগঠনগুলোর মুখোমুখি অবস্থান, কয়েক দফা সংঘর্ষ ও উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের কার্যালয় থাকলেও এটি এখন ক্যানটিন আর কমিউনিটি সেন্টার হিসেবেই ব্যবহার হচ্ছে। কর্মচারীদের সন্তানদের বিয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানও হয়েছে চাকসুতে। এমনকি গত ১ জুলাই চাকসু ভবনের নামফলকের ওপর ‘জোবরা ভাতের হোটেল ও কমিউনিটি সেন্টার’ লেখা ব্যানার টাঙিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯টি অনুষদে ৪৮টি বিভাগ ও ৬টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৮ হাজার ৫১৫।

চাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আরজুমান্দ আছেমা প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাকসু নির্বাচন নিয়ে বিলম্ব করছে, যা প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও সদিচ্ছা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি করছে। দ্রুত নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে হবে।

চাকসুর নির্বাচন কমিশনার রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মনির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন কবে হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি। ভোটার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ৫৪টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের মধ্যে ১১টি এখনো ভোটার তালিকা জমা দেয়নি। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ও ঠিক হয়নি।

গঠনতন্ত্র নিয়ে দ্বন্দ্ব

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চাকসু নির্বাচন নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গত ১০ ডিসেম্বর চাকসুর গঠনতন্ত্র পর্যালোচনায় একটি কমিটি গঠন করা হয়। চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি ওই কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। সেটি পারেনি কমিটি। গত জুলাইয়ের শেষের দিকে কমিটি গঠনতন্ত্র সংশোধন করে প্রতিবেদন জমা দেয়। ১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সিন্ডিকেটের ৫৫৯তম সভায় সংশোধিত গঠনতন্ত্রের অনুমোদন দেওয়া হয়।

এর আগে চলতি বছরের ২২ মে ক্যাম্পাসের প্রায় সব ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে চাকসুর গঠনতন্ত্র পর্যালোচনার বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে চাকসুর গঠনতন্ত্র কেমন হবে, সে বিষয়ে মতামত দেন শিক্ষার্থীরা। তবে গঠনতন্ত্রের অনুমোদন দেওয়ার পর ১২ আগস্ট তার সমালোচনা করে সংবাদ সম্মেলন করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। অন্যান্য ছাত্রসংগঠনও বিভিন্ন ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। এতে প্রশাসনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান প্রথম আলোকে বলেন, এমফিল ও পিএইচডির শিক্ষার্থীরা প্রার্থী হতে পারবেন ও ভোট দিতে পারবেন; গঠনতন্ত্রে এমন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। অথচ কমিটির সঙ্গে আলোচনায় ছাত্রশিবির বাদে বাকি সবাই এই ধারার বিরোধিতা করেছিল। তখনই এটি বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু গঠনতন্ত্রে এই ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব তৈরি হয়। এই নেতৃত্ব পরে জাতীয় রাজনীতিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া জরুরি। প্রশাসনকে দ্রুত নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে হবে।
অধ্যাপক মুহাম্মদ সিকান্দার খান, সাবেক নির্বাচন কমিশনার, চাকসু

নোমান বলেন, ‘একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রার্থীর বয়স সর্বোচ্চ ৩০ পর্যন্ত রাখা হয়েছে। এটিও আমরা মানি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো ধারা নেই।’

অন্যদিকে ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক ইফাজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘গঠনতন্ত্রে উপাচার্যকে একক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তিনি চাইলে যেকোনো সময় চাকসুর সভা স্থগিত করতে পারবেন। এমন নানা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কোষাধ্যক্ষ পদে একজন শিক্ষককে রাখা হয়েছে। এটিও আমরা চাই না। অন্যদিকে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রির শিক্ষার্থীরা প্রার্থী ও ভোটার হতে পারবেন। এটি স্নাতকোত্তর পর্যন্ত করার দাবি করেছি। কিন্তু দাবি মানা হয়নি।’

এত দিন ক্যাম্পাসে ও হলে ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রকাশ্য কার্যক্রম ছিল না। তবে গত বছরের ৫ আগস্টের পর সংগঠনটি নিজেদের কমিটি প্রকাশ করে। বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে তারা ক্যাম্পাসে এখন বেশ সরব। সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, এমফিল ও পিএইচডির শিক্ষার্থীর প্রার্থী এবং ভোটার থাকার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে তাঁরা বলেননি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বরং তাঁরা বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কয়েকটি দাবি জানিয়েছিলেন। এসব দাবির অনেকগুলোই গঠনতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

১৯৯০ সালের সর্বশেষ চাকসু নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মুহাম্মদ সিকান্দার খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব তৈরি হয়। এই নেতৃত্ব পরে জাতীয় রাজনীতিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া জরুরি। প্রশাসনকে দ্রুত নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে হবে। শিক্ষার্থীদেরও সুশৃঙ্খলভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিতে হবে।