রাজধানী মিরপুর ১৪ নম্বরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বর্জ্য ও ময়লা সংগ্রহ করে ১৩ বছর বয়সী মুহাম্মদ আলম
রাজধানী মিরপুর ১৪ নম্বরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বর্জ্য ও ময়লা সংগ্রহ করে ১৩ বছর বয়সী মুহাম্মদ আলম

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস

‘সারা দিন ময়লার মধ্যে থাকি, কষ্ট তো লাগেই’

আগে কয়েক বছর একটি মুদিদোকানে কাজ করেছে মুহাম্মদ আলম; কিন্তু আয় কিছুটা বেশি হওয়ায় পরে বেছে নিয়েছে বর্জ্য ও ময়লা সংগ্রহের কাজ। ভ্যানে করে বর্জ্য সংগ্রহ ও পরে সেখান থেকে প্লাস্টিক আলাদা করার কাজ করে এখন তার দিন কাটে।

রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বরে সম্প্রতি মুহাম্মদ আলমের সঙ্গে দেখা ও কথা হয়। ১৩ বছর বয়সী এ শিশু তখন তার নিয়মিত কাজে ব্যস্ত।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মিরপুর ১৪ নম্বরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বর্জ্য ও ময়লা সংগ্রহ করে মুহাম্মদ আলম। ‘মহাজনের’ কাছ থেকে মাসে পায় ৯ হাজার টাকা। সংগ্রহ করা ময়লা থেকে প্লাস্টিক আলাদা করে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে কিছুটা বাড়তি উপার্জনের জন্য।

মুহাম্মদ আলম বলে, ‘সারা দিন ময়লার মধ্যে থাকি, কষ্ট তো লাগেই। কাম করনের লাইগা স্কুলও ছাইড়া দেওন লাগছে। কিন্তু কাম না করলে তো আর ভাত জুটবো না।’

আজ ১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘শিশুশ্রমকে লাল কার্ড: শিশুদের জন্য ন্যায্যতা, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজ’। কিন্তু দেশে মুহাম্মদ আলম একা নয়, তার মতো লাখো শিশুকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সে খাটাতে হচ্ছে নানা শ্রমে। দেশে কয়েক বছরের ব্যবধানে নতুন করে প্রায় ১২ লাখ শিশু ঝুঁকিতে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৮ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত।

দেশে ৩১ দশমিক ৪৫ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত কাজের চাপের মধ্যে থাকে, ১৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ শারীরিক আঘাতের শিকার হয়, ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ মারধরের শিকার, ২০ দশমিক ৭৪ শতাংশ নিয়মিত বকাঝকা ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হয় এবং ১ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার।

‎বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ শিশু তহবিল—ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’-এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৯ দশমিক ২ শতাংশ শ্রমের সঙ্গে যুক্ত, যা ২০১৯ সালে ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। তার মানে, আরও প্রায় ১২ লাখ শিশু যুক্ত হয়েছে শিশুশ্রমের সঙ্গে।

‎মরিয়মের বয়স ১০ বছর। রাজধানীর উত্তরার একটি ফ্ল্যাটে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে সে। সেখানে তাকে দুই বছর বয়সী একটি শিশুর দেখাশোনা করতে হয়। শিশুটির মা-বাবা অফিসে গেলে মরিয়মকে সারা দিন ওই শিশুর যত্ন নিতে হয়। এ ছাড়া বাসার বিভিন্ন কাজও করতে হয় তাকে। থাকা–খাওয়ার বাইরে মাসে তার মজুরি সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা।

মরিয়মের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। যেখানে সে প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে আর পড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। গত বছর থেকে ঢাকায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছে সে।

রাজধানীর ভাষানটেক এলাকার ছোট একটি সাইকেল মেরামতের দোকানে কাজ করে ১২ বছর বয়সী মুহাম্মদ সুমন

‎২০২৩ সালের ‎ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (এএসডি) পরিচালিত ‘সিচুয়েশন অব চাইল্ড ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স ইন ঢাকা সিটি’ শীর্ষক জরিপে ৩৫২ জন শিশু গৃহকর্মীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। জরিপ অনুযায়ী, ৩১ দশমিক ৪৫ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত কাজের চাপের মধ্যে থাকে, ১৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ শারীরিক আঘাতের শিকার হয়, ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ মারধরের শিকার, ২০ দশমিক ৭৪ শতাংশ নিয়মিত বকাঝকা ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হয় এবং ১ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘শিশুশ্রমকে না বলি, শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করি’। মন্ত্রণালয়ের নারী ও শিশুশ্রম এবং মজুরি বোর্ড অধিশাখার যুগ্মসচিব মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্রম আইন ২০০৬-এ শিশুশ্রমকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইনের আওতায় যেসব ফর্মাল সেক্টর (আনুষ্ঠানিক খাত) আছে, সেগুলো আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করি। কোথাও শিশুশ্রমের নজির পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

চরম দারিদ্র্য থাকা সত্ত্বেও শিশুশ্রম নির্মূল করা সম্ভব, যদি সমাজে এটি সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু আমাদের  সমাজে এখনো শিশুশ্রমকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়
লায়লা খন্দকার, আহ্বায়ক, শিশুরাই সব

তৈরি পোশাক, চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ,⁠ট্যানারি, রপ্তানিমুখী চামড়াজাত দ্রব্য ও পাদুকা, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, সিল্ক, সিরামিক ও কাচ—এই ৮ শিল্প খাতকে শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। শিশুশ্রমের মূল কারণ দারিদ্র্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের অন্তর্ভুক্ত নয়, এমন অনেক অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম হয়ে থাকে, যা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নয়। শিশুশ্রম দূর করতে অভিভাবক, জনপ্রতিনিধিসহ সব স্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে।

‎রাজধানীর ভাষানটেক এলাকার ছোট একটি সাইকেল মেরামতের দোকানে কাজ করে ১২ বছর বয়সী মুহাম্মদ সুমন। আট বছর বয়সে এই দোকানে কাজ শুরু করেছিল সে। দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর অভাবের তাড়নায় আর স্কুলে যাওয়া হয়নি তার।

সুমনের বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, বড় ভাই তৈরি পোশাকশিল্পে কাজ করেন। গৃহকর্মীর কাজ করেন সুমনের মা। সে পরিবারের সঙ্গে ভাষানটেক বস্তিতে থাকে।

সুমনের বাবা থাকেন আলাদা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে শিশুটি। মাসিক আয় পাঁচ হাজার টাকা। তার স্বপ্ন একদিন গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে ১০ তলা একটি বিল্ডিং করে সেখানে পরিবারের সঙ্গে থাকবে।

‎সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা করা গেলে শিশুশ্রমের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে বলে মনে করেন শিশু অধিকারবিষয়ক উদ্যোগ শিশুরাই সব-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার। তিনি বলেন, ‘দেশে শিশুশ্রম প্রতিরোধে নানা আইন ও নীতিমালা থাকলেও প্রয়োগে অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে। বর্তমানে ৪৩ ধরনের শ্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে শিশুদের কাজ করার কথা নয়; কিন্তু বাস্তবে এসব খাতে এখনো শিশুদের কাজ করতে দেখা যায়।’

লায়লা খন্দকারের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগকারীদের আইনের আওতায় আনা ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘চরম দারিদ্র্য থাকা সত্ত্বেও শিশুশ্রম নির্মূল করা সম্ভব, যদি সমাজে এটি সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনো শিশুশ্রমকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। শিশুরা নিজেদের অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে না। পাশাপাশি কম মজুরিতে কাজ করানো যায় বলেও তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।’