আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

রংপুরে চার খুন নিয়ে আসকের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান: কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনার প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান করেছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। তাঁরা বলছে, এ ঘটনার

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। হত্যার উদ্দেশ্য, সময়রেখা, হত্যার পদ্ধতি, রাত ২টা ৪০ মিনিটের অস্বাভাবিক ফোনকল, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়িতে অবস্থান, খাবার খাওয়া ও গোসল করার পুলিশের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো ফরেনসিক ও ডিজিটাল আলামত পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

আজ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে আসকের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান পর্যবেক্ষণের এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। আসকের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ২৪ ও ২৫ আগস্ট রংপুরে সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান করে।

প্রতিনিধিদলের সদস্যরা নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবির উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী, গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস, গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাসের মা সেনা রানী দাস এবং সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার সীমান্ত চন্দ্র দাসের মা–বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরাও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

২০ আগস্ট দিবাগত রাতে রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়া/কামালকাছনা এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাঁদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। ২২ আগস্ট রাতে স্বজনদের উদ্যোগে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে।

আসক বলছে, ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে এবং হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ ও ঘটনাক্রম সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ব্যাখ্যা দেয়। তবে পুলিশের সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে নিহত পরিবারের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে কিছু প্রশ্ন ও অসংগতি সামনে এসেছে।

একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনা অত্যন্ত নৃশংস এবং জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে আসকের পক্ষ থেকে ঘটনার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, ঘটনাক্রম এবং প্রকৃত জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আসকের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ

আসকের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মর্গের ইনচার্জ সাহেব আলী এবং ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডোম যতন কুমারের সঙ্গে কথা বলেন। যতন কুমার বলেছেন, মরদেহগুলো পচনশীল অবস্থায় ছিল। তিনি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন দেখেননি। তবে শরীরের কিছু অংশে আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে তাঁর মনে হয়েছে।

নিহত দুই নারীর শরীরে যৌন নির্যাতনের কোনো আলামত যতন কুমারের চোখে পড়েনি; তবে এ বিষয়ে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।

তবে আসক বিবৃতিতে বলেছে, মর্গের কর্মীর পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত চিকিৎসা বৈজ্ঞানিক মতামত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। মৃত্যুর কারণ, আঘাতের ধরন, যৌন সহিংসতার কোনো আলামত ছিল কি না; এবং হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তের জন্য ময়নাতদন্ত, রাসায়নিক পরীক্ষা ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনই অধিকতর নির্ভরযোগ্য ভিত্তি। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা চেষ্টা করেও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার নিতে পারেননি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আসক বলেছে, একইভাবে পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যার সঙ্গে নিহত পরিবারের স্বজন, স্থানীয় নাগরিক ও গণমাধ্যমে উত্থাপিত কিছু প্রশ্নের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করতে বস্তুগত, ডিজিটাল ও ফরেনসিক আলামতের বৈজ্ঞানিক যাচাই প্রয়োজন।

প্রীতিলতা চক্রবর্তীর নম্বর থেকে রাত ২টা ৪০ মিনিটে তাঁর বোন পূজা চক্রবর্তীর কাছে করা ফোনকলটি বিশেষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে আসক। ওই সময় ফোনটি কে ব্যবহার করছিলেন, কলটির স্থায়িত্ব কত সময় ছিল, ফোনটির অবস্থান কোথায় ছিল এবং এরপর পরিবারের সদস্যদের মুঠোফোন কখন বন্ধ হয়—এসব তথ্যের কল ডিটেইল রেকর্ড, মুঠোফোনের লোকেশন ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। কারণ, পুলিশের বর্ণিত হত্যাকাণ্ডের সময়রেখার সঙ্গে এই ফোনকলের সম্পর্ক স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

আসক বলছে, পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কিছু সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করেন, খাবার খান ও গোসল করেন। এমন দাবি সত্য হলে ঘটনাস্থল থেকে ফরেনসিক আলামত পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকার কথা। তাই বাথরুম, খাবারের পাত্র, দরজা-জানালা, আসবাব, বিছানা, পোশাকসহ সংশ্লিষ্ট স্থান ও বস্তু থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ত্বকের কোষ, চুলসহ সম্ভাব্য ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে কি না; এবং তার ফলাফল কী—তা তদন্তে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বিচারিক প্রক্রিয়ায় মূল্যায়িত হবে। তবে ঘটনার পূর্ণ সত্য উদ্‌ঘাটনে শুধু স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর না করে স্বাধীন ও বস্তুগত আলামত, ডিজিটাল তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, কল ডিটেইলস, ডিএনএ ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে আসকের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাড়ির বিদ্যুৎ–সংযোগ কখন, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, সেটিও তদন্তে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে সিসিটিভি, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের চলাচল এবং হত্যাকাণ্ডের সময়ের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা প্রযুক্তিগত আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।

নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যা নিয়ে যেসব প্রশ্ন ও উদ্বেগ জানিয়েছেন, সেগুলোকে অমূলক বা বিভ্রান্তিকর হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা প্রয়োজন। একইভাবে পুলিশ যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, সেটিও স্বাধীন আলামতের ভিত্তিতে যাচাই হওয়া জরুরি।

তদন্তভার ডিবিতে হস্তান্তর হওয়ায় ঘটনাটির সব দিক নতুন করে, নিরপেক্ষভাবে ও পেশাদারত্বের সঙ্গে অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে আসক বলেছে, কোনো ব্যক্তি বা সম্ভাব্য ঘটনার সূত্র যেন পূর্বধারণার কারণে তদন্তের বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আসকের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বলছে, তদন্তের স্বচ্ছতা ও জন–আস্থা বজায় রাখতে তদন্তে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বস্তুগত ও ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে পুলিশের ব্যাখ্যাগুলো কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সে বিষয়ে যথাযথ সময়ে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে তদন্তের স্বার্থ রক্ষা হবে, অন্যদিকে সন্দেহ ও বিভ্রান্তিও কমবে।