
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে গত ১৬ মাসে ৪৫ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গত এক বছরে খুন হয়েছেন ৩৩ জন। মাসের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ৯টি ঘটনা ঘটেছে গত বছরের সেপ্টেম্বরে।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে। আজ বুধবার ২০২৫ সালের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে সংস্থাটি। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৬ মাসের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট থেকে এই হিসাব করেছে অধিকার।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হত্যার শিকার হয়েছেন ১২ জন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত এক বছরে কারাগারে ১০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বাকি ১০১ জন অসুস্থতাজনিত কারণে মারা গেছেন। সবচেয়ে বেশি ১৪ জন মারা গেছেন গত বছরের নভেম্বরে। আর এই সময়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে ২২৩ জনের।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে ১০ জন পুলিশের হাতে, ১ জন সেনাবাহিনীর হাতে, ১ জন বিমানবাহিনীর হাতে, ১ জন র্যাবের হাতে, ৪ জন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে, ১ জন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) হাতে, ২ জন কোস্টগার্ড এবং ১৩ জন যৌথ বাহিনীর হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জনকে নির্যাতন, ১৬ জনকে গুলি করে এবং ৬ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
অধিকার বলেছে, ২০২৫ সালে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার যৌথ বাহিনী মাঠে নামালেও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি। এ সময়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংঘবদ্ধ পিটুনিতে (মব) হত্যার বিষয়ে বলা হয়েছে, গত এক বছরে ব্যাপকভাবে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। গণপিটুনি দিয়ে হত্যার অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে চোর সন্দেহে। মানসিক প্রতিবন্ধী ও কিশোরেরাও এই সহিংসতা থেকে রেহাই পায়নি। এক বছরে সারা দেশে ১২৫ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ২৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৭০৪ জন। এই সময়ে বিএনপি ৪২২টি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ১২টি, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ২টি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘাতে নিহত হয়েছেন ৭৬ জন, আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৪৬ জন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে নিহত হয়েছে ৬ জন আর আহত হয়েছে ৬৫ জন। এনসিপির অভ্যন্তরীণ সংঘাতে আহত হয়েছে পাঁচজন।
প্রতিবেদনে ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাগুলো নির্বাচনী সহিংসতা হিসেবে ধরেছে অধিকার। নির্বাচনী সহিংসতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে ২ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন।
সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় দুজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ১৪৭ জন আহত, ৮৪ জন লাঞ্ছিত, ৩৬ জনকে হুমকি ও ৪৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমে হামলা ও ভাঙচুরের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরে সংবাদপত্র অফিসে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সাংবাদিকদের হত্যাসহ বিভিন্ন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি মারা যাওয়ার সংবাদে সারা দেশে যখন বিক্ষোভ হচ্ছিল, তখন একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
এ সময় ডেইলি স্টারের ২৮ জন সাংবাদিক ও কর্মী ছাদে আটকা পড়েন। হামলার সময় আটকে পড়া সংবাদকর্মীদের পরিস্থিতি দেখতে গিয়ে নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরও দুর্বৃত্তদের হাতে লাঞ্ছিত হন। এ সময়ে ঢাকার বাইরে কুষ্টিয়া, খুলনা ও সিলেটে প্রথম আলো কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে ৮৮৫ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩০২ জন নারী আর ৫০৮ জন কন্যাশিশু। বাকি ৭৫ জনের বয়স জানা যায়নি। এ ছাড়া ৩০২ জন নারীর মধ্যে ৮০ জন গণধর্ষণ, ৯ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ২ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। আর ৫০৮ জন কন্যাশিশুর মধ্যে ৫৪ জন গণধর্ষণ, ২৪ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ২ জন আত্মহত্যা করেছে।
গত এক বছরে সারা দেশে ৬৭ জন নারী যৌতুকের কারণে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৭ জন নারীকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে। ২৭ জন বিভিন্নভাবে নিপীড়িত হয়েছেন এবং ৩ জন আত্মহত্যা করেছেন।
সীমান্তে সহিংসতার বিষয়ে বলা হয়েছে, গত বছর ৩২ জন বাংলাদেশিকে সীমান্তে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এর মধ্যে ২২ জনকে গুলি এবং ১০ জনকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৪ জন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২ হাজার ৪২৫ জনকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।