
মোহাইমিনুল রাফি (২৭) বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, ‘নিরাপদ জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ’ হলো প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরি।
দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচার যখন তুঙ্গে, তখন রাফির মতো তরুণদের লক্ষ্য করেই আসছে নানা প্রতিশ্রুতি—বেকারদের জন্য নগদ সহায়তা, সুদমুক্ত ঋণ আর ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা।
বেকার স্নাতকধারীদের জন্য নগদ সহায়তা বা সুদমুক্ত ঋণ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে রাফি হেসে ফেলেন। বলেন, ‘অবশ্যই এতে উপকার হবে।’ তারপর একটু থেমে যোগ করেন, ‘কিন্তু সত্যি বলতে কি, সবচেয়ে দরকার সুস্থ চাকরিবাজার আর মেধাভিত্তিক নিয়োগ।’
রাফি ছিলেন সেই তরুণদের একজন, যাঁরা ২০২৪ সালে সরকারি চাকরির কোটাব্যবস্থাকে অন্যায্য মনে করে শুরু হওয়া আন্দোলনে অংশ নেন। পরে সেই আন্দোলন দেশব্যাপী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সেই আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় মূল লড়াইটি হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। জামায়াতের জোটে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) তুলনামূলক কয়েকটি উদার রাজনৈতিক শক্তিও যুক্ত হয়েছে।
উভয় জোটের শীর্ষ নেতারা দেশজুড়ে সভা-সমাবেশ, মঞ্চ কর্মসূচি ও গণসংযোগে ব্যস্ত। মঞ্চ থেকে শুরু করে ভোটারদের দরজায় দরজায়, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচারের মূল সুর এক—চাকরি, দ্রব্যমূল্যের চাপ রোধ, করছাড়, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান।
তবে বিশ্লেষক ও ভোটারদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো এসব প্রতিশ্রুতি মানুষের গভীর উদ্বেগের জায়গায় আঘাত করলেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যেকোনো সরকারের পক্ষেই এসব প্রতিশ্রুতির বড় অংশই বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।
রাফির কথায়, ‘সবাই এমনভাবে চাকরি আর সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যেন এক রাতেই সুইচ টিপে চালু করা যাবে।’
চাপে থাকা অর্থনীতি ও অনিশ্চিত বাস্তবতা
এসব প্রতিশ্রুতি আসছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নেমে এসেছে ৪ থেকে ৫ শতাংশে। অথচ করোনা মহামারির আগে ২০১৯ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ শতাংশের বেশি।
অন্যদিকে খাদ্য ও সার্বিক মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ একক অঙ্কেই রয়ে গেছে। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে জিডিপির ২২ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যেই আটকে আছে। কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে, যেখানে ভারতে তা প্রায় ১২ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১০ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, মৌলিক সেবা টেকসইভাবে চালাতে এই অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া দরকার।
ঢাকাভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ‘সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকে কিছুটা তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা’ আনতে পেরেছে।
তবে এই অর্থনীতিবিদের মতে, এ সরকার ‘পরিবার পর্যায়ের অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রতি এবং অর্থনীতিকে চাঙা করতে ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তুলতে ভয়াবহভাবে উদাসীন থেকেছে।’
হোসেন জিল্লুর বলেন, ‘বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা চিহ্নিত হচ্ছে স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, নতুন করে দারিদ্র্যে পতন, কর্মসংস্থানের সংকট ও স্থবির মজুরিতে। সরকার ব্যবসায়িক আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে—এ কারণেই বিনিয়োগ স্থবির।’
হোসেন জিল্লুর বলেন, এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে পারে। তবে তাঁর ভাষ্য, ‘নির্বাচন কোনো নাটকীয় উন্নতি আনবে—এমন আশা বাস্তবসম্মত নয়।’
বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’
এই টান টান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী—উভয় দলই নানা প্রতিশ্রুতির পসরা সাজিয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার প্রকাশিত হয়নি, তবে ঢাকায় সাম্প্রতিক বড় বড় অনুষ্ঠানে ঘোষিত নীতিগুলোই প্রচারের মূল ভিত্তি।
বিএনপির প্রধান প্রতিশ্রুতি হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’। প্রতিটি পরিবারের একজন নারীর নামে এই কার্ড দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে ৪০ লাখ পরিবারকে এর আওতায় আনার কথা বলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ অর্থ অথবা চাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সমমূল্যের প্যাকেজ দেওয়া হবে।
বিএনপির নেতা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে মানুষের ওপর বিনিয়োগ করবে। পাশাপাশি কারিগর, তাঁতি ও ক্ষুদ্র শিল্পকে ঋণ সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে সহায়তা দেওয়া হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সমস্যাটা মূলত পরিসর ও বাস্তবায়নে। বাংলাদেশ বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষায় বছরে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি পুরো দেশে চালু করতে বছরে আনুমানিক ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা লাগবে—অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় কার্যত দ্বিগুণ করতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ দিয়ে মানসম্মত সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, সামাজিক সুরক্ষা প্রতিশ্রুতিই দলগুলোর জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’। শুধু বাজেট বৃদ্ধি করলেই হবে না, লিকেজ রোধ ও সঠিক মানুষকে সহায়তা পৌঁছানোই আসল চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি বলছে, আমলাতন্ত্রের ঝক্কি কমানো ও ডিজিটাল সেবা বাড়ানোই তাদের সমাধান। আমীর খসরুর ভাষায়, বাংলাদেশ ‘অতিরিক্তভাবে নিয়ন্ত্রিত দেশ’, যেখানে অনুমতির স্তর ব্যবসার খরচ বৃদ্ধি করে ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে।
জামায়াতের ‘স্মার্ট সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড’
জামায়াতের মূল সামাজিক সুরক্ষা প্রস্তাব হলো ‘স্মার্ট সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড’। এর মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসেবা, কর ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি একীভূত করা হবে।
জামায়াতের এই পরিকল্পনায় যুক্ত রয়েছেন যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের সোয়ানজি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোকররম হোসেন। তিনি বলেন, জামায়াতের লক্ষ্য ‘সুশাসন এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিতে শূন্য সহনশীলতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা অর্জন’। তাঁর মতে, এটি নগদ টোকেন বিতরণ নয়, বরং এমন একটি একক পদ্ধতি, যা সুবিধা বণ্টনের ঝক্কি কমাবে।
তবে সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, রাজস্ব আদায় না বাড়লে এসব দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন। দলগুলোকে অর্থায়ন, সময়সীমা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষক আসিফ শাহান বলেন, এসব প্রতিশ্রুতি জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হলো—মানুষ জটিল বার্তা পছন্দ করে না। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা ‘সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড’ সহজ ও স্মরণযোগ্য। তবে ভোটাররা এটাও দেখছেন, সুবিধা সবার জন্য, নাকি শুধু দলীয় অনুসারীদের জন্য।
চাকরি, শিক্ষা ও তরুণ ভোটার
কার্ডভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার বাইরে সবচেয়ে বড় টান তরুণ ভোটারদের দিকে। বাংলাদেশের ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কলেজ-শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক কর্মহীন। সামগ্রিক বেকারত্ব ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
বিএনপি ১৮ মাসে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ‘শিক্ষিত বেকারদের’ চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার কথা বলেছে। পাশাপাশি মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগের অঙ্গীকার করেছে।
ডিজিটাল অর্থনীতিকে বড় নিয়োগদাতা হিসেবে তুলে ধরে বিএনপি ৮ লাখ আইটি চাকরি ও পেপ্যালসহ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াত পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ, প্রতিটি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’, জেলা পর্যায়ে ‘জব ব্যাংক’, ৫০ লাখ চাকরি সংযোগ, ৫ লাখ উদ্যোক্তা ও ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরির কথা বলছে। বেকার স্নাতকদের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত মাসে ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণের প্রস্তাবও রয়েছে দলটির।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব চাকরি সৃষ্টির জন্য ৮ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন। হোসেন জিল্লুর বলেন, সুদমুক্ত ঋণ অনেক সময় জনপ্রিয়তাবাদী হলেও কার্যকর সমাধান নয়—আসল সমাধান দক্ষতা ও বাস্তব চাকরি।
করছাড়, কৃষি ও স্বাস্থ্য
জামায়াত করপোরেট কর ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দিয়েছে। বিএনপি নির্দিষ্ট হার না জানালেও ব্যবসাবান্ধব সংস্কারের কথা বলছে।
জামায়াত শিল্প খাতে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির দাম তিন বছর স্থির রাখার অঙ্গীকার করেছে—যাকে হোসেন জিল্লুর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি বলে মনে করেন।
কৃষিতে বিএনপি ‘ফার্মার কার্ড’ ও জামায়াত সুদমুক্ত ঋণের কথা বলছে। স্বাস্থ্য খাতে বিএনপি ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও জামায়াত প্রবীণ ও শিশুদের জন্য বিনা খরচে চিকিৎসা, ৬৪ জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, প্রশ্ন শুধু বড় প্রতিশ্রুতি নয়—নতুন সরকার অর্থনীতিকে চাপে না ফেলে কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, সেটা।
আর চাকরিপ্রার্থী রাফির কথায়, ‘প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ। কিন্তু ব্যবসায় চাঁদাবাজি আর চাকরিতে ঘুষের সংস্কৃতি না বদলালে আমরা আবার আগের জায়গাতেই ফিরে যাব।’