মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার ২০২৫–এর বিজয়ী শিল্পীরা অনুষ্ঠান শেষে এক ফ্রেমে। গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে
মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার ২০২৫–এর বিজয়ী শিল্পীরা অনুষ্ঠান শেষে এক ফ্রেমে। গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে

মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার ২০২৫

মঞ্চে দ্যুতি ছড়ালেন তারকারা

মঞ্চ সাজানো ছিল আলোয় আলোয়। বিনোদনজগতের তারকাদের উপস্থিতিতে ঝলসে উঠল মিলনায়তন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে আলোর রোশনাই, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ, অর্জনের স্বীকৃতি আর জমকালো পরিবেশনায় মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারের ২৭তম আয়োজন পরিণত হয়েছিল আনন্দযজ্ঞে।

অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল সন্ধ্যা ছয়টায়। অবশ্য এর ঘণ্টাখানেক আগে থেকেই তারকারা আসতে থাকেন। প্রধান প্রবেশপথ থেকে মিলনায়তনের সামনের লবি পর্যন্ত ছিল লালগালিচা। সেই রক্তিম পথ ধরে তাঁরা এসেছেন অভ্যর্থনার মঞ্চে। সেখানে তাঁরা সাম্প্রতিক কাজ, পুরস্কার—এসব নিয়ে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করেছেন। আলোকচিত্রীদের অনুরোধ রেখেছেন ক্যামেরার সামনে নানান ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে। ছবি তোলার পরে অনেকেই তাঁদের সহশিল্পী ও পরিচিতজনদের পেয়ে খানিকটা সময় লবিতে দাঁড়িয়ে মগ্ন হয়েছেন আলাপচারিতায়। আর পায়ে-পায়ে এগিয়ে প্রবেশ করেছেন মিলনায়তনে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রথম আলোর হেড অব কালচারাল প্রোগ্রাম কবির বকুল মঞ্চে এসে সবাইকে স্বাগত জানান। শুভেচ্ছা বক্তব্যে প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, আজ এক উদ্‌যাপনের দিন। শিল্পীরা পারেন বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সুন্দরভাবে বিপুলভাবে বিশ্বের বুকে তুলে ধরতে। এরপর বক্তব্য দেন স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মালিক মোহাম্মদ সাঈদ। তিনি বলেন, প্রথম আলোর সঙ্গে স্কয়ার গ্রুপ দীর্ঘদিন থেকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি দেশে অনেক ভালো ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

আগামী দিনগুলোতে আরও ভালো কাজ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এরপর আজীবন সম্মাননা প্রদান পর্বে উপস্থাপনার জন্য বিশিষ্ট অভিনয়শিল্পী আফজাল হোসেনকে মঞ্চে আসার আমন্ত্রণ জানান আনিসুল হক।

আফজাল হোসেন দর্শকদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কারটি হলো ‘আজীবন সম্মাননা’। এ বছর কে পাচ্ছেন আজীবন সম্মাননা, তা দেখে নেব পর্দায়। মঞ্চের এলইডি পর্দায় ভেসে ওঠে জননন্দিত চলচ্চিত্র অভিনেতা আলমগীরের ছবি। দর্শকেরা করতালিতে অভিনন্দিত করেন তাঁকে। আলমগীরের জীবন ও অভিনীত চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দৃশ্য পর্দায় তুলে ধরে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন অভিনেতা আলমগীর। পুরস্কার তুলে দেন সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা, পাশে ছিলেন স্কয়ার টয়লেট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী। গতকাল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে

মঞ্চে আসেন আলমগীর। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লা। সঙ্গে ছিলেন স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী ও প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান।

এরপর মেরিল-প্রথম আলোর পুরস্কারের মূল পর্ব শুরু হয় এক জমকালো পরিবেশনা দিয়ে। একঝাঁক সহশিল্পী নিয়ে যন্ত্রবাদনের সঙ্গে আধুনিক নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নেন মন্দিরা চক্রবর্তী, প্রার্থনা ফারদিন দীঘি, পারসা ইভানা ও সুনেরাহ বিনতে কামাল।

নৃত্য পরিবেশনায় মন্দিরা চক্রবর্তী, পারসা ইভানা, প্রার্থনা ফারদিন দীঘি, সুনেরাহ বিনতে কামালসহ অন্যরা

এরপর মঞ্চে আসেন এই প্রজন্মের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী মেহজাবীন চৌধুরী। চমৎকার পরিবেশনার জন্য এই চার শিল্পীকে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানান দর্শক।

এ সময় মঞ্চের নেপথ্য থেকে ভেসে আসে কাবাডি খেলার দমের শব্দ ‘কাবাডি, কাবাডি, কবাডি…’। এই কাবাডির দম নিয়ে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে মঞ্চে আসেন আরেক সঞ্চালক অভিনেতা আফরান নিশো। সরস কথোপকথনের ভেতর দিয়ে তাঁরা অনুষ্ঠান এগিয়ে নেন। পর্দায় ভেসে ওঠে তাঁদের কথাবার্তার সঙ্গে সংগতিময় বিভিন্ন দৃশ্য। নেপথ্য বাজতে থাকে ‘আমি ফাইসা গেছি’, ‘বুক চিনচিন করছে হায়’ এমন গানের সুর।

পুরস্কার পর্ব শুরু হয় সীমিতদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রের সমালোচক পুরস্কার প্রদানের মধ্য দিয়ে। এতে সেরা চিত্রনাট্য, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেত্রী ও সেরা অভিনেতা—এই চার পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রথমেই পর্দায় দেখানো হয় কারা ছিলেন বিচারকমণ্ডলীতে। এরপর পর্দায় আসে মনোনীতদের পরিচিত। শেষে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে ও তাঁদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন জনপ্রিয় অভিনেতা জাহিদ হাসান ও আজমেরী হক বাঁধন। বিজয়ীরা পুরস্কার নিয়ে জানান সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া।

পুরস্কার প্রদানের পর সঞ্চালক নিশো বলেন, ‘আমাদের দেশে সাধারণত বিয়ের পরে নায়িকাদের কদর খানিকটা কমে যায়। মেহজাবীনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে।’ মেহজাবীনের মোক্ষম জবাব, ‘তাতে তোমার কষ্ট হচ্ছে নাকি?’ এভাবেই কিছু সময় চলতে থাকে দুই সঞ্চালকের খুনসুটি। এর রেশ ধরেই শুরু হয় দ্বিতীয় পরিবেশনা।

সমবেত নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনায় অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়া

‘কন্যা কন্যা কন্যা রে’ এবং ‘কলিজার জান’ গানের সঙ্গে নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে মঞ্চ মাতান নুসরাত ফরিয়া। এরপর আবার পুরস্কার প্রদানের পালা। এবার ওয়েব সিরিজের পুরস্কার। এই বিভাগেও সেরা সিরিজ, পরিচালক, অভিনেত্রী ও অভিনেতার মোট চারটি পুরস্কার। পর্দায় দেখানো হলো বিচারকমণ্ডলী ও মনোনীতদের। মঞ্চে এলেন বিজয়ীরা। বিশিষ্ট অভিনেতা আজিজুল হাকিম ও অভিনেত্রী আফসানা মিমি পুরস্কার তুলে দেন বিজয়ীদের হাতে।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন অভিনেতা আফরান নিশো ও অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী।

ওয়েব সিরিজের পুরস্কারের পর নিশো আর মেহজাবীন সাম্প্রতিক জনপ্রিয় সিনেমা, তেলাপোকা নিয়ে ভয়, এমনকি জ্বালানি তেলের সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে রসিকতার ভেতর দিয়ে দর্শকদের নিয়ে যান অনুষ্ঠানের তৃতীয় পরিবেশনা উপভোগের জন্য।

মুহূর্তের জন্য নিভে যায় মঞ্চের আলো। এরপর পর্দায় ফুটে ওঠে নগরবাউল জেমসের ওপর নির্মিত চিত্রমালা। তাঁর তিনটি জনপ্রিয় গান—‘মা’, ‘বাবা’ ও ‘আসবার কালে’ গাইতে গাইতে মঞ্চে আসেন মঈদুল ইসলাম শুভ, কিশোর দাস ও ইমরান মাহমুদুল। তাঁদের পরিবেশনা শেষ হতেই মঞ্চে আসেন জেমস। দর্শকেরা বিপুল করতালিতে তাঁকে অভিনন্দিত করেন। তিনি যখন কবি শামসুর রাহমানের লেখা ‘আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেব’ গাইতে শুরু করেন, তখন তাঁর এই সুরধ্বনি যেন আকাশের নক্ষত্রে পৌঁছে যায়।

মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার অনুষ্ঠানে মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন জনপ্রিয় শিল্পী জেমস

নিশো ও মেহজাবীন মঞ্চে এসে জেমসের বিখ্যাত গানগুলো দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁরা জানান, এই মঞ্চে এখন বাংলা গানের যথার্থ সুপারস্টার নগরবাউল জেমসকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হবে।

মঞ্চে এসে জেমসের হাতে সম্মাননা তুলে দেন স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী ও প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান।

পুরস্কার গ্রহণ করে জেমস বলেন, ‘মেরিল-প্রথম আলো বিশেষ সম্মাননা পেয়ে ভালো লাগছে। এটা লাইফটাইম অ্যাওয়ার্ড নয়। জীবনের এখনো অর্ধেক বাকি আছে বলে মনে করি।’ সবাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে মঞ্চ ছাড়েন তিনি।

অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য নিয়ে আসা এই বর্ণাঢ্য পর্বের পরে আবার পুরস্কার প্রদানের পালা। পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রে সমালোচক পুরস্কার। এবারও চারটি পুরস্কার—সেরা চলচ্চিত্র, পরিচালক, অভিনেত্রী ও অভিনেতা। পর্দায় দেখানো হলো বিচারকমণ্ডলী ও মনোনীতদের। বিজয়ীদের পুরস্কার তুলে দেন নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম ও অভিনয়শিল্পী রিচি সোলাইমান।

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে বাঁ থেকে মেহজাবীন চৌধুরী, জোভান, তৌসিফ, তটিনী, খায়রুল বাশার, কেয়া পায়েল ও আফরান নিশো

এরপরে ছিল আরেকটি ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা। সঞ্চালকেরা মঞ্চে ডেকে নেন এই প্রজন্মের জনপ্রিয় অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব, ফারহান আহমেদ জোভান, খায়রুল বাসার এবং অভিনেত্রী কেয়া পায়েল ও তানজিম সাইয়ারা তটিনীকে। তাঁরা সঞ্চালকদের সঙ্গে মজার মজার কথাবার্তা, তাঁদের সাম্প্রতিক কাজ, অভিজ্ঞতা বিনিময়ে সবাই মিলে ‘চলো না ঘুরে আসি’ গানের কয়েক চরণ গেয়ে দর্শকদের আনন্দ দিয়েছেন।

এরপর ছিল তারকা জরিপ পুরস্কার। সারা বছরের কাজ নিয়ে পাঠকদের ভোটে ধাপে ধাপে এই পুরস্কার চূড়ান্ত করা হয়। তারকা জরিপের প্রথমে ছিল সেরা গায়ক-গায়িকার দুটি পুরস্কার। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে মঞ্চে আসেন সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদার ও মেহরীন মাহমুদ। যথারীতি পর্দায় দেখানো হলো মনোনীতদের পরিচিতি। তারপর বিজয়ীদের নাম ঘোষণা ও পুরস্কার তুলে দেওয়ার পালা।

এর মধ্যে বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে গেছে, মঞ্চে তেমন চমক নেই। তাই সঞ্চালকেরা দর্শকদের চমকে দিতে মঞ্চে রুকাইয়া জাহান চমকের আসার ইঙ্গিত দিলেন। নিশো গেয়ে শোনালেন ‘চুড়ি ছমছম বাজে…মন বসে না কোনো কাজে…।’ মঞ্চে এলেন রুকাইয়া জাহান চমক, জিনিয়া জাফরিন লুইপা, ইরফান সাজ্জাদ, ফররুখ রেহান, প্রান্তর দস্তিদার, তমা মির্জা ও জিয়াউল রোশান। ‘চুড়ি ছমছম’, ‘মহাজাদু’ ও ‘চাঁদমামা’ গানের সঙ্গে নৃত্যে দর্শদের মাতিয়ে রাখেন তাঁরা।

রুকাইয়া জাহান চমক ও জিনিয়া জাফরিন লুইপার নৃত্য পরিবেশনা

এরপর ছিল সেরা নবীন অভিনেত্রী, সীমিতদৈর্ঘ্য চিত্রে সেরা অভিনেত্রী ও সেরা অভিনেতার তিনটি পুরস্কার। যথারীতি মনোনয়ন দেখানো হলো পর্দায়। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন নির্মাতা আশফাক নিপুন ও অভিনয়শিল্পী ত্রপা মজুমদার।

শেষে ছিল তারকা জরিপের সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগের তিনটি পুরস্কার। মনোনয়ন দেখানো হলো পর্দায়। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন নির্মাতা শিহাব শাহীন ও চিত্রনায়িকা পরীমনি।

মোট ২০টি পুরস্কার প্রদানের পর বিজয়ীদের নিয়ে মঞ্চ উজ্জ্বল করা মুহূর্ত স্মরণীয় করে রাখতে ব্যস্ত হলেন আলোকচিত্রীরা। আর সেই সময়ের সাক্ষী হয়ে সন্ধ্যাটিকে স্মৃতিতে স্মরণীয় করে রাখলেন দর্শকেরাও।