
বেলা ৩টা বেজে ৬ মিনিট। পুলিশের কঠোর নিরাপত্তায় আদালতের হাজতখানা থেকে বের করা হয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে। তাঁদের হাতে হাতকড়া না থাকলেও মাথায় হেলমেট ও বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো ছিল।
নজরুলের মুখে মাস্ক আর বাঁহাতে ছিল সোনালি রঙের ঘড়ি। পুলিশের নিরাপত্তায় হাজতখানা থেকে বের করে সিঁড়ি দিয়ে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের পঞ্চম তলায় ৮ নম্বর আদালতের কাঠগড়ায় ওঠানো হয় তাঁদের। বেলা ৩টা ১২ মিনিটে পুলিশ হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট খুলে দেয়। এ সময় বিচারক এজলাসে না থাকায় গাজী নজরুল তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেন। বেলা ৩টা ১৪ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসেন। আদালতে উপস্থিত সবাইকে শান্ত হওয়ার নির্দেশ দিয়ে ৩টা ১৫ মিনিটে শুনানি শুরু করেন।
এ সময় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মামলার নম্বরসহ আসামি গাজী নজরুল (৭৫) ও তাঁর স্ত্রী মাকছুদার (৬৫) নাম বলতেই গাজী নজরুল মাথা নিচু করেন। তখন কাঠগড়ায় নজরুলের পেছনে সরে গিয়ে কান্না করতে দেখা যায় তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে। এরপর শুনানির বেশির ভাগ সময় গাজী নজরুল মাথা নিচু করে ছিলেন। স্ত্রী মাকছুদা পাশেই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা থানার এসআই শামসুজ্জোহা সরকার আসামি নজরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, মরিয়ম খাতুন ফাঁস লাগিয়ে মারা যাওয়ার সময় তাঁরা একই বাসায় ছিলেন। এই আত্মহত্যার ঘটনায় তাঁদের প্রভাব আছে কি না, তা উদঘাটনের জন্য রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
অপর দিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিনের আবেদন করেন। আদালতকে তিনি বলেন, আসামি একজন মাননীয় সংসদ সদস্য। তিনি ও তাঁর স্ত্রী বয়স্ক ব্যক্তি। আজকের মামলাটি আত্মহত্যায় প্ররোচনা মামলা। তিনি একজন সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তযোদ্ধা, চারবারের এমপি; তাঁর স্ত্রী একজন শিক্ষিত ব্যক্তি। এ মামলায় তাঁদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। রিমান্ড আবেদন বাতিল করে তাঁদের জামিন দেওয়া হোক।
আসামিপক্ষের এ বক্তব্যের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী আদালতকে বলেন, আসামি নজরুল ইসলাম মামলার বাদীর শ্যালককে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে মরহুম স্ত্রীকে কবজায় নেন। মরহুমকে বিয়ে করতে একপ্রকার বাধ্য করেন। আসামি নজরুল মরহুমকে বিভিন্ন হোটেল–মোটেলে নিয়ে যান। কিন্তু বিয়ের পরে তিনি ও তাঁর প্রথম স্ত্রী একত্রে দ্বিতীয় স্ত্রী মরহুম মরিয়মকে মানসিকভাবে অনেক নির্যাতন করেন। মৃত্যুর আগে মরিয়মের লেখা চিরকুটের মাধ্যমে এসবের প্রমাণ পাওয়া যায়। দীর্ঘদিনের এ মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পারার কারণে তাঁর এ পরিণতি। আত্মহত্যার দিকে তাঁকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এটাকে পুরো আত্মহত্যাও বলা যায় না। মরিয়মের মৃত্যুরহস্য উদঘাটনের জন্য আসামিদের রিমান্ড প্রয়োজন।
একপর্যায়ে পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘ওনারা জামায়াত ইসলাম করে। এটা হচ্ছে তার নমুনা।’ এ সময় বিচারক পিপিকে থামিয়ে বলেন, ‘আমরা এই মামলার প্রসঙ্গে থাকি। রাজনীতিতে না যাই।’
পিপি বলেন, ‘জি, আমি এটাই বলতে চাচ্ছি যে তারা সব সময় সৎ লোকের শাসনের কথা বলে। কিন্তু এটা হচ্ছে সেই নমুনা যা আমরা দেখতে পাচ্ছি। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য আসামিদের রিমান্ড প্রয়োজন।’
এ সময় গাজী নজরুল সামান্য মাথা উঁচু করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করেন। স্ত্রীকে কান্না করতে নিষেধ করেন তিনি।
পরে আসামিদের পক্ষে আইনজীবী মাহবুবুর রহমান আদালতকে বলেন, আসামি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীকে ভালোবাসতেন। এ ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তদন্ত কর্মকর্তাকে তিনি সহযোগিতা করবেন। রিমান্ডে নেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। ঘটনা একটা ঘটে গেছে। রিমান্ডের প্রয়োজন নেই।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বেলা ৩টা ৩১ মিনিটে গাজী নজরুলের চার দিন এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত।
আদালতের আদেশের পর নজরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রীকে যখন কাঠগড়া থেকে নামানো হচ্ছিল, সে সময় কয়েকজন সাংবাদিক তাঁদের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চান। জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম না।’ মরিয়ম কেন আত্মহত্যা করেছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি জানি না।’
পরে বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটে নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলামকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে নিচে নামান পুলিশ সদস্যরা। তখন আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন আইনজীবী ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। পুলিশের নিরাপত্তায় সিঁড়ি দিয়ে আসামিদের হাজতখানায় নেওয়া হয়। এর আগে বেলা ২টা ২২ মিনিটে পুলিশের একটি সাদা প্রাইভেট কারে গাজী নজরুল ও তাঁর স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে এনে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়।
গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত জুলাইয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়। ওই ভিডিও নিয়ে তুমুল আলোচনা–সমালোচনার মধ্যে গাজী নজরুল ইসলাম জানান, ওই তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম।
গতকাল রোববার বিকেলে শেরেবাংলা নগরে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর গভীর রাতে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ (৪০) বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মেয়েকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। এ মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ মামলায় ওই দুজনের সঙ্গে নজরুল ইসলামের সাবেক গাড়িচালক ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। ওবায়দুর এখনো পলাতক বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, ন্যাম ভবনের যে ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের লাশ উদ্ধার হয়েছে, সেটি সংসদ সদস্য হিসেবে ব্যবহার করছিলেন গাজী নজরুল ইসলাম। তিনি এ ফ্ল্যাটে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন।
এ ঘটনায় করা মামলায় বলা হয়, গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন গাজী নজরুল। খবর পেয়ে মরিয়মের বাবা তাঁর শ্যালিকা সুফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে পৌঁছান। দেখতে পান যে ওই বাসায় অনেক মানুষের ভিড়। পরে তিনি জানতে পারেন, বাসার ভেতরের ঘরে গলায় ফাঁস দিয়েছেন মরিয়ম। ঘরের দরজা ভেতর থেকে লাগানো ছিল। পরে শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশের সহায়তায় ও উপস্থিত লোকজনের মাধ্যমে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে মরিয়মকে ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। এ সময় মরিয়মের বিছানার ওপর থেকে একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার করে পুলিশ।
মাসুম বিল্লাহ মামলায় বলেছেন, তিনি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় মুদিদোকানদার। তাঁর বড় মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে জুন মাসে ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই ন্যাম ভবনের বাসায় গাজী নজরুল দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে বসবাস করতেন। বাসায় তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদাও একসঙ্গে থাকতেন। বিয়ের পর থেকেই স্বামী ও তাঁর প্রথম স্ত্রী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক–মানসিক নির্যাতন করতেন। নির্যাতনের বিষয়টি মরিয়ম বিভিন্ন সময় মুঠোফোনে তাঁর পরিবারকে জানাতেন।