আইসিডিডিআরবি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সভার অংশগ্রহণকারীরা
আইসিডিডিআরবি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সভার অংশগ্রহণকারীরা

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রাণীর জন্য টিকা কার্ড চালুর প্রস্তাব বিশেষজ্ঞদের

প্রাণীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, জীবিকা সুরক্ষা এবং পশুপাখির মাধ্যমে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রাণীর জন্য টিকা কার্ড চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইসিডিডিআরবি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সভায় এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল মঙ্গলবার এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

‘বাংলাদেশে গবাদিপশু, পোলট্রি ও পোষা প্রাণীর কার্যকর টিকাদান ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা’র চূড়ান্ত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয় সভায়। সরকারি সংস্থা, ইপিআই, ওষুধশিল্প এবং প্রাণিস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মিলে এই নির্দেশিকা তৈরি করেছেন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (প্রশাসন) পরিচালক ডা. মো. বয়জার রহমান বলেন, ‘প্রাণীর জন্য আমাদের জাতীয় টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ। টিকাদানের ব্যবস্থা শক্তিশালী না করলে প্রাণিসম্পদ খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না।’

বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাত জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১ দশমিক ৮১ শতাংশ।  প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি এ খাতে সম্পৃক্ত। এর বিপরীতে টিকাদানের হার কম। গ্রামের কৃষকদের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ নিয়মিতভাবে তাদের প্রাণীদের টিকা দিয়ে থাকেন।

সভায় বলা হয়, মানুষের জন্য সফল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি থাকলেও প্রাণীর জন্য সমন্বিত জাতীয় টিকাদানের ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। সচেতনতার অভাব, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ, দুর্বল শীতলীকরণ ব্যবস্থাপনা, টিকার অনিয়মিত সরবরাহ এবং প্রশিক্ষিত ভেটেরিনারি জনবলের ঘাটতি—এসব কারণে টিকাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ওয়ান হেলথের প্রতিষ্ঠাতা ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘হাম ও বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাবগুলো আমাদের শিক্ষা দেয় যে টিকাদানে ঘাটতি থাকলে মানুষ ও প্রাণী উভয়ের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। প্রাণীর টিকাদান শুধু প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নয়—এটি পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যকেও সুরক্ষিত করে। টিকার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং উদীয়মান রোগের ঝুঁকির দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য শক্তিশালী নজরদারির ব্যবস্থা জরুরি।’

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশে সংক্রামক রোগের একটি বৈশ্বিক ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত, যার প্রায় ৭০ শতাংশই জুনোটিক বা প্রাণী থেকে আসে। উচ্চ জনসংখ্যা ঘনত্ব, মানুষ ও প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ, জীবন্ত পশুপাখির বাজার এবং দ্রুত নগরায়ণ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। অ্যানথ্রাক্স, রেবিস ও বার্ড ফ্লুর পুনরাবৃত্ত প্রাদুর্ভাব এই দুর্বলতা বৃদ্ধি করে।

প্রাণীর টিকাদান, শনাক্তকরণ ও রেকর্ড সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের অভাব হলো কার্যকর নজরদারি ও প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার দুর্বল দিক।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইসিডিডিআরবি ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় একটি কাঠামোবদ্ধ টিকাদানব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে গবাদিপশু, পোলট্রি ও পোষা প্রাণীর জন্য টিকা কার্ড চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কার্ডে প্রাণীর পরিচিতি, টিকাদানের ইতিহাস এবং সময়সূচি সংরক্ষণ করা হবে, যা টিকাদান কার্যক্রমের নজারদারি ও সমন্বয়কে আরও কার্যকর করবে।

এ উদ্যোগ টিকাদানের হার বৃদ্ধি, নজরদারি জোরদার এবং প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করবে। এর মাধ্যমে প্রাণীর মৃত্যুহার কমবে, চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস পাবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।
আইসিডিডিআরবির ওয়ান হেলথ রিসার্চ ইউনিটের বিজ্ঞানী ও টিম লিডার ডা. সুকান্ত চৌধুরী বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে নির্দেশিকা ও টিকাকার্ড চালু করা হচ্ছে, যা কৃষকদের টিকাদান ট্র্যাক করতে, কভারেজ বাড়াতে এবং রোগ প্রতিরোধ জোরদার করতে সহায়তা করবে। এতে প্রাণীর মৃত্যুহার কমবে এবং প্রাণিসম্পদের মূল্য বৃদ্ধি পাবে, যা কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের জন্য উপকারী হবে।

সভায় অংশগ্রহণকারীরা প্রস্তাবিত নির্দেশিকাটি পর্যালোচনা করেন। এই কাঠামোর মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিক রোগের জন্য মানসম্মত টিকাদান সময়সূচি, টিকাকার্ড চালু, উন্নত প্রতিবেদন ও সমন্বয়ব্যবস্থা এবং ওয়ান হেলথ পদ্ধতির আওতায় প্রাণী ও মানবস্বাস্থ্য–ব্যবস্থার সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সভায় অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেন, টিকাদানের ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে রোগের বোঝা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমবে, কৃষকের আয় বাড়বে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, প্রাণী থেকে মানুষে রোগের সংক্রমণ কমবে এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় সহায়তা করবে।

গোলটেবিল আলোচনার শেষে অংশগ্রহণকারীরা একটি সমন্বিত, প্রমাণভিত্তিক প্রাণী টিকাদানের ব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মিলিত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এটি ওয়ান হেলথ উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন আলোচকেরা।