
রাজধানীর কুড়িল বাজারের কাছাকাছি এলাকার বাসিন্দা সেলিনা গত বছর চতুর্থবারের মতো অন্তঃসত্ত্বা হন। প্রসবপূর্ব সেবা চারবার নেওয়ার কথা থাকলেও দুবার নিয়েছিলেন তিনি। একবারও আলট্রাসনোগ্রাম ও গর্ভকালীন কোনো ধরনের পরীক্ষা করেননি। বাড়িতেই সন্তানের জন্ম দেন সেলিনা। ছয় ঘণ্টা পর তাঁর সন্তান মারা যায়।
সরকারি হাসপাতালে প্রসবপূর্ব চারবারের সেবা বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, প্রসবপূর্ব সেবার প্রথম ধাপে যত মা সেবা নেন, তার তুলনায় দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে সেবা নেওয়ার হার আরও কমতে থাকে।
গত বছর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত উপজেলা থেকে নগর পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে প্রথমবারের তুলনায় চতুর্থবার সেবা নেওয়ার হার ছিল ৬৪ শতাংশ কম। আর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর পরিচালিত ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে প্রথমবারের তুলনায় চতুর্থবার অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সেবা নেওয়ার হার ৬০ শতাংশ কম ছিল।
প্রসবপূর্ব চারবার সেবা না নেওয়ার কারণ হিসেবে কেউ বলেছেন, যাতায়াত, ওষুধপত্রের খরচ না থাকার কথা। কেউ বলেছেন, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অনাগ্রহের কথা। কেউ বলেছেন, বাড়ি থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বেশি দূরত্বের কথা।
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, মা ও নবজাতকের মৃত্যু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য। একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে অন্তত চারবার প্রসবপূর্ব সেবা দিলে একটি পরিবার সুস্থ একটি শিশু পেতে পারে। ওই মা প্রসবকালীন জটিলতা থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
মায়েদের প্রসবপূর্ব মোট সেবা নেওয়ার হার দ্বিতীয়বারে ৪০ শতাংশ কম, তৃতীয়বারে ৩৩ শতাংশ কম এবং চতুর্থবারে ৮ শতাংশ কম ছিল। গত বছর এসব হাসপাতালে ৮০০ মায়ের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদন ‘মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০১৯’ অনুসারে দেশে গর্ভাবস্থায় অন্তত একবার সেবা নেন ৭৫ শতাংশ মা। পূর্ণ চারবার সেবা নেন মাত্র ৩৭ শতাংশ মা। ২০২২ সালে এই হার ৫০ শতাংশ করার লক্ষ্য ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।
মায়েদের প্রসবপূর্ব চারবারের সেবা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি করা যায়নি। সেবাদানও সহজলভ্য ও নির্ভরযোগ্য পর্যায়ে যায়নি। রয়েছে চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মকর্তার সংকট।
হাসপাতালে গেলে ওষুধপত্র কেনা, যাতায়াত ভাড়া কিছু খরচ লাগেই।কমলা, নেত্রকোনা
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বলছে, একটি ইউনিয়নে গড়ে ৩৭ জনের বেশি মা অন্তঃসত্ত্বা থাকেন। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসক থাকেন না। প্রসবকালীন সেবা দেন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা (স্যাকমো) এবং পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক (এফডব্লিউভি)।আবার এফডব্লিউভির ২ হাজার ২০০ পদ খালি রয়েছে। কর্মরত একজন এফডব্লিউভিকে সপ্তাহে দুই দিন স্যাটেলাইট ক্লিনিকে গিয়ে সেবা দিতে হয়। উপজেলা পর্যায়ে একজন চিকিৎসক থাকেন। তাঁর অধীনে কমপক্ষে আটটি ইউনিয়ন থাকে। উপজেলাগুলোতে ৬০০ চিকিৎসক কম রয়েছেন।
ঢাকার তেজগাঁও সদর ক্লিনিকের এফডব্লিউভি লিজা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, অনেক অন্তঃসত্ত্বা মাকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন সেবা না নিতে চাপ দেন। তাঁদের ভাষ্য, বেশি সেবা নিলে, ওষুধ খেলে গর্ভের সন্তান বড় হয়ে যাবে। তখন অস্ত্রোপচার ছাড়া প্রসব হবে না।
গত বছর মে মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত সন্তান প্রসব করেন আসমা আক্তার (২২) নামের এক নারী। আসমার বড় বোন রুনা আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, গর্ভাবস্থায় বোনের স্বামী কখনো তাঁর বোনকে চিকিৎসকের কাছে নেননি।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাবাড়ী ইউনিয়নের হেলালিপাড়া গ্রামের শ্যামা রানি পাহাড়ির (৩০) দুই সন্তানের বয়স ৭ বছর ও দেড় বছর। স্বামী রিপন পাহাড়ি ভ্যানচালক। শ্যামার দুটো সন্তানই বাড়িতে ধাত্রীর হাতে প্রসব হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি শ্যামার স্বামী রিপন পাহাড়ি মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিছুটা দূরে। তা ছাড়া তাঁর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় সুস্থই ছিলেন। তাই কখনো চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি।
নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বাসিন্দা কমলা খাতুন রাজধানীর কুড়িল বাজারে সেলিনার ছোট ভাইয়ের বোন। সেলিনার সন্তানের জন্মের আগের বছর কমলাও বাড়িতে সন্তান প্রসব করেছেন। কমলা বললেন, হাসপাতালে গেলে ওষুধপত্র কেনা, যাতায়াত ভাড়া কিছু খরচ লাগেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত ৫৮৬টি সরকারি হাসপাতালে গত বছর ৯ লাখের বেশি অন্তঃসত্ত্বা নারী প্রথমবার প্রসবপূর্ব সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৪৩০টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৩৩টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জেলা পর্যায়ে ১০ থেকে ২৫০ শয্যার ১২৩টি হাসপাতাল অন্তর্ভুক্ত। এসব হাসপাতালে মায়েদের প্রসবপূর্ব মোট সেবা নেওয়ার হার দ্বিতীয়বারে ৪০ শতাংশ কম, তৃতীয়বারে ৩৩ শতাংশ কম এবং চতুর্থবারে ৮ শতাংশ কম ছিল। গত বছর এসব হাসপাতালে ৮০০ মায়ের মৃত্যু হয়েছে। গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের পর ৪২ দিনের মধ্যে মায়ের মৃত্যুকে মাতৃমৃত্যু হিসেবে ধরা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক (মাতৃস্বাস্থ্য) আজিজুল আলিম প্রথম আলোকে বলেন, অনেক মা এখনো মনে করেন, সমস্যা না থাকলে একবারে প্রসবের সময়ে হাসপাতালে গেলেই হবে। চারবার সেবা নেওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে মাঠপর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। মায়েদের বোঝানো হচ্ছে যে শুরু থেকেই জটিলতা ধরা গেলে চিকিৎসা দিয়ে সমাধান দেওয়া সম্ভব।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতায় ৩ হাজার ৩৬৪ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৮৩টি, উপজেলা পর্যায়ে ১২টি ও জেলা পর্যায়ে ৬০টি মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র এবং মা ও শিশুর জন্য ঢাকায় ৩টি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। ওই সব সেবাকেন্দ্রে (বিশেষায়িত হাসপাতাল বাদে) গত বছর সাড়ে ১২ লাখের বেশি অন্তঃসত্ত্বা নারী প্রথমবার প্রসবপূর্ব সেবা নিয়েছেন। সেবা নেওয়ার হার দ্বিতীয়বারে ৩৬ শতাংশ, তৃতীয়বারে ২৭ শতাংশ কম এবং চতুর্থবারে ১৫ শতাংশ কম ছিল। ৪৫৭ মায়ের মৃত্যু হয়েছে।
অনেক মা এখনো মনে করেন, সমস্যা না থাকলে একবারে প্রসবের সময়ে হাসপাতালে গেলেই হবে। চারবার সেবা নেওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে মাঠপর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। মায়েদের বোঝানো হচ্ছে যে শুরু থেকেই জটিলতা ধরা গেলে চিকিৎসা দিয়ে সমাধান দেওয়া সম্ভব।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক (মাতৃস্বাস্থ্য) আজিজুল আলিম
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক (কৈশোর ও প্রজনন স্বাস্থ্য) মো. মনজুর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এখনো দেশে ৫০ শতাংশ প্রসব হয় বাড়িতে। হাসপাতালে এসে, অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব এবং প্রসবপূর্ব চারবার সেবা নেওয়া নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করা হচ্ছে। অনেক মা হাসপাতালে প্রসবপূর্ব সেবা নেওয়ার বিষয়ে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনো সহায়তা পান না। অথচ গর্ভাবস্থায় যেকোনো সময় যে একজন মায়ের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ-চিকিৎসকদের সংগঠন ওবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সভাপতি ফেরদৌসী বেগম প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) নির্দেশনায় গর্ভধারণের পর থেকে প্রসব পর্যন্ত অন্তত আটবার সেবা নেওয়ার কথা বলা আছে। তবে আর্থিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার এ সেবা অন্তত চারবার নেওয়ার কথা বলে, কিন্তু সেটিও পূরণ হয় না। ২৫ শতাংশ মা একবারও সেবা নিতে আসেন না। গর্ভকালীন সময়ে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোনো ধরনের সংক্রমণ দেখা দিলে প্রসবপূর্ব সেবায় তা ধরা পড়ে। তখন যথাযথ চিকিৎসা দিলে মা সুস্থ হয়ে ওঠেন, গর্ভের সন্তানও ভালো থাকে। এতে অপরিণত ও কম ওজনের শিশুর জন্ম, শিশুর জন্মগত ত্রুটি, নবজাতক মৃত্যু, মৃত শিশু জন্ম এবং মাতৃমৃত্যু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিরোধ করা যায়।
অধ্যাপক ফেরদৌসী বেগম আরও বলেন, অন্তঃসত্ত্বা মা শুধু সেবা নিলেই হবে না, প্রসবপূর্ব চারবার সেবার মানও নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নিরাপদ প্রসবের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। চিকিৎসকসহ সেবাদানকারী জনবল ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করতে হবে। ইউনিয়নেও মিডওয়াইফ নিয়োগ করতে হবে।