দেশের ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার অন্যতম দুই শীর্ষ প্রতিষ্ঠান উইটন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও গাইডেন্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ‘হিফজ অ্যান্ড এ লেভেল গ্রাজুয়েশন সেরিমনি ২০২৬’
দেশের ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার অন্যতম দুই শীর্ষ প্রতিষ্ঠান উইটন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও গাইডেন্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ‘হিফজ অ্যান্ড এ লেভেল গ্রাজুয়েশন সেরিমনি ২০২৬’

উইটন ও গাইডেন্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সমাবর্তন

এক মঞ্চে ১০০ হাফেজ ও পাঁচ কৃতী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা

সন্ধ্যা ছয়টা। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের মূল প্রবেশ পথের সামনে দীর্ঘ লাইন। আঙিনাজুড়ে ফটোবুথ, ফেস্টুন আর কৃতি শিক্ষার্থীদের ছবি সম্বলিত ব্যানার। বড় পর্দায় প্রদর্শিত হচ্ছে অডিটোরিয়ামের ভেতরে মূল মঞ্চের সরাসরি পরিবেশনা।

গতকাল বুধবার এমন চিত্র দেখা গেল দেশের ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার অন্যতম দুই শীর্ষ প্রতিষ্ঠান উইটন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও গাইডেন্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ‘হিফজ অ্যান্ড এ লেভেল গ্রাজুয়েশন সেরিমনি ২০২৬’ আয়োজনে। জাঁকজমকপূর্ণ এই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ১০০ জন হাফেজে কোরআন এবং ‘এ’ লেভেলের কৃতিত্বপূর্ণ ফল অর্জনকারী পাঁচ জন শিক্ষার্থীকে সনদ ও মেডেল দেওয়া হয়।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের প্রথম কোনো ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক হাফেজে কোরআনকে সংবর্ধনা ও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

ইসলামী মূল্যবোধ ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ের বার্তা

পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় সমাবর্তন অনুষ্ঠান। এরপর বড় পর্দায় দেখানো হয় স্কুল দুটির ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র। তাতে তুলে ধরা হয় প্রতিষ্ঠান দুটির অর্জন, সাফল্য এবং সিলেবাসে নতুন নতুন বিষয় সংযোজনের নানা তথ্য। অডিটোরিয়ামে উপস্থিত প্রায় চার হাজার অতিথির সামনে অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্ব সঞ্চালনা করে শিক্ষার্থী খাদিজা বিনতে জামান, সৈয়দা ইয়াশা আহমেদ, জান্নাত মাহফুজ, আরিশা তাবাসসুম, মো. আহইয়ান আলম এবং আরহাম বিন জাকির।

স্বাগত বক্তব্যে প্রতিষ্ঠান দুটির অধ্যক্ষ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ জামান হাফেজে কোরআন ও তাঁদের পরিবারের মর্যাদার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.)–এর বাণী অনুযায়ী কিয়ামতের দিন হাফেজে কোরআনের পিতা-মাতাকে নূরের মুকুট পরিয়ে সম্মানিত করা হবে। কোটি কোটি মানুষের মাঝে মহান আল্লাহ তাঁদের “সাহিবুল কোরআন বা কোরআনের সঙ্গী” বলে বিশেষ উপাধিতে ডাকবেন। এই উপাধি কিন্তু পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রপতি, বিজ্ঞানী কিংবা ধনকুবেরের জন্য নয়। শুধু হাফেজে কোরআনদের জন্য।’

আবদুল্লাহ জামান আরো বলেন, ‘গাইডেন্স ও উইটন স্কুলের লক্ষ্য কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়। বরং এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা একই সঙ্গে কোরআনের ধারক, নৈতিক চরিত্রের অধিকারী এবং বিশ্বমানের শিক্ষায় শিক্ষিত হবে।’

জাঁকজমকপূর্ণ এই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ১০০ জন হাফেজে কোরআন এবং ‘এ’ লেভেলের কৃতিত্বপূর্ণ ফল অর্জনকারী পাঁচ জন শিক্ষার্থীকে সনদ ও মেডেল দেওয়া হয়

ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষায় নতুন ধারা

অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. এ এ ফ এম খালিদ হোসাইন। শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আজকের এই আয়োজন কেবল একটি সনদ প্রদানের অনুষ্ঠান নয়। বলা যায়, এটি বাংলাদেশের শিক্ষা–ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার সঙ্গে কোরআনের হিফজকে এমন সফলভাবে একীভূত করা সত্যিই প্রশংসনীয়।’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘আমি একজন অভিভাবক হিসেবেই এখানে এসেছি। আমার ছেলে গাইডেন্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়ে। এখানকার শিক্ষার্থীরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার এত চাপের মাঝেও ৩০ পারা পবিত্র কোরআন শরীফ মুখস্থ করতে পেরেছে—এটি অনন্য সাফল্য। একইসঙ্গে এটি আগামী প্রজন্মের অভিভাবকদের জন্য আশার বিষয়।’

অনুষ্ঠানে স্কুল দুটির শিক্ষক–শিক্ষার্থী–অভিভাবক ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা

হিফজ ও ‘এ’ লেভেল সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস—নীতিতে বর্তমান সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বিশ্ব যেভাবে এগিয়ে চলছে, সেখানে আমাদের সন্তানদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে বৈশ্বিক চাহিদা অনুযায়ী তাল মেলাতে পারব না। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় এই দুই প্রতিষ্ঠান যে ব্যতিক্রমধর্মী কারিকুলামে পাঠদান করছে, এটি প্রশংসার দাবি রাখে।’

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ (অপু), কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আয়াতুল ইসলাম, অক্সফোর্ড-একিউএর কান্ট্রি ডিরেক্টর শাহেন রেজা, এডেক্সেলের রিজিওনাল ম্যানেজার লিটন আবদুল্লাহ এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও হেড অব মার্কেটিং জুনায়েদ আহমেদ ও বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর তাহনী ইয়াসমিন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন মুফতি সাইফুল ইসলাম, গাজী সানাউল্লাহ রাহমানী, ড. এবিএম হিজবুল্লাহ, মাওলানা হাবিবুল্লাহ ইকবাল ও মাওলানা আব্দুর রহিম। অতিথিরা শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্কুল থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা অনুসরণের আহ্বান জানান।

আবেগঘন ‘গ্র্যাজুয়েশন পর্ব’

আয়োজনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল ‘গ্র্যাজুয়েশন পর্ব’। নাম ঘোষণার পর মঞ্চে এসে ১০০ জন হাফেজ এবং পাঁচ জন ‘এ’ লেভেলের মেধাবী শিক্ষার্থী সনদ, মেডেল ও বিশেষ স্মারক গ্রহণ করেন। অনেক অভিভাবক ও মা–বাবা তাদের সন্তানের মেধার স্বীকৃতি স্মারকসহ ছবি তোলেন। সন্তানের এই অনন্য অর্জনে অনেক অভিভাবকের চোখে দেখা যায় আনন্দাশ্রু।

মূল অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে শিক্ষার্থীদের পরিবেশিত ইসলামিক গান ও আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান এবং কোরআনের ইতিহাসভিত্তিক নাটিকায় মুগ্ধ হয় দর্শক

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, ‘একসময় মনে দ্বিধা ছিল আমার সন্তান হিফজ করবে নাকি আন্তর্জাতিক কারিকুলামে পড়বে। কিন্তু এই শিক্ষাব্যবস্থা প্রমাণ করেছে, সঠিক পরিকল্পনা, শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান ও উপযুক্ত পরিবেশ থাকলে দুই মাধ্যমেই একসঙ্গে সফল হওয়া সম্ভব।’

মূল অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে শিক্ষার্থীদের পরিবেশিত ইসলামিক গান ও আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান এবং কোরআনের ইতিহাসভিত্তিক নাটিকায় মুগ্ধ হয় দর্শক।

সমাপনী বক্তব্যে অতিথি, শিক্ষক–শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও আয়োজকদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান উইটন ও গাইডেন্স স্কুলের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘আধুনিক বিশ্বমানের শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের এই সফল সমন্বয় দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন করল। পবিত্র কোরআনের শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে আলোকিত, দক্ষ ও মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলার এই প্রয়াস ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’