মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর শ্রমবাজার, যুদ্ধের কারণে অনিশ্চয়তা

বিদেশে কর্মসংস্থান মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী যান সৌদি আরবে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ফ্লাইট অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। প্রবাসীরা ঝুঁকিতে আছেন, কাজ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ছুটিতে দেশে বেড়াতে এসে কেউ কেউ আটকাও পড়েছেন। অনেক নতুন কর্মী যেতে পারছেন না। সব মিলিয়ে ঝুঁকিতে পড়েছে বিদেশের কর্মসংস্থান।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মধ্যে গত বছরের তুলনায় এই সময়ে কাজের জন্য বিদেশ যাওয়া কমেছে। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, চলতি মার্চ মাসের প্রথম ১০ দিনে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশে যেতে ছাড়পত্র নেওয়া কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিকল্প বাজার তৈরি করা গেলে এ ঝুঁকি তৈরি হতো না। দীর্ঘ সময়েও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বড় রকমের কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়নি। দক্ষ কর্মী তৈরি করতে না পারায় ইউরোপ, জাপানের মতো সম্ভাবনাময় বাজারে কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না। প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।

অভিবাসন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষত সৌদি আরবকেন্দ্রিক শ্রমবাজার হওয়ায় যুদ্ধের প্রভাবে এখন বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিকল্প বাজার না থাকায় কর্মী পাঠানো ব্যাহত হচ্ছে, যা অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচারের শঙ্কা বাড়াচ্ছে।

বিএমইটির তথ্য বলছে, কর্মী পাঠানোর তালিকায় ১৬৮টি দেশের নাম থাকলেও গত বছর বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা ১৪১টি দেশে গেছেন। এর মধ্যে ৯০ ভাগ কর্মী গেছেন মাত্র ৫টি দেশে। ১৩টি দেশে মাত্র ১ জন করে কর্মী গেছেন, ৩৪টি দেশে ২ থেকে ১০ জন করে কর্মী গেছেন। ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ গেছেন সৌদি আরবে।

অভিবাসন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষত সৌদি আরবকেন্দ্রিক শ্রমবাজার হওয়ায় যুদ্ধের প্রভাবে এখন বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিকল্প বাজার না থাকায় কর্মী পাঠানো ব্যাহত হচ্ছে, যা অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচারের শঙ্কা বাড়াচ্ছে। বর্তমানে আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। উল্লেখ্য, চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে দুজন, বাহরাইনে ও আরব আমিরাতে একজন করে প্রবাসী বাংলাদেশি মারা গেছেন।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধকবলিত প্রবাসীদের সহায়তায় সার্বক্ষণিক হটলাইন ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ও আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে ৯ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিহত প্রবাসীর মরদেহ দাফন করা হয়েছে এবং বাকিদের মরদেহ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।

সরকার এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে উল্লেখ করে প্রবাসীকল‍্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর প্রথম আলোকে বলেন, মধ‍্যপ্রাচ‍্য সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা ফিরে এলে তাঁদের পুনর্বাসনে সহায়তা করা হবে। যাঁরা যেতে পারছেন না, তাঁদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে দূতাবাসকে অনুরোধ করা হয়েছে। ইতিমধ‍্যে আবেদনের ভিত্তিতে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও আরব আমিরাত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সরকারের লক্ষ্য হলো নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা। এর জন‍্য দক্ষ কর্মী গড়ে তোলায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সম্ভাবনাময় বাজার জাপান ও ইউরোপ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এর বাইরে এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

ইতিমধ‍্যে আবেদনের ভিত্তিতে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও আরব আমিরাত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সরকারের লক্ষ্য হলো নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা। এর জন‍্য দক্ষ কর্মী গড়ে তোলায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

১২ দিনে ৩৯১ ফ্লাইট বাতিল

ওমান থেকে গত ২১ জানুয়ারি দেশে বেড়াতে এসেছেন কুমিল্লার মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, মার্চের শুরুতে ফেরার কথা ছিল। কোম্পানি থেকে ফোনও করেছে যেতে। ফ্লাইট না থাকায় যেতে পারছেন না। এখন যেহেতু যুদ্ধ পরিস্থিতি, কিছু করার নেই। ফ্লাইট চালু হলে কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে ফিরে যেতে চান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বলছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মোট ৩৯১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে গত বুধবার ২৪টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে।

দেশে বেড়াতে এসে আটকা পড়েছেন কুমিল্লার ফরহাদ হোসাইন। তিনি বলেন, ওমানে ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম (এসি) সংশ্লিষ্ট কাজ করেন, এ সময় তাঁর কাজের চাপ বেশি। ১৫ দিনের ছুটিতে এসে আটকা পড়েছেন। কোম্পানি থেকে ফিরে যেতে চাপাচাপি করছে। কিন্তু ফ্লাইট না থাকায় যেতে পারছেন না।

সৌদিতে কিছু ফ্লাইট চালু থাকায় কর্মীদের কেউ কেউ যেতে পারছেন। কেউ কেউ ভয়ে এখন যেতে চাইছেন না।

বিএমইটি বলছে, গত মাসেও বিভিন্ন দেশে গেছেন ৬৫ হাজার ৬১৩ জন। এর মধ্যে প্রথম ১০ দিনে গেছেন প্রায় ৩৮ হাজার কর্মী। ১ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত বিদেশ যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন ২১ হাজার ১২২ জন। গত বছর একই সময়ে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৪৬ হাজার ৭৪৪ জন। তার মানে যুদ্ধ শুরুর পর এটি কমে অর্ধেকে নেমেছে। সৌদিতে কিছু ফ্লাইট চালু থাকায় কর্মীদের কেউ কেউ যেতে পারছেন। কেউ কেউ ভয়ে এখন যেতে চাইছেন না।

তৃণমূল অভিবাসীদের সংগঠন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ৪৫ থেকে ৫০ লাখ কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে আছেন। তাঁদের কী হবে, সবার চাকরি থাকবে কি না; এসব চিন্তা করতে হবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের দুর্যোগ নেমে আসবে। যাঁরা টাকা দিয়েও যেতে পারছেন না, তাঁদের ডেটাবেজ (তথ্যভান্ডার) করতে পারে সরকার, যাতে পরে যাওয়ার সুযোগ পান।

অভিবাসন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেকেই বিদেশে যেতে ঋণ করেন। এখন যেতে না পারায় ঋণের টাকাও শোধ করতে পারবেন না। পরিবার উল্টো চাপে পড়বে। ঋণগ্রস্ত পরিবারকে জরুরি সহায়তা করতে পারে সরকার।

৪৫ থেকে ৫০ লাখ কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে আছেন। তাঁদের কী হবে, সবার চাকরি থাকবে কি না; এসব চিন্তা করতে হবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের দুর্যোগ নেমে আসবে। যাঁরা টাকা দিয়েও যেতে পারছেন না, তাঁদের ডেটাবেজ (তথ্যভান্ডার) করতে পারে সরকার, যাতে পরে যাওয়ার সুযোগ পান।
তৃণমূল অভিবাসীদের সংগঠন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম

প্রলোভনের ফাঁদে পড়ার শঙ্কা

চক্র গড়ে বাণিজ্য করার অভিযোগে ২০২৪ সালের জুন থেকে বন্ধ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। উদ্যোগ নিলেও তা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চালু করা যায়নি। গত বছরে ওমান, বাহরাইনসহ বেশ কিছু বন্ধ বাজার উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজার এখনো সেভাবে খোলেনি। তবে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও সৌদি আরবের সঙ্গে মোট সাতটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এগুলো কাজে লাগাতে পারলে দক্ষ কর্মী পাঠানো যাবে।

বিদেশে কর্মী পাঠানো রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শ্রমবাজার মূলত সৌদিতে। দেশটির জেদ্দা ও রিয়াদে ফ্লাইট চালু থাকায় কিছু কর্মী যাচ্ছেন। তবে সেখানেও কর্মী যাওয়া কমেছে। ভিসা নিতে আতঙ্ক কাজ করছে কারও কারও। যাঁরা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেননি, তাঁরা ছাড়পত্র নিচ্ছেন না। অপেক্ষা করে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে চক্রের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার বাজার খোলা যাবে না।

অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু বলছে, বর্তমানে রাশিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন শ্রমবাজার। গত বছর দেশটিতে গেছেন ৪ হাজার ৬৬৩ জন। আগের বছর এটি ছিল ৯৯৩ জন। তবে ভালো বেতন ও রাশিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অভিবাসী সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে একটি চক্র। এই চক্রের একাংশ রাশিয়ার অসাধু চক্রের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশি কর্মীদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পাঠাচ্ছে।

যুদ্ধাক্রান্ত দেশগুলোর বাংলাদেশ দূতাবাসকে সক্রিয় হতে হবে। প্রতিদিন দেশে তথ্য পাঠানো উচিত। জরুরি কল্যাণ নিশ্চিত করা দরকার। নতুন শ্রমবাজার তৈরি করতে এ সময় দক্ষ কর্মী তৈরিতে জোর দিতে পারে সরকার।
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী

২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭৬ জন বাংলাদেশি অভিবাসী সমুদ্রপথে ইতালির উপকূলে পৌঁছেছেন। এই সংখ্যা গত বছর ইতালিতে আগত দেশগুলোর অভিবাসীদের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই সংখ্যাটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এখন নিয়মিত অভিবাসন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনিয়মিত পথে বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, অবৈধ পথে অনিয়মিত অভিবাসনে ঝুঁকি বাড়তে পারে। ইতালি যেতে লিবিয়া বা রাশিয়া চক্রের ফাঁদে পড়তে পারে। এ মুহূর্তে কেউ যেন কোনো প্রলোভনের ফাঁদে না পড়েন। যুদ্ধাক্রান্ত দেশগুলোর বাংলাদেশ দূতাবাসকে সক্রিয় হতে হবে। প্রতিদিন দেশে তথ্য পাঠানো উচিত। জরুরি কল্যাণ নিশ্চিত করা দরকার। নতুন শ্রমবাজার তৈরি করতে এ সময় দক্ষ কর্মী তৈরিতে জোর দিতে পারে সরকার।