রাস্তা দখল করে বসেছে দোকান। গতকাল বিকেলে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায়
রাস্তা দখল করে বসেছে দোকান। গতকাল বিকেলে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায়

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক: বিআরটি ও অবৈধ বাজার নিয়ে শঙ্কা

‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠেছে বিআরটি। এতে সংকুচিত হয়েছে মহাসড়ক। সড়কে অবৈধ বাজার ও রাস্তায় গাড়ি পার্কিংও বড় চিন্তার কারণ।

রাজধানীতে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ গাজীপুর। এ জেলায় থাকা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক হয়ে উত্তরাঞ্চলসহ প্রায় ৩২টি জেলার মানুষ ঢাকায় যাতায়াত করেন। ঈদ এলে মানুষের ঢল নামে এই মহাসড়কে। নানা দুর্ভোগ সঙ্গী করে পৌঁছাতে হয় গন্তব্যে। নির্মাণাধীন সড়ক, যানবাহনের বাড়তি চাপ, যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করানো ও যাত্রী ওঠানো-নামানোর কারণে এবারের ঈদেও এ মহাসড়ক হয়ে চলাচলে ভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠেছে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। এই প্রকল্পের কারণে মহাসড়ক সংকুচিত হয়ে গেছে। এ কারণে স্বাভাবিক সময়ে এ সড়কে যানজট লেগে থাকে। ঈদের সময় যানবাহন বাড়লে জট দীর্ঘ হয়ে কয়েক ঘণ্টাও ছাড়িয়ে যায়। আরেক চিন্তার কারণ সড়কের আশপাশে গড়ে ওঠা অবৈধ বাজার ও স্থাপনা।

তবে ঈদযাত্রা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন বেশ কিছু পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিয়েছে। গাজীপুর মহানগর পুলিশ বলছে, ঘরমুখী মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হবে। সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত, সড়কের পাশের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ, সড়কের ধারে অনিয়মিত পার্কিং বন্ধ ও নির্ধারিত স্থান ছাড়া যাত্রী ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজরদারি করতে চায় পুলিশ।

বিআরটি লেনে সংকুচিত মহাসড়ক

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিআরটি প্রকল্পের কাজ এক যুগের বেশি সময়েও শেষ হয়নি। দীর্ঘ এ সময়ে ভোগান্তি নিয়েই চলতে হচ্ছে যাত্রীদের। ঈদ এলেই ভোগান্তি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। বিশেষ করে মহাসড়কের মাঝখানে থাকা বিআরটি লেনের দুই পাশে বেষ্টনী থাকায় যানবাহন বিকল হয়ে পড়লে বা দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এবারও সেই আশঙ্কা রয়ে গেছে।

অতিরিক্ত ট্রাফিক সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা নিয়েছি। পাশাপাশি মহাসড়কে অবৈধ পার্কিং ও শৃঙ্খলাবহির্ভূত যান চলাচল বন্ধে অভিযান চালানো হবে।
আশরাফুল আলম, উপকমিশনার, ট্রাফিক, গাজীপুর মহানগর পুলিশ

গাজীপুর থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্দিষ্ট লেনে দ্রুত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে সরকার এ প্রকল্প হাতে নেয়। ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়কে নির্মিতব্য এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ৪ বছর ১ মাস। প্রকল্পটির মেয়াদ বেড়েছে পাঁচ দফা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, টঙ্গী, বোর্ডবাজার, ভোগড়া বাইপাস ও চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় বিআরটি লেনের কারণে সড়ক সংকুচিত হয়ে গেছে অনেকটা। এ কারণে প্রায়ই যানজট তৈরি হয়। ঈদে স্বাভাবিক সময়ে গাড়ি চলে অনেক বেশি। তখন এই পরিস্থিতি আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় কথা হয় বলাকা পরিবহনের চালক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিআরটির কারণে সড়কে আগের মতো জায়গা নেই। ঈদে গাড়ির চাপ বাড়লে যানজটও তীব্র হয়। অনেক সময় কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ি থেমে থাকে।

সরেজমিন দেখা যায়, গাজীপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটারে বিআরটি প্রকল্পের কাজ দেড় বছর ধরে বন্ধ। চার লেনের সড়কে যানজট শুরু হলে কয়েকটি স্থানে লেন দুটি হয়ে যায়। আবদুল্লাহপুর থেকে আসা যানবাহন টঙ্গী স্টেশন রোড, চেরাগ আলী ও কলেজ গেট হয়ে তিনটি লুপ দিয়ে নিচে নামে। এখানে প্রায়ই যানজট থাকে। 

অবৈধ বাজার, গাড়ি পার্কিংয়ে ভোগান্তি

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার অংশে ঈদের সময় যানবাহনের গতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। স্বাভাবিক সময়ে এই পথ অতিক্রম করতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগলেও ঈদের সময় তা দুই থেকে তিন ঘণ্টায় গড়ায়। বিশেষ করে বোর্ডবাজার, ভোগড়া বাইপাস, চান্দনা চৌরাস্তা এবং আশপাশের শিল্পাঞ্চলে প্রবেশ ও বের হওয়া যানবাহনের কারণে এখানে প্রায়ই দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

এ ছাড়া চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে মাওনা ও জৈনা বাজার পর্যন্ত গাজীপুরের সীমানায় মহাসড়কের দুই পাশে অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া মাস্টারবাড়ি, রাজেন্দ্রপুর, বাঘের বাজার, ভবানীপুর, মাওনা, পল্লী বিদ্যুৎ, জৈনা বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে রাস্তার ওপর অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাজারের কারণে সড়কে তৈরি হয় তীব্র যানজট। বিভিন্ন কারখানার বড় লরি ও ট্রাক সড়কের পাশে অবৈধভাবে পার্কিং করে রাখা হয়। এ কারণে যানজট যেমন লেগে থাকে, তেমনি ঘটে দুর্ঘটনাও।

মাওনা চৌরাস্তার সংযোগস্থল নিয়েও চিন্তা

শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তা উত্তরবঙ্গগামী যানবাহনের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। এখানে ঢাকা-ময়মনসিংহের সঙ্গে মাওনা-শ্রীপুর আঞ্চলিক সড়কের সংযোগ রয়েছে। ঈদের সময় দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকের চাপ বাড়লে সেখানে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।

মহাসড়কের পাশে অসংখ্য শিল্পকারখানা, বাজার ও আবাসিক এলাকা থাকায় স্থানীয় যানবাহনের চাপও কম নয়। রিকশা, সিএনজি, অটোরিকশা ও লোকাল বাস প্রায়ই মহাসড়কে যাত্রী ওঠানামা করে। এতে দূরপাল্লার যানবাহনের গতি কমে যানজট সৃষ্টি হয়। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং ও রাস্তার পাশে অস্থায়ী বাজার বসার কারণেও যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি ট্রাফিক) এস এম আশরাফুল আলম বলেন, ঈদ সামনে রেখে যানজট নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা হবে। সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিতে বাড়ানো হবে নজরদারি।

এই ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘টঙ্গী, বোর্ডবাজার, চান্দনা চৌরাস্তা ও মাওনা এলাকায় অতিরিক্ত ট্রাফিক সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা নিয়েছি। পাশাপাশি মহাসড়কে অবৈধ পার্কিং ও শৃঙ্খলাবহির্ভূত যান চলাচল বন্ধে অভিযান চালানো হবে।’