মেলার সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশকদের সংগঠন ‘প্রকাশক ঐক্য’। ঢাকা। ১৪ মার্চ
মেলার সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশকদের সংগঠন ‘প্রকাশক ঐক্য’। ঢাকা। ১৪ মার্চ

প্রকাশক ঐক্যের সংবাদ সম্মেলন

বইমেলায় ৯০ ভাগ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচটুকুও ওঠেনি

গত বছরের তুলনায় এবারের বইমেলায় বই বিক্রি কমেছে প্রায় ৮০ শতাংশ। এবারের বইমেলার ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ২০২১ সালের করোনাকালীন মেলার চেয়েও শোচনীয়। এবার মেলায় অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ ভাগ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচটুকুও ওঠেনি, যার মধ্যে প্রায় ৩০ ভাগ প্রকাশকের ৫ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি।

আজ শনিবার বিকেলে মেলার সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশকদের সংগঠন ‘প্রকাশক ঐক্য’ এসব তথ্য তুলে ধরে। বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশকেরা উপস্থিত ছিলেন।

এবারের বইমেলায় অংশ নিয়েছে ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রকাশনা তাদের স্টল করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘নির্বাচিত নতুন সরকারের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতার বার্তা হিসেবেই নিজেদের নিশ্চিত ব্যবসায়িক ক্ষতির বিষয়টি জেনেও আমরা নির্বাচন-পরবর্তী এই প্রতিকূল বাস্তবতায় ও পবিত্র রমজান মাসে মেলায় অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে জানাতে হচ্ছে যে মেলা নিয়ে আমাদের প্রাথমিক আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত নির্মম বাস্তবে পরিণত হয়েছে।’

মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা স্বপ্ন দেখি একটি ১০০ কোটি টাকার বইমেলার। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি বই বিক্রি করার স্বপ্ন কোনো অবান্তর কল্পনা নয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার একটি সুনির্দিষ্ট মার্কেটিং বাজেট থাকলে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।’

বইমেলার সামগ্রিক আয়োজনে প্রকাশকেরা যদি চালকের আসনে থাকেন এবং কর্তৃপক্ষ যথাযথ সহযোগিতা করে, তবে মেলার চেহারা পাল্টে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন মাহরুখ মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমরা ঐতিহ্যের দায়বদ্ধতা থেকে মেলায় অংশ নিয়েছি। কিন্তু মেলায় যদি বই বিক্রিই না থাকে এবং প্রকাশকেরা সর্বস্বান্ত হতে থাকেন, তবে একসময় এটি একটি “মৃত ঐতিহ্যে” পরিণত হবে, যা কারও কাম্য নয়। এবারের মেলা আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষার জায়গা।’

বইমেলায় বিক্রির এমন অবস্থাকে ‘বিপর্যয়’ উল্লেখ করে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাঁচটি সুপারিশ তুলে ধরেন আদর্শ প্রকাশনীর মাহাবুব রাহমান। সেগুলো হলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের প্রত্যেকের অন্তত একটি করে মানসম্পন্ন বইয়ের ৩০০ থেকে ৫০০ কপি ক্রয়ের জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা; প্রকাশনাশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি বই ক্রয়ের বাজেট বাস্তবসম্মতভাবে প্রণয়ন করা এবং সৃজনশীল প্রকাশনায় পেশাগত ও গুণগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকারি উদ্যোগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা; স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিগুলো উন্নত করা, বন্ধ হয়ে যাওয়া লাইব্রেরি আবার চালু করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘লাইব্রেরি ক্লাস’ বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান মাহাবুব রাহমান।

আগামী বছরের বইমেলার তারিখ এই মেলা শেষের পরপরই অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে এখনই নির্ধারণ করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি আগামী মেলাগুলোর জন্য স্টলভাড়ার বিষয়ে প্রকাশকদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রন্থনীতি বাস্তবায়নের দাবিও তোলেন এই প্রকাশক।

দেশের প্রকাশনা খাতে বাংলা একাডেমি, বাপুস এবং প্রকাশক ঐক্য—কেউ কারও প্রতিপক্ষ নয় বলে উল্লেখ করেন অনন্যা প্রকাশনীর প্রকাশক মনিরুল হক। তিনি বলেন, ‘লেখক, পাঠক ও প্রকাশক—সবার স্বার্থ সংরক্ষণ করে আমাদের বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এখানে কোনো ব্যক্তিগত অহম বা স্বার্থ সামষ্টিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পেতে পারে না। অনর্থক বিভাজন আমাদের কারও জন্যই কাম্য নয়।’

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন। তিনি বলেন, ‘শপথ গ্রহণের পরপরই মাননীয় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মহোদয় যেভাবে প্রকাশকদের কথা শুনতে ছুটে এসেছেন এবং সংকট নিরসনে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অভাবনীয়। সব পক্ষকে নিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক বইমেলা আয়োজনের সদিচ্ছা এবং প্রকাশকদের স্টলভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করার জন্য আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাই।’

প্রকাশক ঐক্যের দাবি মেনে নিয়ে প্যাভিলিয়ন প্রথা বাতিল করায় বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানান সৈয়দ জাকির হোসাইন। পাশাপাশি তিনি পাঠক, লেখক, প্রকাশকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান।