বাংলাদেশ সচিবালয়
বাংলাদেশ সচিবালয়

বিশ্লেষণ

সাংবাদিকদের সচিবালয়ে প্রবেশে নতুন করে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা কেন

বাংলাদেশ সচিবালয় কেবল প্রশাসনিক ভবন নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু। এখান থেকেই গ্রহণ করা হয় নীতি ও সিদ্ধান্ত, যা সরাসরি দেশের মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। এসব সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব গণমাধ্যমের—রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই যার অন্যতম কাজ। অথচ সেই গণমাধ্যমকর্মীদেরই সচিবালয়ে প্রবেশাধিকার নিয়ে মাঝেমধ্যেই একধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে। সাংবাদিকদের কাজ সহজ করার বদলে ধাপে ধাপে জটিলতা বাড়ানো হচ্ছে।

নানা জটিলতার পর অন্তর্বর্তী সরকার নতুন নীতিমালা করে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) মাধ্যমে সাংবাদিকদের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দিয়েছে। কিন্তু সেই কার্ড কার্যত গুরুত্বহীন করে দেওয়ার একটি উদ্যোগ এখন সামনে এসেছে। প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকদের সচিবালয়ে ঢুকতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলাদা পাস (কার্ড) দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অথচ বহু বছর ধরেই পিআইডির এই কার্ডই সচিবালয়ে প্রবেশের স্বীকৃত ও কার্যকর মাধ্যম। এখন বলা হচ্ছে, অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড থাকলেও সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলাদা নিরাপত্তা পাস লাগবে।

পেশাদার সাংবাদিকদের মতে, সচিবালয়ে প্রবেশে যদি আলাদা পাসই শেষ কথা হয়, তাহলে পিআইডির প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডের যৌক্তিকতা কী? দুই জায়গা থেকে কার্ড নেওয়ার প্রয়োজন কেন?

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, তারা এখন ডিজিটাল কার্ড দেবে। এ নিয়ে সম্প্রতি পিআইডির সঙ্গেও মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়েছে।

তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যাঁরা সচিবালয়কেন্দ্রিক সাংবাদিকতা করেন। অনেকের প্রশ্ন, এটি কি কেবল নিরাপত্তাজনিত সিদ্ধান্ত, নাকি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সংকুচিত করার একটি সূক্ষ্ম কৌশল? পেশাদার সাংবাদিকদের মতে, সচিবালয়ে প্রবেশে যদি আলাদা পাসই শেষ কথা হয়, তাহলে পিআইডির প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডের যৌক্তিকতা কী? দুই জায়গা থেকে কার্ড নেওয়ার প্রয়োজন কেন?

৪ জানুয়ারি সচিবালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্রে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের কাছে এ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানায় বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম। তথ্য উপদেষ্টা সে দিন জানিয়েছিলেন, সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের দুজন প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

তবে তথ্য উপদেষ্টা গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, সাংবাদিকেরা আগের নিয়মেই অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দিয়ে সচিবালয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলাদা নিরাপত্তা পাস দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে তাঁর জানা নেই।

দীর্ঘদিনের জটিলতা

সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে টানাপোড়েন নতুন নয়। সাংবাদিকদের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেয় তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন পিআইডি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একপর্যায়ে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডধারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় সাড়ে সাত হাজার। পরে আওয়ামী লীগের সময়েই কোটা কমিয়ে বৈধ কার্ডের সংখ্যা নামিয়ে আনা হয় প্রায় ২ হাজার ৯০০-এ।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন দফায় ১৬৭ জন সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়। ঢালাও এই সিদ্ধান্তকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানায় সম্পাদক পরিষদ। নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ (নোয়াব) বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনও উদ্বেগ প্রকাশ করে।

সমালোচনার মুখে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সরকার জানায়, বাতিল হওয়া কার্ডগুলো প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনা করা হবে। কোনো সাংবাদিক সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে লিখিত আবেদন করার সুযোগ থাকবে। সেসব আবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলাদা পাসের উদ্যোগ সামনে আসে। এ জন্য আলাদা আবেদন ফরম তৈরি করা হয়, অনেক সাংবাদিক আবেদনও করেছেন। যদিও এখনো কার্ড বিতরণ শুরু হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, শিগগিরই তারা কার্ড দেওয়া শুরু করতে পারে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দিয়েও সচিবালয়ে ঢোকার অনুমতি বাতিল করা হয়। পরে অস্থায়ী পাসের কথা বলা হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার মুখে নির্ধারিত সংখ্যক সাংবাদিকদের তালিকা করা হয়। ওই তালিকায় ৬১৫ জন সাংবাদিক সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ পান; বাকিরা কার্ড থাকা সত্ত্বেও বাইরে থেকে যান।

এ অবস্থায় প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন নীতিমালা পুনর্মূল্যায়নে গত জানুয়ারিতে ১৭ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির সুপারিশে ফেব্রুয়ারিতে নতুন নীতিমালা জারি হয়। এতে কার্ডের সংখ্যা কিছু কমানো হয়, মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় তিন বছর। তবে সাড়ে চার মাসেও নীতিমালার বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর কার্ড দেওয়া শুরু হলেও সেটি দিয়েও সরাসরি সচিবালয়ে ঢোকা যাচ্ছিল না—ফটকে আলাদা তালিকার সঙ্গে মিলিয়েই ঢুকতে হয়েছে, যা অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। অবশ্য কিছুদিন ধরে তা নমনীয় করা হয়েছে।

এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলাদা পাসের উদ্যোগ সামনে আসে। এ জন্য আলাদা আবেদন ফরম তৈরি করা হয়, অনেক সাংবাদিক আবেদনও করেছেন। যদিও এখনো কার্ড বিতরণ শুরু হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, শিগগিরই তারা কার্ড দেওয়া শুরু করতে পারে।

সচিবালয়ে প্রবেশে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কার্ড দেওয়ার উদ্যোগকে ‘খুবই বাজে’ সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, একের পর এক ‘এক্সপেরিমেন্ট’ চলছে, কীভাবে সাংবাদিকদের গতিরোধ করা যায়। সচিবালয়ে প্রবেশে পিআইডির কার্ডই যথেষ্ট। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা কার্ডের প্রয়োজন নেই। তাই এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা উচিত।

এরপর কার্ড দেওয়া শুরু হলেও সেটি দিয়েও সরাসরি সচিবালয়ে ঢোকা যাচ্ছিল না—ফটকে আলাদা তালিকার সঙ্গে মিলিয়েই ঢুকতে হয়েছে, যা অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। অবশ্য কিছুদিন ধরে তা নমনীয় করা হয়েছে।

পুনর্বিবেচনা জরুরি

পিআইডির একটি সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সব অ্যাক্রিডিটেশনধারী সাংবাদিক এই পাস পাবেন না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সীমিতসংখ্যক সাংবাদিককে এই পাস দেওয়া হবে; অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড কেবল প্রাথমিক যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে।

অথচ প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেওয়া হয় একটি নির্ধারিত কমিটির যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে, যার মূল উদ্দেশ্যই হলো সাংবাদিকদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা। নতুন এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক জটিলতা বাড়াবে এবং পিআইডির অ্যাক্রিডিটেশন ব্যবস্থাকে কার্যত অর্থহীন করে তুলবে—এমন আশঙ্কাই সাংবাদিকদের।

তখন প্রশ্নটি আরও জোরালোভাবে উঠে আসবে—সরকার কি গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের সহযাত্রী হিসেবে দেখছে, নাকি একটি ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছে? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দেবে, রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক কোন পথে এগোচ্ছে।

সচিবালয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মাসউদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, পিআইডির প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড থাকার পরও সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কার্ডের প্রয়োজনীয়তা তিনি দেখেন না। বিষয়টি তাঁরা তথ্য উপদেষ্টাকে জানিয়েছেন এবং দ্রুত সমাধানের আশা করছেন। তবে পিআইডির প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডও যেন কেবল পেশাদার সাংবাদিকেরা পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

সচিবালয় জনগণের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সেখানে কী সিদ্ধান্ত হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে—তা জানানো সাংবাদিকদের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনের পথে অপ্রয়োজনীয় দেয়াল তোলা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড থাকা সত্ত্বেও আলাদা পাস বাধ্যতামূলক করা হলে প্রশ্নবিদ্ধ হবে শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতাই নয়, জনগণের তথ্য জানার অধিকারও। এই উদ্যোগ অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা না হলে সাংবাদিকদের অসন্তোষ আরও বাড়বে। তখন প্রশ্নটি আরও জোরালোভাবে উঠে আসবে—সরকার কি গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের সহযাত্রী হিসেবে দেখছে, নাকি একটি ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছে? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দেবে, রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক কোন পথে এগোচ্ছে।