
বিশ্ব এখন দ্রুত ও বহুমাত্রিক পরিবর্তনের যুগে প্রবেশ করেছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নজিরবিহীন গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশকে বদলে যাওয়া বিশ্বের এই জটিল পরিবর্তনগুলোর চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গড়ে তোলা জরুরি।
সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘গ্লোবাল ট্রেন্ডস ২০২৬’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এ মন্তব্য করেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিপস) ওই বৈঠকের আয়োজন করে।
আলোচনার সঞ্চালক ও বিপসের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, এখন বড় বা ছোট—কোনো রাষ্ট্রই বৈশ্বিক অস্থিরতার বাইরে নয়। এই প্রেক্ষাপটে গাজা থেকে ইউক্রেন পর্যন্ত ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, সুরক্ষাবাদ এবং আন্তরাষ্ট্রীয় সংঘাতের বিস্তার—এসবের কারণ বোঝা ও উত্তেজনা এড়াতে গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্ব এখন দ্রুত ও বহুমাত্রিক পরিবর্তনের এক যুগে প্রবেশ করেছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, বাণিজ্য সম্পর্ক, প্রযুক্তি, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি একই সঙ্গে এবং নজিরবিহীন গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। তাঁর মতে, একটি উদীয়মান মধ্যম শক্তি হিসেবে বাংলাদেশকে এই জটিল পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গড়ে তুলতে হবে।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই বিদ্যুতায়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং ডিকার্বনাইজেশনের চারপাশে আবর্তিত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, ডেটা সেন্টার, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য লিথিয়াম, তামা ও বিরল খনিজে প্রবেশাধিকার এখন অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবের একটি প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠছে।
গাজা থেকে ইউক্রেন পর্যন্ত ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, সুরক্ষাবাদ এবং আন্তরাষ্ট্রীয় সংঘাতের বিস্তার—এসবের কারণ বোঝা ও উত্তেজনা এড়াতে গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।আ ন ম মুনীরুজ্জামান, প্রেসিডেন্ট, বিপস
পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সহনশীলতা জোরদার করাই বাংলাদেশের জন্য জরুরি।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর টেররিজম রিসার্চের (বিসিটিআর) প্রধান ও বিপসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাফকাত মুনির বলেন, বিশ্ব একটি নতুন প্রযুক্তিগত শৃঙ্খলায় প্রবেশ করেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ক্রমেই প্রযুক্তি ব্লক, ডিজিটাল অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থা এবং ডেটা শাসনের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশসহ অনেক দেশের নিরাপত্তাভাবনা এখনো অতিমাত্রায় ঐতিহ্যগত, যা ২০২৬ সালের বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
শাফকাত মুনির বলেন, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সংঘাত নতুন করে তীব্রতা লাভ করেছে, পাশাপাশি ধূসর অঞ্চল ও হাইব্রিড যুদ্ধ, যা প্রচলিত যুদ্ধের বাইরে প্রধান প্রতিযোগিতার রূপ নিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু তথ্য তৈরি করছে না; বরং শাসন ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিতকারী সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করছে। এর ফলে ডিপফেক, ভুয়া তথ্য এবং এআই-সৃষ্ট বায়োমেট্রিকসের মাধ্যমে আস্থার ভাঙন ঘটছে এবং প্রচলিত পরিচয় যাচাইব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশসহ অনেক দেশের নিরাপত্তাভাবনা এখনো অতিমাত্রায় ঐতিহ্যগত, যা ২০২৬ সালের বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।শাফকাত মুনির, জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো, বিপস
শাফকাত মুনির এআই-সক্ষম সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেন, যার মধ্যে ড্রোনযুদ্ধ, স্বয়ংক্রিয় উগ্রবাদ ছড়ানো, ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক অর্থায়ন এবং থ্রি–ডি প্রিন্টেড অস্ত্র অন্তর্ভুক্ত। জলবায়ু পরিবর্তনকে তিনি উৎপাদনশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইমা আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংকীর্ণ ও কঠোর জাতীয় স্বার্থ অনুসরণের প্রবণতা স্পষ্টভাবে বেড়েছে। বড় শক্তিগুলো ক্রমেই একতরফা ও চাপমূলক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। এটি বাস্তববাদী ক্ষমতার রাজনীতির প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে বৈশ্বিক শাসনকাঠামো খণ্ডিত হচ্ছে এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমছে।