
গ্রেপ্তার হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। বাংলাদেশে এর আগে এইচ এম এরশাদ ছাড়া এত উঁচু পদের কোনো সেনা কর্মকর্তার গ্রেপ্তার হওয়ার নজির খুব একটা বেশি নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সিভিল-মিলিটারি সংযোগ ও সংঘাতের বিষয়টি খুব স্পর্শকাতর। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এটিকে জন-আলোচনার বাইরে রাখা হয়। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে গুম-খুন নিয়ে যে চাঞ্চল্যকর মামলা হয়েছে, সেখানে বেশ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার কাজ চলছে। তখন একটি বিষয় উঠে আসে, সেনা কর্মকর্তাদের বিচার সেনা আইনে হবে, নাকি সাধারণ আইনে হবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক বাহিনীর বিশেষ অবস্থানকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মাসুদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে আপাতত যেসব মামলা আছে, সেগুলো ফৌজদারি অপরাধসম্পর্কিত। তিনি এখন আর সেনাবাহিনীতে নেই। বাংলায় একটা কথা আছে—কান টানলে মাথা আসে। তাঁর গ্রেপ্তার নিয়ে এখন গুঞ্জন, এক-এগারোর অভ্যুত্থান ও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় তাঁর ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সরকার একটি অবস্থানে যেতে পারে।
বাংলাদেশে ‘ডাকাতদের’ যে কয়টি ব্যবসা আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘আদম ব্যবসা’। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা একটি সুন্দর কর্মজীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে নিরীহ তরুণদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে বিদেশে ছেড়ে দেয়। বিদেশে তারা কী অবস্থায় থাকে, তার বিবরণ গণমাধ্যমে প্রায়ই উঠে আসে। তো এটাই যদি অভিযোগ হয়ে থাকে, তাহলে তো ‘আদম পাচার’ সিন্ডিকেটের সব কটি রুই-কাতলাকে ধরতে হয়। সেটি হচ্ছে না। তাহলে শুধু মাসুদ কেন? এখানেই প্রশ্নটা জাগে, আজ হোক কাল হোক তাঁকে নিয়ে এক-এগারোর বিষয়গুলো উঠে আসতে পারে।
উল্লেখ্য, এক-এগারোর সরকারের সময় গুরুতর অপরাধসম্পর্কিত তদন্ত কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছিলেন মাসুদ উদ্দিন। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ অনেককে গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন ও হয়রানি, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে মোটা টাকা আদায় ইত্যাদি নিয়ে অনেক কথাবার্তা আছে। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের একজন ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। তিনি এখন প্রধানমন্ত্রী। বিষয়টি তিনি কোন মাত্রায় নিয়ে যাবেন, সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
বিএনপি এখন ক্ষমতায়। দলটি নিজেকে এক-এগারোর ভিকটিম মনে করে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে, বিশেষ করে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী (পরে রাষ্ট্রপতি) প্রণব মুখার্জির স্মৃতিকথায় ওই সময় ভারতের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়। বিএনপিকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় রেখে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন।
এক-এগারোর অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তারা কেউ দেশে থাকতে পারেননি। কিন্তু মাসুদ উদ্দিনকে হাসিনা সরকার পুরস্কৃত করে। এক-এগারোর সরকারের আমলেই সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তিনি হেরে যান। তাঁকে আর সেনাবাহিনীতে রাখা হয়নি। ২০০৮ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। শেখ হাসিনা সরকার তাঁকে সেখানে একাধিক মেয়াদে রেখে দেয়। দেশে ফিরে তিনি নানান ব্যবসা শুরু করেন। শেখ হাসিনা তাঁকে জাতীয় পার্টির কোটা থেকে ফেনীর একটি আসনে সংসদ সদস্য করেন। এখানে অনুমান করতে কষ্ট হয় না, যেখানে এক-এগারোর অভ্যুত্থানের নেতারা কেউ দেশে থাকতে পারলেন না, সেখানে মাসুদ উদ্দিন কোন জাদুর কাঠির পরশে প্রবল প্রতাপ নিয়ে দেশে থাকলেন এবং দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় জায়গা করে নিলেন। এটাকে বলা যেতে পারে তাঁকে দেওয়া শেখ হাসিনার প্রতিদান। কেউ কেউ এটাকে এভাবে দেখছেন, এক-এগারোর একটি পটভূমি তৈরি করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার যে ‘গ্র্যান্ড ডিজাইন’, সেখানে মাসুদ উদ্দিন তাঁর ‘অবদানের’ পুরস্কার পেয়েছেন।
দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা তছনছ করে দিয়ে আজীবন ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করেছিলেন। যেহেতু এক-এগারো তাঁর জন্য একটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল, স্বাভাবিক কারণেই এই অভ্যুত্থানকে একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়। আসলেই কি এটি ষড়যন্ত্র ছিল?
এ দেশের রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপ নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে এর শুরু। তারপর কয়েক বছর বিরতি দিয়ে আবার সেনা-অভ্যুত্থান হয় ১৯৮২ সালে। শেষবার হয় ২০০৭ সালে, যেটি এক-এগারো নামে পরিচিত। পঁচাত্তরের অভ্যুত্থানকারীরা মুজিব হত্যার কারণে সাজা ভোগ করেছেন। ১৯৮২ সালের অভ্যুত্থানের নেতা এইচ এম এরশাদ দুর্নীতির মামলায় সাজা পেয়েছেন। ’৭৫ ও ’৮২ সালের অভ্যুত্থানের কোনো তদন্ত বা বিচার হয়নি। কেন হয়নি, তা জানা যায় না। এক-এগারোকে হাসিনা বলেছিলেন তাঁদের আন্দোলনের ফসল। সুতরাং তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন ওঠেনি। তবে হাসিনা সংক্ষুব্ধ ছিলেন তাঁকে গ্রেপ্তার করায়।
আমাদের দেশে সেনা অভ্যুত্থান ও গণ-অভ্যুত্থান—দুটিরই উদাহরণ আছে। সব শেষে হয়েছে ২০২৪ সালে। কখন একটি অভ্যুত্থান হয়? এটা তো এমন নয় যে কিছু লোক একত্রে বসে একটি সিদ্ধান্ত নেয়—এই সরকারকে আমাদের ভালো লাগছে না; চলো এটিকে ফেলে দিই। অভ্যুত্থানের শর্ত তৈরি হয় ধীরে ধীরে। অভ্যুত্থানকারীরা তখনই ‘অ্যাকশনে’ যান বা অভ্যুত্থান তখনই হয়, যখন দেখা যায়, সরকারের জনপ্রিয়তা তলানিতে, দেশে একটি অরাজক অবস্থা চলছে এবং এ সময় সরকার পরিবর্তন হলে সাধারণ মানুষ ও রাজনীতিবিদদের একটি বড় অংশের সমর্থন পাওয়া যাবে। ১৯৭৫, ১৯৮২, ২০০৭ ও ২০২৪ সালে এমনটি দেখা গেছে। ২০২৪ সালে অবশ্য সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল ব্যতিক্রমী।
আমাদের দেশে সেনাবাহিনী হচ্ছে সবচেয়ে সংহত একটি পেশাজীবী গ্রুপ। এদের মধ্যে যে শৃঙ্খলা আছে, যে ‘কমান্ড স্ট্রাকচার’ ক্রিয়াশীল, তা অন্যান্য পেশায় দেখা যায় না। এ ছাড়া জনজীবন থেকে দূরে থাকার কারণে তাদের অসৎ হওয়ার বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ কম। ফলে তাদের মধ্যে পেশাদারত্ব বেশি। মানুষ তাদের সম্মান ও সমীহ করে; কিন্তু এটিও ঠিক, যখন তারা মনে করে দেশটা ঠিকঠাক চলছে না, তখন তারা নিজেদের ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখতে চায়। মানুষও এটিকে স্বাগত জানায়। এ রকম সময় অনেককে বলতে শুনেছি, এখনো মিলিটারি নামছে না কেন?
আমরা দেখেছি, এ ধরনের সংকটে সেনাবাহিনী পদক্ষেপ নেওয়ার বা হস্তক্ষেপ করার সুযোগ ছাড়ে না। তারা অনেক সময় ‘বিপথগামী’ রাজনীতিবিদদের শায়েস্তা করাকে দায়িত্ব মনে করে। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে এ রকম অভ্যুত্থানের শর্ত রাজনীতিবিদেরাই তৈরি করে দেন। যখন অভ্যুত্থান হয়, তখন দেখা যায়, ক্ষমতাচ্যুত ব্যক্তিরা নিজেদের ভিকটিম মনে করে এর সমালোচনা করেন এবং ক্ষমতার বাইরে যাঁরা, তাঁরা এটিকে স্বাগত জানিয়ে সুবিধা নেন।
সামরিক হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক নয়। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ এখন কমে গেলেও কোনো কোনো দেশে ঘটছে। এসব দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল, শাসকশ্রেণি দুর্নীতিগ্রস্ত। এসব দেশে প্রায়ই দেখা যায় প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থার মোড়কে পারিবারিক বা দলীয় সিন্ডিকেটের শাসন। যেসব দেশে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা জারি আছে, মানুষ নির্বাচনব্যবস্থায় অভ্যস্ত, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাজনৈতিক ঐকমত্য আছে, মতপ্রকাশ ও সংগঠন করার স্বাধীনতা আছে, সাধারণ মানুষ কম খরচ ও সস্তায় ন্যায়বিচার পায়, সেসব দেশে সরাসরি সেনা হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই বললেই চলে।
রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপকে গণতন্ত্রের সংকট হিসেবেই দেখা যায়। গণতন্ত্র যত দিন না দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে, তত দিন সেনা হস্তক্ষেপের সুযোগ বা ঝুঁকি থেকেই যাবে। এ জন্য প্রাথমিক শর্ত হলো দায়িত্বশীল রাজনীতি এবং সেনা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য। আশা করি, দেরিতে হলেও আমরা এ শিক্ষাটা নেব।