তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে সরবরাহ আরও কমে গেছে। ফলে গ্যাসের সংকট এখনই কাটছে না। এই সংকট আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এলএনজি রূপান্তর করে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের ভাসমান টার্মিনালটি গতকাল শনিবারও চালু করা যায়নি।
রাজধানীর কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, কাফরুল, কাজীপাড়া, পশ্চিম তেজতুরী বাজার, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। কোথাও নিভু নিভু আবার কোথাও একেবারেই চুলা জ্বলে না।
দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি টার্মিনাল পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি ও আরেকটি বেসরকারি কোম্পানি সামিট। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার আগুন লেগে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর দেশে গ্যাসের সংকট বেড়ে যায়।
চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি রেখেই দেড় দশক ধরে চলছে গ্যাস খাত। এর মধ্যে কয়েক বছর ধরে দেশি গ্যাসের উৎপাদনও টানা কমছে। তাই নিয়মিত বাড়ছে এলএনজির ওপর নির্ভরতা।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, এক্সিলারেটের টার্মিনালে দুটি বয়লার আছে। আগুনে একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অক্ষত বয়লারটি চালু করা গেলে আরও ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাবে। গত বৃহস্পতিবার থেকে টার্মিনালে কাজ শুরু করেছে যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল।
চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি রেখেই দেড় দশক ধরে চলছে গ্যাস খাত। এর মধ্যে কয়েক বছর ধরে দেশি গ্যাসের উৎপাদনও টানা কমছে। তাই নিয়মিত বাড়ছে এলএনজির ওপর নির্ভরতা। প্রতিদিন সরবরাহ করা মোট গ্যাসের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই আসে এলএনজি থেকে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কারিগরি দল কাজ করছে, এখনো চালু করার অবস্থায় আনা যায়নি। আরও সময় লাগতে পারে। তবে নির্দিষ্ট করে সময় বলা যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বেশি গ্যাস ব্যবহৃত হয় বিদ্যুৎ খাতে। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো। এতে বিদ্যুৎ ঘাটতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরপর সবচেয়ে বেশি গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পকারখানা। বিদ্যুৎ-শিল্প ছাড়াও রান্নার কাজে ও পরিবহনের জ্বালানি হিসেবে গ্যাস (সিএনজি) ব্যবহার হয়। কিন্তু কয়েক দিন ধরে রান্নার চুলা জ্বালাতে পারছেন না অনেকেই। কেউ কেউ বিদ্যুৎচালিত চুলা কিনছেন। আর নিম্ন আয়ের মানুষ মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নিতে গাড়ির সারি দীর্ঘ হচ্ছে।
কারিগরি দল কাজ করছে, এখনো চালু করার অবস্থায় আনা যায়নি। আরও সময় লাগতে পারে। তবে নির্দিষ্ট করে সময় বলা যাচ্ছে না।পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম
পেট্রোবাংলা বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। যদিও গত বছর থেকে দিনে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। অগ্নিদুর্ঘটনায় এলএনজির একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে।
গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে গতকাল বিবৃতি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। এতে বলা হয়, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি মেরামত করে চালু করার জন্য দেশি ও বিদেশি কারিগরি দল নিরলসভাবে কাজ করছে।
রাজধানী ও আশপাশের জেলায় গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি বলেছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন এলাকার সব শ্রেণির গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করবে।
মোহাম্মদপুরের গ্রাহকেরা গত শুক্রবার মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আমরা মোহাম্মদপুরবাসী নামের গ্রুপে নিয়মিত ক্ষোভ প্রকাশ করছেন গ্রাহকেরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস খাত দীর্ঘদিন ধরে সুতার ওপর ঝুলছিল। একটি টার্মিনাল বন্ধের পর বড়ভাবে টের পাওয়া যাচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থার কথা অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছিল। স্থলভাগে আরেকটি টার্মিনাল থাকলে হয়তো এখন সংকট এড়ানো যেত।