সংসদ অধিবেশন
সংসদ অধিবেশন

সংসদে বিল পাস

গঠিত হচ্ছে এসআরবি, র‍্যাবের প্রায় সবই থাকছে আইনে

বিরোধী দলের আপত্তির মুখে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিল পাস হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার র‍্যাব বিলুপ্ত করে বিলটি সংসদে পাস হয়।

বিল পাসের আলোচনায় বিরোধী দল বলেছে, এই আইনের মধ্য দিয়ে শুধু র‍্যাবের ‘সাইনবোর্ড’ বদল হচ্ছে। এটি নতুন বোতলে পুরোনো মদ। র‌্যাব সামনে আসছে এসআরবির মোড়কে।

অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই আইন পাসের মধ্য দিয়ে র‍্যাব বিলুপ্ত হচ্ছে। র‍্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনো সংস্পর্শ নেই।

এসআরবি বিলে বলা হয়েছে—র‌্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে রাখা অর্থ, দায়, চুক্তি, স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্রসহ সব দলিল এসআরবির কাছে স্থানান্তর হবে।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আগের কাঠামো ঠিক রেখে যেভাবে বিল পাস হলো, তাতে কাগজে-কলমেই শুধু র‍্যাবের নাম বিলুপ্ত হবে।

২০০৩ সালে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স’ সংশোধন করে র‌্যাব গঠনের আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছিল। নানা কর্মকাণ্ডে বাহিনীটি সমালোচিত হয়। গতকাল সংসদে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স’ রহিত করে নতুন এপিবিএন আইন করতে আরেকটি বিলও পাস হয়েছে।

র‍্যাবের অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে জাতিসংঘ, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র‍্যাব এবং বাহিনীটির তৎকালীন ও সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব বিলুপ্তির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায় বর্তমান সরকার। তবে র‍্যাব বিলুপ্ত করে একই কাঠামোতে এসআরবি গঠনে মন্ত্রিসভায় আইনের খসড়া পাস হওয়ার পর থেকে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।

গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার জন্য সংসদে তোলেন। বিলটি নিয়ে জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়ে আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দলের সদস্যরা। বিরোধী দলের আপত্তিগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হওয়ার পর বিলটি সংসদে পাস হয়।

জনবল থেকে দায়চুক্তি, সবই স্থানান্তর

এসআরবি বিলে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর আওতাধীন এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। সরকারের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে পুলিশ, শৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা, আর্মড পারসোনেল বা কর্মচারী পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এ ইউনিট গঠিত হবে। ইউনিটের কর্মকর্তা বা আর্মড পারসোনেল বা কর্মচারীদের পদবিন্যাস, নিয়োগ পদ্ধতি ও চাকরির শর্তাবলি বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। ইউনিটের জন্য বিধি দ্বারা নির্ধারিত একটি পতাকা, প্রতীক ও সুনির্দিষ্ট পোশাক থাকবে। এসআরবির মহাপরিচালক হবেন পুলিশে কর্মরত একজন অন্যূন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক।

র‍্যাবের কাঠামো নিয়ে সমালোচনার অন্যতম প্রধান জায়গা ছিল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ব্যবহার। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ও মানবাধিকারকর্মীরা নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হলে তা শুধু প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে এসআরবিতে পুলিশের বাইরে অন্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রেষণ বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ‘শৃঙ্খলা বাহিনী’র সংজ্ঞায় সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের উল্লেখ থাকায় সশস্ত্র বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমান) সদস্যদেরও এসআরবিতে নেওয়ার সুযোগ থাকছে।

নতুন আইনে বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান ২০০৫ সালের বিধিমালায় র‌্যাবসংক্রান্ত বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা বা আদালতের কার্যধারা বহাল থাকবে।

এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রাখা হয়েছে।

বিরোধী দলের আপত্তি

বিলের আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, এই বাহিনীর বিলুপ্তি ছিল সবার দাবি। বেগম খালেদা জিয়াও বারবার এ বিষয়ে কথা বলেছেন। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো কথা বলেছে। এটা বিলুপ্ত করে আরেকটা বাহিনী গঠনের দাবি কারোরই ছিল না। শুধুই বিলুপ্তির দাবি ছিল।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি যে সরকারি তরফ থেকে ঠিক একই ধরনের আরেকটা বাহিনী বিল্ড আপ করার দাবি নিয়ে আসা শুধু হয়নি, হুবহু বাহিনীটাকে জায়গায় রেখে সবকিছু জায়গায় রেখে, একটা প্রস্তাবনা নিয়ে আসা হয়েছে।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই আইনটা কোনো অবস্থাতেই পাস করা উচিত নয়। আইনটা ফিরিয়ে নেওয়া দরকার। তিনি আশা করেন, জনগণের মনোভাবের প্রতি এবং বাস্তব অভিব্যক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে সরকার এ বিল প্রত্যাহার করবে। পরবর্তী সময়ে চিন্তাভাবনা করে আনতে হলে তখন আনবে।

বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, র‍্যাব নিয়ে তাঁদের আতঙ্ক আছে। এই বাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, গুমে একটা নতুন মাত্রা যোগ করছে। এ ধরনের একটা বিল তড়িঘড়ি করে মাত্র চার কর্মদিবসের মধ্যে পাস করার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের ঘটনা তুলে ধরে বিরোধী দলের সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, সে ঘটনার পরে র‍্যাবকে ‘কিলিং স্কোয়াড’ আখ্যা দিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সে সময় তিনি র‍্যাবের বিলুপ্তির দাবি জানান। ২০১৯ সালে তিনি র‍্যাবকে ‘ক্যানসার’ আখ্যায়িত করেছিলেন।

নাজিবুর রহমান বলেন, বিলের ২৭ ধারায় বলা হয়েছে, র‍্যাবের জনবল, কার্যালয়, ক্ষমতা, নথিপত্র, সম্পদ, চুক্তি, দায়দায়িত্ব সরাসরি এসআরবি নামের নতুন বাহিনীর কাছে চলে যাবে। অর্থাৎ শুধু সাইনবোর্ডটাই পরিবর্তন হচ্ছে, নতুন বোতলে পুরোনো মদ। র‍্যাবের নাম ছাড়া আর কোনো কিছু পরিবর্তন হচ্ছে না। এতে গুমের অপরাধসহ অনেক অপরাধের মামলা এবং তদন্ত ত্রুটির মুখে পড়বে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব

বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল র‍্যাব বিলুপ্ত করা, সেটা করা হচ্ছে। এই বিল যতই বিলম্বিত হবে, র‍্যাবের অস্তিত্ব ঠিকই রয়ে যাবে, র‍্যাবই রয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিলটি সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। এর আগে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দীর্ঘদিন ছিল। বিভিন্ন মতামত এসেছে। এই আইন পাসের মধ্য দিয়ে র‍্যাব বিলুপ্ত করা হচ্ছে।

র‍্যাবের সম্পদ এসআরবিতে হস্তান্তরের কারণ ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এত অস্ত্রশস্ত্র, এত ইকুইপমেন্ট (সরঞ্জাম), এত ইন্টেলিজেন্স ইকুইপমেন্ট, এত সম্পদ, এগুলো কোথায় যাবে? কোথাও না কোথাও তো যাবে। নতুন বাহিনীর কাছে গেলে আর এসব কেনাকাটার প্রয়োজন হবে না। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করতে হবে।

বহু বাহিনীর সমন্বয়ে বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের অতীত অভিজ্ঞতা ভালো উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সেনা, নৌ, বিমানসহ বিভিন্ন বাহিনীর সংমিশ্রণে আরেকটি বাহিনী গঠনের বিরোধিতা করেছিলাম। প্রয়োজন হলে পুলিশের মধ্য থেকেই বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা যেত। তাদের আধুনিক অস্ত্র ও উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে জনসেবায় নিয়োজিত করা যেত।’

নূর খান বলেন, সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও দায়িত্ব দেশের প্রতিরক্ষাকে কেন্দ্র করে। দৈনন্দিন অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ পুলিশেরই করা উচিত। সে জন্য পুলিশই যথেষ্ট। তাঁর প্রশ্ন, এত আপত্তির পরও পুরোনো কাঠামো রেখে এই আইন পাস করায় প্রশ্ন উঠছে, সরকার কি দেশ পরিচালনায় ক্রমেই বাহিনীগুলোর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?

এপিবিএন পাবে তদন্তের ক্ষমতা

এসআরবি বিল পাসের পর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স রহিত করে নতুন আইন করতে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল-২০২৬’ সংসদে তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।

বিলে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর অধীনে এপিবিএন গঠিত ও পরিচালিত হবে। এই ইউনিটে স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, পার্বত্য ব্যাটালিয়ন, বিমানবন্দর ব্যাটালিয়ন ও অন্য কোনো ব্যাটালিয়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

প্রস্তাবিত আইনে এপিবিএনকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি ও বিদ্যমান অন্যান্য আইন প্রতিপালন সাপেক্ষে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দকরণ ও গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

বিলে বলা হয়েছে, এই ইউনিটের কোনো সদস্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সংবাদপত্রে কোনো প্রকার তথ্য বা অন্য প্রকার দলিল প্রকাশ করতে পারবেন না বা প্রকাশে সহযোগিতা করতে পারবেন না বা প্রকাশ করার কারণ হবেন না।