
আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (আইএমও) এবার একটি রৌপ্য ও পাঁচটি ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। ৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (আইএমও) নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। ছয়জন প্রতিযোগীর সবাই পদক পেয়েছে। এবারের আসরে বাংলাদেশ দলীয়ভাবে মোট ১২১ নম্বর অর্জন করেছে, যা এখন পর্যন্ত এ আয়োজনে দেশের সর্বোচ্চ দলীয় নম্বর। বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭টি দেশের মধ্যে ৩৯তম।
প্রতিটি দেশ থেকে প্রাক্-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ ছয়জন শিক্ষার্থী এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে। এবার ১১৭টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ৬৬৬ জন শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (আইএমও) অংশগ্রহণ করেছে।
খাতা মূল্যায়নের পর আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের নিয়ম অনুযায়ী চূড়ান্ত জুরি মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। চীনের স্থানীয় সময় আজ বেলা আড়াইটায় এই জুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে অংশগ্রহণকারী সব দেশের দলনেতা ও উপদলনেতা অংশ নেয়। এই সভায় স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জপদকের কাট-অফ নম্বর চূড়ান্ত করা হয়। এবার মোট ৪২ নম্বরের মধ্যে এ বছর যারা ২৯ নম্বরসহ এর থেকে ওপরে পেয়েছে, তাদের স্বর্ণপদক, ২৩ নম্বরসহ এর থেকে ওপরে রৌপ্যপদক এবং ১৬ নম্বরসহ এর থেকে ওপরে ব্রোঞ্জপদক দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী এ বছর ৫৫ জন শিক্ষার্থী স্বর্ণপদক, ১০৫ জন রৌপ্যপদক ও ১৮৯ জন ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে।
আগামীকাল সোমবার বিকেল চারটায় চীনের সাংহাই হাইস্কুলের গ্র্যান্ড অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে ৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড (আইএমও) ২০২৬-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অংশ নেওয়া বিজয়ীদের আয়োজক ও আমন্ত্রিত অতিথিরা পদক পরিয়ে দেবেন।
চট্টগ্রাম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. রায়হান সিদ্দিকী ২৩ নম্বর পেয়ে রৌপ্যপদক, ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহসিন খান ২২ নম্বর পেয়ে ব্রোঞ্জপদক, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের এসএসসি পরীক্ষার্থী এম জামিউল হোসেন ২১ নম্বর পেয়ে ব্রোঞ্জপদক, ঢাকা ইম্পিরিয়াল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জাওয়াদ হামীম চৌধুরী ১৯ নম্বর পেয়ে ব্রোঞ্জপদক, ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মনামী জামান ১৯ নম্বর পেয়ে ব্রোঞ্জপদক এবং চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মারজুক রহমান ১৭ নম্বর পেয়ে ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে।
বাংলাদেশ দল এবার ২২তম বারের মতো আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছে। এবারসহ এ আয়োজনে এখন পর্যন্ত একটি স্বর্ণপদক, আটটি রৌপ্যপদক, ৪৫টি ব্রোঞ্জপদক ও ৪৭টি সম্মানজনক স্বীকৃতি লাভ করেছে বাংলাদেশ।
এবার ছিল আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের ৬৭তম আসর। আজ রোববার আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের (আইএমও) অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। আয়োজনে প্রথম স্থান অর্জন করেছে সাতজন শিক্ষার্থী। এরা হলো চীনের লেয়ান দেং, চে লিউ, বোলুন ঝাং, দক্ষিণ কোরিয়ার হিয়নজুন লি, যুক্তরাজ্যের অ্যালেক্স চুই, যুক্তরাষ্ট্রের লিয়াম রেডি ও আলেকজান্ডার ওয়াং। এই সাতজন ৪২ নম্বরের মধ্যে ৪২ নম্বরই পেয়েছে।
অলিম্পিয়াডে চীনের শিক্ষার্থীরা দলীয়ভাবে ২৩২ নম্বর পেয়ে প্রথম, যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা ২০৭ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয়, রাশিয়ার শিক্ষার্থীরা দলীয়ভাবে ১৯৬ নম্বর পেয়ে তৃতীয় হয়েছে। এ ছাড়া ভারতের শিক্ষার্থীরা ১৬৬ নম্বর পেয়ে সপ্তম, ব্রাজিলের শিক্ষার্থীরা ১৫৫ নম্বর পেয়ে ১১তম, আর্জেন্টিনার শিক্ষার্থীরা ৯৪ নম্বর পেয়ে ৫৭তম, শ্রীলঙ্কার শিক্ষার্থীরা ৭২ নম্বর পেয়ে ৭৭তম, পাকিস্তানের শিক্ষার্থীরা ৭০ নম্বর পেয়ে ৭৯তম, নেপালের শিক্ষার্থীরা ৫৭ নম্বর পেয়ে ৮৪তম, মিয়ানমারের শিক্ষার্থীরা ৪৩ নম্বর পেয়ে ৯১তম, ভুটানের শিক্ষার্থীরা ৮ নম্বর পেয়ে ১১৫তম স্থান অর্জন করেছে।
রৌপ্যপদক জয়ী চট্টগ্রাম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. রায়হান সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি খুবই আনন্দিত ও খুশি। এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছি। সারা বছর নিয়মিত অনুশীলন করেছি। সেই পরিশ্রমের ফলই আজকের এই অর্জন। আমার পরিবারের সদস্যদের এবং বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে জড়িত সবার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।’
বাংলাদেশ গণিত দলের দলনেতা মাহবুবুল আলম মজুমদার বলেন, ‘এবার আমাদের শিক্ষার্থীরা অসাধারণ পারফরম্যান্স করেছে। দলের ছয় সদস্যই পদক অর্জন করেছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন। তারা কঠিন অনেক প্রশ্ন সফলভাবে সমাধান করতে পেরেছে। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, আগের সব বছরের তুলনায় এবারই বাংলাদেশ দল সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর এবং সর্বোচ্চসংখ্যক পদক অর্জন করেছে। এই সাফল্য ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’
বাংলাদেশ গণিত দলের উপদলনেতা অপূর্ব কুমার বলেন, ‘আমরা এবার লম্বা সময় চীনে কাটিয়েছি। সামার ক্যাম্পে ছেলেমেয়েরা অনেক কিছু শিখেছে এবং সেখানের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে প্রয়োগ করতে পেরেছে। আমরা আশানুরূপ ফল করেছি। এটা বাংলাদেশের সবার জন্য গর্বের।’
১৪ জুলাই উদ্বোধনী পর্বের মাধ্যমে শুরু হয় ৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড। ১৫ ও ১৬ জুলাই দুই দিন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীদের দুই দিনে জ্যামিতি, কম্বিনেটরিক্স, নাম্বার থিওরি ও বীজগণিতের মোট ৬টি সমস্যার সমাধান করতে দেওয়া হয়। প্রতিদিন তিনটি সমাধানের জন্য সাড়ে চার ঘণ্টা করে মোট ৯ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়।
২০০১ সালে প্রথম আলোর বিজ্ঞান প্রজন্ম পাতায় শুরু হওয়া ‘নিউরনে অনুরণন’ এখন আমাদের সবার প্রাণের গণিত অলিম্পিয়াড। ২০০৪ সালে আমরা আইএমওর সদস্যপদ পেয়েছি আর ২০০৫ সাল থেকে অংশ নিচ্ছি আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে। ১৯৫৯ সালে রোমানিয়ায় প্রথম শুরু হয়েছিল বিশ্বের প্রাক্-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ুয়াদের মেধার লড়াই আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড।
চলতি বছরের ৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য বাংলাদেশ দল নির্বাচন করা হয় দেশব্যাপী কয়েক ধাপের বাছাইয়ের মাধ্যমে। এ প্রক্রিয়ায় অনলাইনে ১৯ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫১ হাজার ৫৩২ শিক্ষার্থী নিবন্ধন করে। বিভিন্ন ধাপের বাছাই, আঞ্চলিক ও জাতীয় গণিত উৎসব এবং জাতীয় ও বর্ধিত গণিত ক্যাম্প শেষে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি ছয় সদস্যের চূড়ান্ত দল গঠন করে।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দেশব্যাপী গণিত অলিম্পিয়াড আয়োজন করা হয়। সেখান থেকে ৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য ছয় সদস্যের বাংলাদেশ গণিত দল নির্বাচন করা হয়। দল নির্বাচন ও এর আনুষঙ্গিক আয়োজন করেছে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।