একসময় ইন্টারনেট ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান। বর্তমানে ইন্টারনেট মানেই যেন ‘ভিডিও কনটেন্ট’
একসময় ইন্টারনেট ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান। বর্তমানে ইন্টারনেট মানেই যেন ‘ভিডিও কনটেন্ট’

মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৯৩ ভাগই দেখেন ভিডিও কনটেন্ট

দেশে গত কয়েক বছরে ইন্টারনেট ডেটা ব্যবহারে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন গবেষণার তথ্যমতে, দুই থেকে তিন বছরের ব্যবধানে দেশে ইন্টারনেট ডেটার ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৬ গুণ পর্যন্ত।

একসময় ইন্টারনেট ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান। বর্তমানে ইন্টারনেট মানেই যেন ‘ভিডিও কনটেন্ট’। অনলাইন শিক্ষা, বিনোদন, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, লাইভ খেলা এবং সামাজিক মাধ্যমের রিলস বা ছোট ভিডিও দেখা এখন দেশের কোটি মানুষের প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

ডেটা ট্রাফিক ও ভিডিওর প্রাধান্য

ইন্টারনেট ডেটার এই হঠাৎ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো ভিডিও কনটেন্ট। বৈশ্বিক মোবাইল শিল্পের সংগঠন ‘জিএসএমএ’র জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৯৩ শতাংশই ভিডিও কল করা ও অনলাইন ভিডিও দেখার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।

টেলিকম খাতের বৈশ্বিক সূচক এরিকসন মবিলিটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মোবাইল ট্রাফিকের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে ভিডিও স্ট্রিমিং। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে বিশ্বজুড়ে মোবাইল নেটওয়ার্কে প্রতি মাসে প্রায় ২১০ এক্সাবাইট বা প্রায় ২১ হাজার কোটি গিগাবাইট ডেটা আদান-প্রদান হচ্ছে। বাংলাদেশও এই ধারার বাইরে নয়।

দৈনিক ডেটা প্রবাহের বৈচিত্র্য

ভিডিও দেখার এই অভ্যাস যে কতটা ব্যাপক, তা বোঝা যায় দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কগুলোর অভ্যন্তরীণ ডেটা প্রবাহ বিশ্লেষণ করলে।

দেশের অন্যতম মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানমতে, তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই গ্রাহকরা প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৫২ হাজার ঘণ্টা বা ২ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার মিনিট ভিডিও কনটেন্ট উপভোগ করেন। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় দেশে কেবল গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই প্রায় ৪০ বছরের সমতুল্য দীর্ঘ ভিডিও কনটেন্ট স্ট্রিমিং হয়। যার মধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা দেখার মতো বিশাল ডেটা জড়িত। তবে এই চার দশকের সমান কনটেন্ট কেবল চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ নয়; এর বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ফেসবুক রিলস, ইউটিউব শর্টস, লার্নিং প্ল্যাটফর্মের ক্লাস ও ওটিটি কনটেন্টের ছোট ছোট পর্ব।

এসব পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভিডিও এখন আর কোনো শখ নয়, বরং মূলধারার যোগাযোগের অন্যতম শক্তিশালী তথ্য ও বিনোদনের মাধ্যম।

হাতের মুঠোয় ডিভাইস, বাড়ছে ডেটা ব্যবহার

ভিডিওর এই বিস্তারের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হলো স্মার্টফোনের প্রসার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশের ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবারে এখন অন্তত একটি স্মার্টফোন রয়েছে। তবে যন্ত্র পৌঁছালেও নিয়মিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা ফারাক রয়ে গেছে। পারিবারিক পর্যায়ে সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ (শহরে ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং গ্রামে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ)। ব্যক্তিপর্যায়ে নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারের হার প্রায় ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ। জিএসএমএর সমীক্ষা অনুযায়ী, ডিজিটাল দক্ষতার অভাব, ডিভাইসের দাম এবং ডেটার মূল্যের কারণে অনেক মানুষ এখনো ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে রয়েছেন।

জিএসএমএর ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগে মাসে গড়ে প্রায় ৫ জিবি ডেটা ব্যবহার হয়। দেশের মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়লেও বৈশ্বিক গড় ব্যবহারের তুলনায় এই পরিমাণ এখনো কম।

প্রযুক্তির সংযোগ ও ইন্টারনেটের মূল অবকাঠামো

বিপুল পরিমাণ ভিডিও ডেটা নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করা একটি বিশাল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে যেখানে বাফারিং ছাড়া দ্রুত স্ট্রিমিং শুরু করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নেটওয়ার্কের লেটেন্সি (সংযোগের গতি) সর্বনিম্ন মাত্রায় ধরে রাখার তাগিদ থাকে। বিটিআরসির সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত দেশে মোট মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা ১৮ কোটি ৭ লাখ। এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট সাবস্ক্রিপশনের সংখ্যা ১২ কোটি ৮ লাখের বেশি, যা দেশের ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের পরিধি বৃদ্ধিরই প্রমাণ দেয়।

এই বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও নিরবচ্ছিন্ন স্ট্রিমিং নিশ্চিত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটের মূল অবকাঠামো কাজ করে।

স্পেকট্রাম ও ডিজিটাল হাইওয়ে: নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে ২ হাজার ৬০০ মেগাহার্টজের মতো উচ্চ তরঙ্গের স্পেকট্রাম ব্যবহার করা হয়, যা ডিজিটাল হাইওয়ের মতো কাজ করে। দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৮৪৫ কিলোমিটার ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক এবং ৬ হাজার ৬০০ জিবিপিএস আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা রয়েছে, যা সাবমেরিন কেবল ও আইটিসি দিয়ে সংযুক্ত।

লোকাল ক্যাশ: ভিডিও স্ট্রিমিং দ্রুত হওয়ার নেপথ্যে বড় ভূমিকা রাখে ‘লোকাল ক্যাশ’ প্রযুক্তি। সাধারণত ভিডিওর মূল ফাইলগুলো মহাদেশ পার হয়ে বৈশ্বিক ডেটা সেন্টারে জমা থাকে। ফলে প্রতিবার ক্লিকের পর ডেটার সংযোগে বাফারিং তৈরি হয়। এটি এড়াতে দেশের ভেতরেই বিশেষ স্থানীয় সার্ভার রাখা হয়, যেখানে সচরাচর দেখা ভিডিওগুলোর এক কপি আগে থেকেই জমা থাকে। ফলে ব্যবহারকারী প্লে-বাটনে চাপ দেওয়ামাত্রই ডেটাকে আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় না; দেশীয় সার্ভার থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে ভিডিও চালু হয়ে যায়।

দেশব্যাপী টাওয়ার অবকাঠামো: প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সেবা পৌঁছে দেওয়ার মূল ভিত্তি হলো দেশজুড়ে বিস্তৃত টাওয়ার। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে টেলিকম অপারেটর ও টাওয়ার কোম্পানিগুলোর যৌথ উদ্যোগে ৪৫ হাজারেরও বেশি নেটওয়ার্ক টাওয়ার সচল রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশের বেশি মানুষকে ফোর–জি নেটওয়ার্কের আওতায় এনেছে।

ভবিষ্যতের দিগন্ত ও ফাইভ-জি

বিশ্বজুড়ে ফাইভ-জি প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ঘটছে। এরিকসনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বজুড়ে ফাইভ–জি গ্রাহকসংখ্যা ৩১০ কোটি পৌঁছেছে। বৈশ্বিকভাবে দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকা এই প্রযুক্তি বাংলাদেশেও উচ্চগতির ডেটা ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে পারে। কম লেটেন্সি ও বেশি ডেটা ধারণক্ষমতার কারণে ফাইভ–জি ভবিষ্যতে ভিডিও স্ট্রিমিং, অনলাইন শিক্ষা, ক্লাউডভিত্তিক সেবা এবং অন্যান্য উচ্চগতির ডিজিটাল ব্যবহারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

ডিজিটাল ব্যবধান কমলে এই সম্ভাবনা আরও বাড়বে। জিএসএমএর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফোর–জি নেটওয়ার্ক ৯৯ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছালেও মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন প্রায় ৪৬ শতাংশ। সাশ্রয়ী ডেটা, সহজলভ্য ডিভাইস ও ডিজিটাল দক্ষতা বাড়াতে পারলে আরও কোটি মানুষ যুক্ত হবেন ডিজিটাল দুনিয়ায়।