
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে মাত্র চারজন রাষ্ট্রপতি তাঁদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করতে পেরেছেন। অন্যদের বেশির ভাগই পদত্যাগ করেছেন বা করতে বাধ্য হয়েছেন। আর রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুজন।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত কোনো রাষ্ট্রপতিই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।
অন্যদিকে মেয়াদ শেষ করা রাষ্ট্রপতিদের সবাই ১৯৯১ সালের পর দায়িত্বে আসেন। আর এই রাষ্ট্রপতিদের সেই অর্থে কোনো নির্বাহী ক্ষমতা ছিল না।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন জীবিত আছেন। তাঁদের মধ্যে মো. আবদুল হামিদ নির্ধারিত দুই মেয়াদ শেষে স্বাভাবিক অবসরে যান। আর সর্বশেষ গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁর পদত্যাগের পর সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) গ্রহণ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। গত বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনে তাঁর শেষ কর্মদিবস ছিল। ওইদিনই বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি রাষ্ট্রপতির শপথ নিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি হয়েছেন দেশের ২৪তম রাষ্ট্রপতি। আর হাফিজ উদ্দিন আহমদ ফিরেছেন স্পিকারের দায়িত্বে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারী রাষ্ট্রপতি। কিন্তু স্বাধীনতার পর বিগত সাড়ে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের ইতিহাসে এ পদ খুব কম সময়ই স্থিতিশীল ছিল। হত্যাকাণ্ড, পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থান, গণ-আন্দোলন, রাজনৈতিক বিরোধ, সংবিধান পরিবর্তনের কারণে বারবার বদলেছে রাষ্ট্রপতির ভাগ্য। সর্বশেষ মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ এই ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় যোগ করেছে।
স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে ১৯ জন দায়িত্ব পালন করেছেন। কোনো কোনো ব্যক্তি একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন।
অসুস্থতার কথা বলে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) একক প্রার্থী হিসেবে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নানা সময় আলোচনায় আসে। নানা পক্ষ থেকে তাঁকে অপসারণের দাবি তোলে। এমনকি এই দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ পর্যন্ত হয়।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে—এ বিবেচনায় তখন বিএনপিসহ বিভিন্ন পক্ষ মো. সাহাবুদ্দিনকে তাঁর পদে রাখার পক্ষে যুক্তি দেয়। গত ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর রাষ্ট্রপতি পদে মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত বিএনপি অপেক্ষা করবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে ১৯ জন দায়িত্ব পালন করেছেন। কোনো কোনো ব্যক্তি একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, বিএনপির পক্ষ থেকে একপর্যায়ে মো. সাহাবুদ্দিনকে এমন বার্তা দেওয়া হয় যে তারা রাষ্ট্রপতি পদে নিজেদের কাউকে চায়। তাই তাঁর পদত্যাগ করা দরকার। আর এমনটা করা হলে তাঁকে নিরিবিলি জীবনযাপনে বাধা দেবে না সরকার। এরপরই সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন।
পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন বিভিন্ন রোগে ভুগছেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, ‘আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদ্যন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি নামের রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ রোগের কারণে আমি মাঝেমধ্যে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন।’
পদত্যাগ করার পর মো. সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবন ছেড়ে গুলশানে নিজের ফ্ল্যাটে ওঠেন। মো. সাহাবুদ্দিন জানিয়েছেন, তিনি বেশ অসুস্থ। তাঁর এক পা অনেকটাই অবশ। তাঁকে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হচ্ছে। তাঁর মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে সমস্যা রয়েছে।
মো. সাহাবুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব না থাকায় স্বস্তি আছে। তবে গুরুতর অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর সময় কাটছে। তবে এর মধ্যেও লেখালেখি করার চেষ্টা করছেন।
সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি বঙ্গভবনের দিনগুলো নিয়ে বই লিখছি। ঘটনাবহুল সময়টা লেখায় আনতে চাই।’
রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর মো. আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন। পরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। পরবর্তী সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। মেয়াদ পূর্ণ করে ২০১৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় দফায় ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ তিনি মোট ১০ বছর রাষ্ট্রপতি ছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির পদে ছিলেন তিনি।
বঙ্গভবন ছাড়ার সময় আবদুল হামিদকে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় বিদায় জানানো হয়। তাঁকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাঁকে বিদায় জানান। পরে তিনি স্ত্রী রাশিদা খানমকে সঙ্গে নিয়ে মোটর শোভাযাত্রায় বঙ্গভবন থেকে রাজধানীর নিকুঞ্জের নিজ বাসভবনে যান। বাংলাদেশে কোনো বিদায়ী রাষ্ট্রপতিকে বঙ্গভবনে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় বিদায় দেওয়ার ঘটনা এটিই ছিল প্রথম।
রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর আবদুল হামিদ কিছুটা আড়ালেই ছিলেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। গত বছরের মে মাসে তিনি চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে যান। প্রায় এক মাস ব্যাংককের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে গত ৯ জুন তিনি দেশে ফেরেন। তখন তাঁকে নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল।
গত ২৬ জুলাই সাবেক দুই রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে পৃথক অভিযোগ জমা পড়ে। তবে বিষয়টি নিয়ে আর তেমন একটা আলোচনা নেই।
রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর আবদুল হামিদ কিছুটা আড়ালেই ছিলেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। গত বছরের মে মাসে তিনি চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে যান। প্রায় এক মাস ব্যাংককের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে গত ৯ জুন তিনি দেশে ফেরেন। তখন তাঁকে নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল।
গণ–অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদ পদত্যাগ করেন। পরে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরে গিয়ে প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ফিরে যান।
এরপর রাষ্ট্রপতি হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর—পুরো পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কারণ, এর আগে সামরিক অভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে কোনো রাষ্ট্রপতির মেয়াদ স্বাভাবিকভাবে শেষ হয়নি।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর সাহাবুদ্দীন আহমদের সঙ্গে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার (বর্তমানে ভারতে পলাতক) সম্পর্কের অবনতি ঘটে। শেখ হাসিনার অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আনতে সাহাবুদ্দীন আহমদ ভূমিকা রাখেননি।
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এবং নির্বাচনের আগে সামরিক বাহিনীতে অভ্যুত্থানচেষ্টা হয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পূর্ণ করে চলে যাওয়ার পর তিনি আর সেভাবে জনসমক্ষে আসেননি। ২০১৭ সালের ৩ নভেম্বর ৯১ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের সমর্থনে জয়ী হলেও তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপিরও তখন সাহাবুদ্দীন আহমদের ব্যাপারে আপত্তি ছিল না বলে আলোচনা ছিল। বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেকটা নিভৃতে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর বঙ্গভবন ছাড়েন তিনি।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর সাহাবুদ্দীন আহমদের সঙ্গে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার (বর্তমানে ভারতে পলাতক) সম্পর্কের অবনতি ঘটে। শেখ হাসিনার অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আনতে সাহাবুদ্দীন আহমদ ভূমিকা রাখেননি।
বঙ্গভবন ছাড়ার পর জীবনের বাকি সময় নিভৃতে কাটিয়ে দেন সাহাবুদ্দীন আহমদ। ২০২২ সালের ১৯ মার্চ ৯২ বছর বয়সে তিনি মারা যান। রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজে এখনো তাঁর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারের সমর্থনে রাষ্ট্রপতি হন এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। কিন্তু সরকারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পর সংসদের তৎকালীন স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপতি হন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ।
ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের মেয়াদ ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন—এ নিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন। এতে আপত্তি জানিয়ে বিরোধী দল আন্দোলন অব্যাহত রাখে। পরে সেনা-সমর্থিত এক-এগারোর সরকার আসে। নির্বাচন প্রায় দুই বছর পিছিয়ে যায়। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জিল্লুর রহমান। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। একই দিন জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতির শপথ নেন।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জমির উদ্দিন সরকার ও ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ—তিনজনই পরে বার্ধক্যের কারণে মারা যান।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারের সমর্থনে রাষ্ট্রপতি হন এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। কিন্তু সরকারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
বাংলাদেশে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় তিনবার। প্রথমবার ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল এম এ জি ওসমানী প্রায় ২২ শতাংশ ভোট পান।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন জিয়াউর রহমান। তিনি নিহত হলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার। একই বছর ১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৬৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী আবদুস সাত্তার। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী ড. কামাল হোসেন ২৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।
বাংলাদেশে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় তিনবার। প্রথমবার ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
কিছুদিনের মধ্যেই তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির মধ্যে উপদলীয় কোন্দল ও অনৈক্য তীব্র হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানে আবদুস সাত্তার ক্ষমতাচ্যুত হন। দেশে সামরিক আইন জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদ। তিনি নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন।
১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি ‘স্বাস্থ্যগত’ কারণে পদত্যাগ করলে এরশাদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সামরিক শাসন থাকা অবস্থায় তিনি গণভোটের আয়োজন করেন। এতে তাঁর পক্ষে ৯৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে বলে নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়।
বিচারপতি আবদুস সাত্তার ও বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরী পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন।
দেশে সামরিক আইন জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদ। তিনি নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন।
১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। এরশাদ ৮৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাওলানা মুহম্মদ উল্লাহ (হাফেজ্জী হুজুর) প্রায় ৬ শতাংশ ভোট পান।
এরশাদের ৯ বছরের শাসনামল কাটে বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রামে। শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ। তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় যেতে সহায়তা করেন তিনি। বিনিময়ে কারামুক্ত হন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিভেদপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানের সুযোগে পরবর্তী সময়ে মোটামুটি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে সক্ষম হয়েছিলেন এরশাদ। ২০১৯ সালে ৮৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে ছয় সদস্যের বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে।
পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তির পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। মাত্র দুই দিন পর রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যায় দেশ। তখন প্রধানমন্ত্রী হন শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তিনি পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন স্পিকার মুহম্মদুল্লাহ্। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে ছিলেন।
১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় ব্যবস্থা চালু করা হয়। ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বিল পাস হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে আবার রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়। রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যা করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া প্রথম রাষ্ট্রপতি তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে ছয় সদস্যের বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়।
১৯৭৫ সালে এক বছরে দেশ তিনজন রাষ্ট্রপতি দেখে। ১৫ আগস্টের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন। তাঁর মেয়াদ ছিল মাত্র ৮৩ দিন। ৬ নভেম্বর তাঁকে সরিয়ে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। তিনিও মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি হন জিয়াউর রহমান।
স্বাধীনতার পর প্রথম ২০ বছরের ইতিহাসে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির পদটি বারবার রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রপতি পদ ঘিরে ঘটেছে নানা ঘটনা।
১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনর্বহালে পর রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও এই সময়পর্বে রাষ্ট্রপতি পদটি পুরোপুরি রাজনৈতিক উত্তাপের বাইরে ছিল না।