
গর্জনবনের ভেতরে হাতির করিডরে সড়ক নির্মাণের প্রকল্প বন বিভাগকে না জানিয়েই এগিয়ে নিয়েছে এলজিইডি। অর্ধেক কাজ শেষে এখন অনুমতি চাইছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া অংশে নেমে বাঁয়ে গেলে খুঁটাখালী বাজার। এ বাজার থেকে পূর্ব দিকের সড়ক ধরে দেড় থেকে দুই কিলোমিটার গেলে মধুশিয়া গর্জনবন। বনের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি গর্জনগাছ। নির্জন বনভূমি চিরে বয়ে গেছে খুঁটাখালী খাল। বনের ভেতরে হাঁটার সরু পথজুড়ে ছড়িয়ে আছে হাতির পায়ের ছাপ, কোথাও কোথাও মল। এসবই বলে দেয়, এ পথে এখনো হাতি চলাচল করে।
এ বনভূমির মধ্য দিয়েই প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বন বিভাগের অনুমতি ছাড়াই প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ হয়ে গেছে। প্রকল্পের মাঝপথে এসে বন বিভাগের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) চাওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনের ভেতরে সড়কটি নির্মিত হলে হাতির চলাচল ব্যাহত হবে, বাড়বে মানুষ-হাতির সংঘাত। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়বে মধুশিয়ার প্রাচীন গর্জনবনটি।
দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের (এসসিআরডিপি) আওতায় মোট ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে অর্থ দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।
প্রকল্পের আওতায় সংরক্ষিত বনের পূর্ব দিকে খুঁটাখালী বাজার থেকে মধুশিয়া এবং পশ্চিমে ঈদগড় থেকে কালাপাড়া পর্যন্ত দুই প্রান্তে ছয় কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এখন বাকি রয়েছে মধুশিয়ার সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশ।
অথচ ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বনভূমির ভেতরে কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে বন বিভাগের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনুমতি ছাড়াই এই প্রকল্পের কাজ প্রায় অর্ধেক শেষ করে এনেছে এলজিইডি। প্রকল্পের মাঝামাঝি এসে সড়ক নির্মাণে বন বিভাগের অনাপত্তি চেয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনের ভেতরে সড়কটি নির্মিত হলে হাতির চলাচল ব্যাহত হবে, বাড়বে মানুষ-হাতির সংঘাত। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়বে মধুশিয়ার প্রাচীন গর্জনবনটি।
বনের দুই প্রান্তে সড়কের কাজ শেষ বলে জানান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সায়েদুজ্জামান সাদেক। সড়কটির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, খুঁটাখালী এলাকার বাসিন্দাদের অনেক পথ ঘুরে ঈদগড় বাজারে যেতে হয়। সড়কটি নির্মিত হলে এই এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, কমবে সময় ও দূরত্ব।
প্রকল্প গ্রহণের সময় বন বিভাগের অনাপত্তিপত্র নেওয়া হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নে সায়েদুজ্জামান প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
প্রকল্প পরিচালক আবদুস সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, বন বিভাগের অনাপত্তির জন্য জেলা অফিস থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অনুমতি পাওয়া গেলে কাজ হবে, না পেলে হবে না। তবে প্রকল্পের মাঝপথে এসে কেন অনুমতি চাওয়া হলো, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন ২০১৩-১৬ সাল মেয়াদে বাংলাদেশে হাতির করিডর চিহ্নিত করতে একটা সমীক্ষা চালায়। ‘অ্যাটলাস: এলিফ্যান্ট রুটস অ্যান্ড করিডরস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই সমীক্ষায় কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে ১২টি করিডর চিহ্নিত করা হয়।
এসব করিডরের মধ্যে আটটি করিডর পড়েছে কক্সবাজার অঞ্চলে। সেগুলোর একটি খুঁটাখালী-মেধাকচ্ছপিয়া করিডর, যা মধুশিয়া গর্জনবনের ভেতর দিয়ে গেছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনভূমিতে ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিলে হাতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর বন্ধ হয়ে যায়। সেগুলো হলো উখিয়া-গুমধুম ও তুলাবাগান-পানেরছড়া করিডর। এ ছাড়া দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের কারণে ফাসিয়াখালী, মানিকপুর ও চুনতি করিডর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ অবস্থায় মধুশিয়া বনের ভেতর নতুন সড়ক নির্মাণ হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথকে আরও সংকুচিত করবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতিবিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, দেশের বনগুলো নানা কারণে এমনিতেই অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে নতুন সড়ক নির্মাণ করা হলে হাতিসহ অন্যান্য বন্য প্রাণী আরও বিপদে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনের ভেতরে সড়কটি নির্মিত হলে হাতির চলাচল ব্যাহত হবে, বাড়বে মানুষ-হাতির সংঘাত। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়বে মধুশিয়ার প্রাচীন গর্জনবনটি।প্রকল্প পরিচালক আবদুস সাত্তার
গত এপ্রিলের শুরুতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এই সড়ক নির্মাণের বিষয়ে বন বিভাগের মতামত জানতে চায়। জবাবে বন বিভাগ বলেছে, মধুশিয়া গর্জনবন হাতি চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ। এখানে সড়ক নির্মিত হলে মানুষ ও হাতির সংঘাত বাড়বে, বনের প্রাকৃতিক অখণ্ডতা নষ্ট হবে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রায়হান কাউছার প্রথম আলোকে বলেন, বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের জন্য অনাপত্তি চেয়ে আবেদন এসেছে। এখন পর্যন্ত কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলায় সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণে অনাপত্তিপত্র চেয়ে বন অধিদপ্তরে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ। তিনি সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে ৩০টি সড়ক নির্মাণ করতে চান। গত ২০ মে দেওয়া ওই চিঠিতে এসব সড়ক বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তিনি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানান।
জানতে চাইলে আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ প্রথম আলোকে বলেন, সড়ক না করলে মালামাল যাবে কোন দিক দিয়ে? এসব সড়কের টেন্ডার হয়ে গেছে, বন বিভাগের কারণে কাজ করা যাচ্ছে না।
১৪ জুন চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগ থেকে বন অধিদপ্তরে দেওয়া এক চিঠিতে বলা হয়েছে, মহেশখালীর জে এম ঘাট থেকে কালারমারছড়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত সড়কটি পড়েছে সংরক্ষিত বনে। ১৯৫৭ সালে বন আইনের ২০ ধারায় এটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করা হয়। এ বনে মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, বানর, মুখপোড়া হনুমান, বিপন্নপ্রায় পাহাড়ি কচ্ছপ, অজগরের আবাসস্থল। এ বনে বন বিভাগের বনায়ন কর্মসূচিও চলমান আছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। সংরক্ষিত এ বনে সড়ক নির্মাণ করা হলে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস, বৃক্ষনিধন, মাটির অণুজীব নষ্ট হওয়া, কীটপতঙ্গ, উদ্ভিদ, জলাধারসহ বনের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে চিঠিতে জানানো হয়।
সড়ক না করলে মালামাল যাবে কোন দিক দিয়ে? এসব সড়কের টেন্ডার হয়ে গেছে, বন বিভাগের কারণে কাজ করা যাচ্ছে না।কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় সংসদে যেসব আইন পাস হয়েছে, সেগুলোর একটি বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন-২০২৬। এ আইনের তৃতীয় অধ্যায়ের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো প্রাকৃতিক বন বনবহির্ভূত কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। অন্যান্য বনভূমির ক্ষেত্রে অপরিহার্য জাতীয় প্রয়োজনে অন্য কোনো বিকল্প না থাকলে মন্ত্রিসভার সম্মতিতে ও সরকারের অনুমোদন নিয়ে তা করা যাবে। সে ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিরূপণ, ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন, বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি, বিপদাপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এ অনুমোদন দিতে হবে।
জাতীয় বননীতি ২০২৫-এর ১০ অনুচ্ছেদে বনভূমিকে বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১(৫)-এ বলা হয়েছে, বনবহির্ভূত কাজে বনভূমি ব্যবহার বন্ধ করা হবে। অনুচ্ছেদ ১(৬)-এ বলা হয়েছে, দেশে বনভূমির অপ্রতুলতার কারণে মন্ত্রিপরিষদের সম্মতি ও সরকারপ্রধানের অনুমোদন ছাড়া বনভূমি বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
একইভাবে জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০০১-এর ১৭ অনুচ্ছেদে বনভূমি সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদের (ক)-তে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবে। প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
সরকারপ্রধান দেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য রক্ষায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে যদি সংসদ সদস্য ও এলজিইডি বনের ভেতর দিয়ে সড়ক করতে চায়, সেটা মানা যায় না।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক মো. কামাল হোসেন
এরপরও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে জবরদখল ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রাকৃতিক বনভূমি হ্রাস পাচ্ছে। ২০২৫ সালে করা বন বিভাগের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে প্রায় ১ লাখ ১ হাজার হেক্টর বনভূমি কমে গেছে। এতে আরও সংকুচিত হয়েছে আইইউসিএনের মহাবিপন্ন তালিকাভুক্ত এশীয় হাতির আবাসস্থল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক মো. কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকারপ্রধান দেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য রক্ষায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে যদি সংসদ সদস্য ও এলজিইডি বনের ভেতর দিয়ে সড়ক করতে চায়, সেটা মানা যায় না।
বনের ভেতরে সড়ক নির্মাণের সম্ভাব্য ক্ষতি প্রসঙ্গে অধ্যাপক কামাল হোসেন বলেন, বনের ভেতর দিয়ে সড়ক গেলে একসময় বিদ্যুৎ যাবে, মানববসতি তৈরি হবে, ধীরে ধীরে বন দ্বিখণ্ডিত হবে, বন্য প্রাণীর চলাচল ব্যাহত হবে। একসময় মধুশিয়ার পুরো বনটাই হারিয়ে যাবে। সে জন্য বনের ভেতর দিয়ে নয়, সড়কের জন্য বিকল্প উপায় বের করতে হবে।