ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর আয়োজিত গণভোট সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। আজ বুধবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর আয়োজিত গণভোট সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। আজ বুধবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে

নির্বাচনকে সামনে রেখে পরীক্ষা শুরু হলো, ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ফাইনাল: প্রধান উপদেষ্টা

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন যেন এমন একটি নির্বাচন হয়, যা ভবিষ্যতে নির্বাচনের ক্ষেত্রে আদর্শ তৈরি করবে। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের ধাপে ধাপে পরীক্ষা শুরু হলো। আজ থেকে শুরু, ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ফাইনাল।’

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর আয়োজিত গণভোটকে সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধান উপদেষ্টা এ কথা বলেন। আজ বুধবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই বৈঠক হয়। সভায় কয়েকজন উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান, পুলিশ প্রধান, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবসহ আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সংস্থাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং সভার আলোচনা সম্পর্কে জানিয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলন করে সভার বিভিন্ন তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা আসলে নির্বাচন কমিশনকে সাহায্য করব, এটাই আমাদের কাজ। জাতির জন্য এটা বড় এক চ্যালেঞ্জ, যা আমাদের নিতে হবে এবং এই বিশাল কাজটি শেষ করে ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে দাঁড় করাতে হবে। নির্বাচনের দিন যেন কোনো কিছুর অভাব বোধ না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ মনোযোগী হতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি কোথাও যেন কোনো গলদ না থাকে। ইসির নির্দেশই এখন সবচেয়ে বড় নির্দেশ, ইসির নির্দেশনা মেনে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কমান্ডের মূল ভূমিকায় থাকবে। এখন নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। এবারের নির্বাচনে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করা হবে।

দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ে যেন কোনো রকম ঘাটতি না থাকে, সে দিকে খেয়াল রাখার আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এবার দেশ ও বিদেশের বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক নির্বাচন ‘কাভার’ করবেন এবং দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা বিপুল আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাঁরা বিষয়টিকে খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছেন, এ বিষয়ে সুপার সিরিয়াস থাকতে হবে।

সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই মুহূর্তে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যে প্রস্তুতি রয়েছে, তাতে একটি সুন্দর নির্বাচন সম্ভব।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনে যাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রেখে চলছেন। তাঁরা কেউই এই মনোভাব থেকে সরে যাবেন না বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা।

এবার ব্যালট গণনায় কিছুটা বাড়তি সময় প্রয়োজন হবে

বৈঠকে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশগ্রহণ করছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬টি দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ৩০০ জনের পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তাদের ৫৬ জন প্রতিনিধি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তাঁদের দুজন প্রতিনিধি মনোনয়নপত্রসংক্রান্ত আপিলপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন।

সচিব জানান, আজ বুধবার মধ্যরাতে শুরু হয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে ৭টা পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন প্রার্থীরা।

সাইবার জগতে তথ্যবিকৃতিকে এবার একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন ইসি সচিব। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যালট, গণভোটের ব্যালট ও পোস্টাল ব্যালট গণনার ক্ষেত্রে কিছুটা বাড়তি সময় প্রয়োজন হবে। এটা ঘিরে যেন কোনো অপতথ্য বা গুজব ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য গণমাধ্যমগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, নির্বাচনের দিন নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে তাঁর মন্ত্রণালয় কাজ করছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট (অব.) জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে বিবেচিত হবেন। সুতরাং প্রয়োজন হলে তাঁরা ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করতে পারবেন।

প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, নির্বাচনের দিন সব ভোটকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট–সেবা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে।

লুট হওয়া ২২৫৯টি অস্ত্র উদ্ধার

সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বৈঠকে জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে গণ-অভ্যুত্থানকালে দেশের বিভিন্ন থানা থেকে ৩ হাজার ৬১৯টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ২ হাজার ২৫৯টি উদ্ধার করা হয়েছে, যা লুট হওয়া অস্ত্রের ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ।

সেনাবাহিনীর প্রধান আরও জানান, একই সময়ে দেশের বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া গোলাবারুদের পরিমাণ ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড। ইতিমধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড উদ্ধার করা হয়েছে, যা ৫২ শতাংশ।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, নির্বাচনের সময় জনমনে স্বস্তি নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলো পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা সামনের দিনগুলোয় কার্যকর করা গেলে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র আনসার সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান করবেন। ফলে চাইলেই কেউ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দিতে পারবেন না। কাউকে কেন্দ্রের ভেতর কোনো প্রকার বেআইনি কাজ করতে দেওয়া হবে না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গণি বলেন, আগামী পাঁচ দিনে স্থানীয় পর্যায়ে বডি-ওর্ন ক্যামেরা পৌঁছে যাবে। পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহার করবেন। ভোটের চার দিন আগে সব বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হবে এবং ভোটের পর তাঁরা আরও সাত দিন মাঠে থাকবেন।

আজ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে একাধিক টিম নির্বাচনসংক্রান্ত মাঠপর্যায়ের যাবতীয় তথ্য ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং ও রেকর্ড করবেন বলে জানান সচিব। তিনি জানান, বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সংযুক্ত হওয়া যাবে। এর মাধ্যমে সব ঘটনা রেকর্ড করা যাবে। এ সময় সচিব বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের ওপর একটি ভিডিও চিত্র উপস্থাপন করেন।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বডি-ওর্ন ক্যামেরার নানা সম্ভাবনার দিক আছে। এটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে বিশাল মাত্রায় সাফল্য পাওয়া সম্ভব। এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে এবং প্রয়োজন হলে আরও কম দিনের ব্যবধানে বৈঠকে বসা হবে।

সভায় অন্যদের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আবদুল হাফিজ, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ, নৌবাহিনীর প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া, পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানেরা উপস্থিত ছিলেন।