
দেশে ভবন নির্মাণে আইনের অভাব নেই। কিন্তু সুশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতায় ভবন নির্মাণে ঝুঁকি বাড়ছে। দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভবন নির্মাণে নিয়ম মানা হচ্ছে না। ভবন ভূমিকম্পসহনীয় করা ও গণসচেতনতা বাড়ানোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আজ শুক্রবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এক সেমিনারে এমন কথা উঠে আসে। ‘ভূমিকম্প: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজক প্রগতিশীল প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি সমাজ।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন প্রগতিশীল স্থপতি, নগর–পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলী সমাজের আহ্বায়ক মীর মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। তিনি সেমিনারে মূল বক্তব্যও উপস্থাপন করেন।
গত বছরের নভেম্বরে ৫ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প দেশে আতঙ্ক বাড়িয়েছে উল্লেখ করে মীর মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, তথ্য সংগ্রহে দুর্বলতা, সিসমোগ্রাফ নেটওয়ার্ক অকার্যকর থাকায় বর্তমানে ভূমিকম্পে ঝুঁকি বিশ্লেষণ কঠিন।
বক্তব্যে ঢাকা ও বিভিন্ন শহরের ভবনের কোড হালনাগাদ, নকশা যাচাই, পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা ও দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদারের তাগিদ দেন মীর মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, এতে ক্ষয়ক্ষতি কমবে, উদ্ধার তৎপরতা বাড়বে এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রধান আলোচক হিসেবে সেমিনারে অংশ নেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারি। তাঁর মতে, ভবন নির্মাণে দেশে ৬০টির বেশি প্রয়োজনীয় আইন থাকলেও তার সঠিক বাস্তবায়ন নেই। তিনি বলেন, ‘দেখা গেল যে বিল্ডিং কোড আছে, আমাদের নির্মাণ বিধিমালা আছে, সবই আছে, কিন্তু আইনের প্রয়োগ খুব কম। এর পেছনে দায়ী আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।’
রাজউকের বিরুদ্ধে অদক্ষতা ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মীর মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, ঢাকার ১ হাজার ৯০০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ৬ লাখ ভবনই ঝুঁকিপূর্ণভাবে তৈরি করা। এগুলো চিহ্নিত করার দক্ষতা রাজউকের নেই।
রাজউকের ডিজিটাল সিস্টেম (ইসিপিএস) প্রসঙ্গে মীর মোশাররফ হোসেন চৌধুরী মন্তব্য করেন, ইসিপিএস সিস্টেম আছে কিন্তু পারমিশন নিতে গেলে ঘুষ দিতেই হবে। টাকা না দিলে প্রসেস এগোয় না। অর্থাৎ সব জায়গায় গলদ রয়েই যাচ্ছে। কাজেই এ সমস্যা দূর না হলে সংকটও কাটবে না। তিনি ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় তৃতীয় পক্ষ দিয়ে ভবন পরীক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারদের প্রশিক্ষণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ বাজেট বরাদ্দের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেন।
বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার সাব্বির আহমেদ ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিল্ডিং কোড আরোপের বাধ্যবাধকতা এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা ভেঙে পুনরায় গড়ে তোলার কথা বলেন।
সেমিনারে বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন বিশ্লেষণ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর মতে, দেশের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত ‘মধুপুর ফল্ট’ নিয়ে বিশেষ সতর্কতা রয়েছে। ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ফল্ট ভূতাত্ত্বিকভাবে খণ্ডিত বা সেগমেন্টেড। তাই পুরো ফল্ট একসঙ্গে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা কম।
ভূমিকম্প–পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করেন এই অধ্যাপক। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মূলত চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে বলে মত দেন তিনি। এগুলো হলো ভূমিকম্পের মাত্রা, উৎপত্তিস্থলের গভীরতা, মাটির ধরন এবং জনবসতির ঘনত্ব। বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পলিমাটির আধিক্য এবং ঘনবসতি এই ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।’
কক্সবাজার অঞ্চলের প্রকৃতি এবং বাস্তুসংস্থানের (ইকোসিস্টেম) বিপন্ন অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ খন্দকার নিয়াজ রহমান।
নিয়াজ রহমান উন্নয়নের নামে স্থানীয় মানুষের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ এবং চকরিয়া সংরক্ষিত বনের মধ্য দিয়ে মহাসড়ক নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বলেন, ‘উন্নয়নের ধারণায় বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ বলে কিছু নেই। যদি তা স্থানীয় মানুষের কল্যাণকে বাধাগ্রস্ত করে।’
সেমিনারের শুরুতে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের স্মরণে এক মিনিট দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাবিবের সঞ্চালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, প্রকৌশলী, স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদেরা।