
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে ফেসবুকে বিভিন্ন মন্তব্য (পোস্ট) করায় বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল—একজন ভুক্তভোগীর জবানবন্দিতে এ তথ্য উঠে এসেছে।
জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুম করে রাখার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সোমবার চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ভুক্তভোগী ইকবাল চৌধুরী। এ মামলায় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক পাঁচজন মহাপরিচালক, ছয়জন সাবেক পরিচালকসহ আসামি ১৩ জন।
জবানবন্দিতে এই সাক্ষী বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাসা থেকে বের করে দেওয়া, ভারতীয় আধিপত্যবাদ—এসব বিষয়ে তিনি ফেসবুকে লেখালেখি করতেন। এর ফলে ২০১৮ সালের ৭ মে রাতে নিজ বাসা থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যায় সাত–আটজন ব্যক্তি। ওই ব্যক্তিরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁকে সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসে ওঠানোর সময় ডিবির পোশাক পরা দুজনকে দেখতে পান তিনি।
জবানবন্দিতে ইকবাল চৌধুরী বলেন, তিনি এখন মোহাম্মদপুরে থাকেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি আগে ব্যবসা করতেন।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ইকবাল চৌধুরী বলেন, গাড়িতে ওঠার পর চোখ বাঁধা হয়। হাতকড়ার পাশাপাশি যমটুপি পরানো হয়। গাড়ি ছেড়ে দিলে একজন তাঁকে বলেন, যা জিজ্ঞাসা করা হবে সত্য বলতে হবে। নয়তো ‘ক্রসফায়ার’ করে লাশ গুম করে ফেলা হবে। গাড়িটি ২০ থেকে ৩০ মিনিট চলে। এরপর গাড়ির দরজা খুলে দুজন ব্যক্তি তাঁকে হাত ধরে গাড়ি থেকে নামান। তখন তাঁর রক্তচাপ মাপা হয়। সেখান থেকে এক–দেড় মিনিট হাঁটিয়ে আরেকটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। তখন চোখের বাঁধন, জমটুপি ও হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হয়। তাঁকে পুরোনো লুঙ্গি ও পুরোনো টি-শার্ট দেওয়া হয়।
জবানবন্দিতে এই সাক্ষী বলেন, তাঁকে ৮ থেকে ১০ ফুটের একটি কক্ষে রাখা হয়। সেখানে ছোট একটি চৌকি ছিল। কক্ষটিতে একটি লাইট ছিল, যা ২৪ ঘণ্টা জ্বলত। কক্ষের সামনের দেয়ালে বড় একটি এগজোস্ট ফ্যান ছিল, তাতে প্রচণ্ড শব্দ হতো। তাঁর কাছে মনে হতো তিনি একটি জীবন্ত কবরে আছেন।
* এ মামলায় ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচজন মহাপরিচালক, ছয়জন সাবেক পরিচালকসহ আসামি ১৩ জন। * আসামিদের মধ্যে ডিজিএফআইয়ের সাবেক তিনজন পরিচালক ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে আছেন।
বর্ণনার এ পর্যায়ে সাক্ষী ইকবাল চৌধুরী আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। তখন প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল বলেন, আগামী বৃহস্পতিবার আবার সাক্ষ্য গ্রহণ হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ এই মামলার বিচার চলছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এ মামলায় মোট আসামি ১৩ জন। তাঁদের মধ্যে ৩ জন ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে আছেন। তাঁরা হলেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। এই তিনজনকেই গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
মামলার অন্য ১০ আসামি পলাতক। এই আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো.আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
পলাতক আসামিদের মধ্যে আরও আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক।
অন্য দুজন পলাতক আসামি হলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক।
জবানবন্দিতে দিলেন এনসিপি নেতা মাহিন সরকার
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে করা একটি মামলায় পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো জবানবন্দি দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব মো. আবু সায়েদ বিন মাহিন সরকার। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহিনের বাড়ি সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থানায়।
জবানবন্দিতে মাহিন সরকার বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে অসহযোগ কর্মসূচি চলাকালে শেখ হাসিনার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার জন্য তাঁদের কাছে প্রস্তাব এসেছিল। ঢাকা উত্তর সিটির তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলামের পক্ষে একজন ব্যক্তি ২০২৪ সালের ২ আগস্ট এ প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু তাঁরা রাজি হননি। একই দিনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা (স্থানীয় পর্যায়ের) তাঁর মা–বাবাকে হুমকি দিয়ে বলেছিল, তাঁকে হত্যা করা হবে এবং লাশ পৈতৃক নিবাসে দাফন করতে দেওয়া হবে না। এর আগে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ মুঠোফোনে তাঁর বাবাকে বলেছিলেন, আন্দোলন থেকে সরে না গেলে তাঁকে (মাহিন) জীবিত ফেরত না–ও পাওয়া যেতে পারে।
এ মামলার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ।
ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। এ মামলার সব আসামিই পলাতক।
মেনন ও কামরুল বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আবেদন
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায় সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-১-এ গতকাল এ আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
আসামি রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামকে গতকাল কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এ মামলায় আসামিপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য ১১ মার্চ দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।