‘জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের ৭৫ বছর: পরিপ্রেক্ষিত এবং বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক আলোচনায় সভাপতির বক্তব্য দেন রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম। রাজধানীর তোপখানা রোড, ১৬ মে
‘জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের ৭৫ বছর: পরিপ্রেক্ষিত এবং বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক  আলোচনায় সভাপতির বক্তব্য দেন রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম। রাজধানীর তোপখানা রোড, ১৬ মে

জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের ৭৫তম বার্ষিকী

আমলাতন্ত্রে গেঁথে থাকা জমিদারি মানসিকতা ভাঙতে হবে

জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হলেও আমলাতন্ত্রে জমিদারি মানসিকতা গেঁথে আছে। জমিদারি প্রথার প্রভাব এখনো প্রশাসন ও রাজনীতিতে রয়েছে। রাষ্ট্রকে এই প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। নাগরিকদের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র সংস্কারের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের দিবসকে উদ্‌যাপন করতে হবে।

আজ শনিবার জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের ৭৫তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন আয়োজিত আলোচনা সভায় দলটির সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম এ কথা বলেন। সকালে রাজধানীর তোপখানা রোডে দলটির কার্যালয়ে ‘জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের ৭৫ বছর: পরিপ্রেক্ষিত এবং বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন করা হয়।

ব্রিটিশ ভারতে লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা চালু করেছিলেন। দীর্ঘ আন্দোলন–সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৫০ সালে ‘রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনে’ এর অবসান ঘটে। পরের বছর ১৯৫১ সালের ১৬ মে আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশিত ও কার্যকর হয়। সেই হিসাবে আজ শনিবার ছিল জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের ৭৫তম বর্ষপূর্তি।

ছোট থেকে বড় প্রতিটি আমলা মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিজেদের জমিদার বলেই ভাবেন। তাঁদের ক্ষমতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাঁদের কোনো কিছুর সমালোচনা করার উপায় নেই। তাঁদের কোনো জবাবদিহি নেই।

হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ভারতবর্ষের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়, প্রায় দেড় শ বছর ধরে আন্দোলন–সংগ্রাম হয়েছে এই জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে। ফকির, সন্ন্যাসী, নানকা, নাচোল, তেভাগা, টংক—এমন বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন স্থানে জামিদারি প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। এসব আন্দোলন মূলত ছিল কৃষকদের আন্দোলন। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের মধ্য দিয়েই জনসাধারণ এখানে ‘প্রজা’ থেকে ‘নাগরিক’ হয়ে উঠেছিলেন। তাদের পায়ের নিচে মাটি এসেছিল। সেই মাটির ওপর দাঁড়ানোর শক্তিতেই পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনসহ সব আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে। এ কারণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের অর্জনকে আমাদের একটি বড় বিজয় হিসেবে উদ্‌যাপন করতে হবে। এত দিন এটা করা হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশকে জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে জমিদারি প্রথার যে প্রভাব এখনো প্রশাসন ও রাজনীতিতে রয়েছে, তা অবসান করতে হবে। এ জন্যই এই দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে আরও ব্যাপক পরিসরে উদ্‌যাপন করা দরকার।

জমিদারি প্রথা ও খাজনাব্যবস্থা নিয়ে গভীর আলোচনা করেন ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নৃবিজ্ঞানী বখতিয়ার আহমেদ। তিনি বলেন, ব্রিটিশদের জমিদারি প্রথার প্রধান লক্ষ্যই ছিল বিপুল পরিমাণে খাজনা আদায় করা। কৃষকের হাতে জমির মালিকানা ছিল না। ব্রিটিশরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করেছিল। জামিদারদের সঙ্গে জমির সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না। কৃষকের বাঁচা-মরা নিয়ে কারও ভাবান্তর ছিল না। ১৭৭২ সালের দুর্ভিক্ষ ও মন্বন্তরে বিপুলসংখ্যক কৃষকের প্রাণহানি ঘটলেও ১৭৭৩ সালে খাজনা আদায়ের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল।

এই শিক্ষক বলেন, জমিদারি প্রথা এখন নেই। ‘খাজনা’ এখন ‘কর’ হিসেবে এসেছে নাগরিক জীবনে। রাষ্ট্র যেন নাগরিকের নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে সে কারণেই তারা কর দেয়। কিন্তু এই কর কতটা জনকল্যাণে ব্যবহার হচ্ছে সেই প্রশ্ন এখন জোরালোভাবে তুলতে হবে।

ব্রিটিশদের করা জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও এখনো অনেক আইন রয়েছে যা সংস্কার হওয়া দরকার বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোকছেদুল ইসলাম। তিনি বলেন, এসব আইনের বেআইনি ব্যবহার করে স্বৈরাচার সৃষ্টি হচ্ছে। আইনের বেআইনি ব্যবহার রোধ করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের এখন বাস্তবতার নিরিখে এটাও ভাবতে হবে, কতটুকু আইন মানা সম্ভব। রাষ্ট্রকে কল্যাণকর করতে হলে প্রকৃত শিক্ষার বিস্তার, আইন ও রাষ্ট্রের সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি।

তরুণ প্রজন্মের লেখক ও গবেষক সহুল আহমেদ বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে এখন বহুদিক থেকে আলোচনা হচ্ছে। এই বিষটিকে আলোচনাযোগ্য করে তুলতে ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’ ভূমিকা রেখেছে। এখন আমলাতন্ত্রের সংস্কার নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কারণ, আমলাতন্ত্রের মধ্যে জমিদারি মনস্তত্ত্ব গভীরভাবে খুঁটি গেড়ে বসে আছে। ছোট থেকে বড় প্রতিটি আমলা মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিজেদের জমিদার বলেই ভাবেন। তাঁদের ক্ষমতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাঁদের কোনো কিছুর সমালোচনা করার উপায় নেই। তাঁদের কোনো জবাবদিহি নেই। যে সাধারণ মানুষের দেওয়া কর থেকে তাঁদের বেতন–ভাতা, প্রশিক্ষণ, বিদেশ সফর, জৌলুশময় জীবনযাত্রা নির্বাহ হয় সেই সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁদের কতটা দায়বদ্ধতা আছে, সেসব এখন সামনে আনতে হবে। খোলামেলা আলোচনা করতে হবে; এটা এখন সময়ের দাবি।

অহিংস গণ-আন্দোলন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল আলম চৌধুরী বলেন, জমিদার নেই, এখন আছে ভূমিবিষয়ক বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা। রেজিস্ট্রার, সাবরেজিস্ট্রার প্রভৃতি। তাদের দৌরাত্ম্য, ভূমি অফিসের দুর্ভোগ, উৎকোচ এসব সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে রেখেছে। এখনো এই চক্র থেকে মানুষ মুক্ত হতে পারেনি। জাতিকে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্ত করা গেলে তা হবে প্রকৃতপক্ষে একটা বড় কাজ।

আলোচনায় আরও অংশ নেন রাজনীতিবিদ মনজুর কাদির, মো. সোহেল, হরিপদ দাস, সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন দিদার ভুঁইয়া।