নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইন পরিবর্তন ও বিবাহ–বিবাহবিচ্ছেদে সম–অধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান রেখেই এবার সিডও প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ। এর ফলে সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সিডওর গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারার ওপর বাংলাদেশ সরকারের সংরক্ষণ বহাল রাখার ৪১ বছর হলো।
তবে জাতিসংঘের সিডও কমিটিতে জমা দেওয়ার জন্য এবার প্রতিবেদনে সংরক্ষণ প্রত্যাহারে নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ‘পর্যবেক্ষণ’ যুক্ত করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে তুরস্ক, জর্ডান, লেবাননের মতো অন্তত ১০টি মুসলিম দেশ কীভাবে সংরক্ষণ না রেখে সিডও সনদ বাস্তবায়ন করেছে, তা বোঝার জন্য ওই সব দেশের বিজ্ঞ ব্যক্তিদের এ দেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে।
৯ বছর পর বাংলাদেশ থেকে এবার সিডওর ৯ম ও ১০ম পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন একসঙ্গে একটি প্রতিবেদন হিসেবে চূড়ান্ত করছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ নতুন এই পর্যবেক্ষণ যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
সিডওর ওই দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার না হওয়ায় নারীর পারিবারিক, বিবাহসংক্রান্ত ও ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না।ফওজিয়া মোসলেম, সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
আন্তর্জাতিক সনদ সিডওর পূর্ণ নাম হচ্ছে—কনভেনশন অন দ্য এলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব ডিসক্রিমিনেশন অ্যাগেইনস্ট উইমেন (নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ)। সিডও সনদের দুটি ধারায় চার দশক ধরে সংরক্ষণ বহাল রেখে আজ ৩ সেপ্টেম্বর বুধবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সিডও দিবস।
নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করে সম–অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘে সিডও সনদ গৃহীত হয়। ১৯৮০ সালের ১ মার্চে বিভিন্ন দেশ সনদটিতে স্বাক্ষর করতে শুরু করে। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে এ সনদ কার্যকর হয়।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিডও সনদে স্বাক্ষর ও অনুমোদন করে। শুরুতে সনদের ২, ১৩ (ক), ১৬ (১) (গ) ও (চ) ধারার ওপর সংরক্ষণ রেখেছিল বাংলাদেশ। পরে ২ ও ১৬ (১) (গ) ধারার ওপর সংরক্ষণ বহাল রেখে বাকি দুটি থেকে তুলে নেওয়া হয়।
সনদের ২ নম্বর ধারায় বলা আছে, নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসনে শরিক দেশগুলো আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবে এবং আইনের সংস্কার করবে। ১৬.১ (গ) ধারায় বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।
নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করে সম–অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘে সিডও সনদ গৃহীত হয়। ১৯৮০ সালের ১ মার্চে বিভিন্ন দেশ সনদটিতে স্বাক্ষর করতে শুরু করে। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে এ সনদ কার্যকর হয়। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিডও সনদে স্বাক্ষর ও অনুমোদন করে।
বাংলাদেশ সর্বশেষ ২০১৫ সালে সিডও কমিটিতে অষ্টম পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। গত বছরের এপ্রিলে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে নবম পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
এক বছর পর এ বছরের এপ্রিলে ওই প্রতিবেদনে কিছু ‘ভাষাগত সমস্যা’ চিহ্নিত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা সংশোধন করার জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়।
সংশোধন করে এ বছরের জুলাইয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবার প্রতিবেদন পাঠায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয় এবার নবমের সঙ্গে দশম প্রতিবেদন যোগ করে দুটো প্রতিবেদন একত্র করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। ওই প্রতিবেদনের ওপর মতামত চেয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এবার এই প্রতিবেদন তৈরিতে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উম্মে বুশরা ফাতেহা সুলতানা এবং পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ার পরামর্শক হিসেবে ছিলেন।
সিডও প্রতিবেদন আসলে চূড়ান্ত হয়ে গেছে। সিডও কমিটির নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসারে মূল প্রতিবেদন থেকে শব্দসংখ্যা কমাতে হবে। সেই কাজ শেষ করে এ সপ্তাহেই তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।দিলারা বেগম, যুগ্ম সচিব, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পলিসি লিডারশিপ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ইউনিট (প্লাউ) শাখা সিডওর বিষয়টি দেখে থাকে। এই শাখার দায়িত্বরত কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব দিলারা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, সিডও প্রতিবেদন আসলে চূড়ান্ত হয়ে গেছে। সিডও কমিটির নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসারে মূল প্রতিবেদন থেকে শব্দসংখ্যা কমাতে হবে। সেই কাজ শেষ করে এ সপ্তাহেই তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
সরকার আইন পরিবর্তনের সাহস কেন পাচ্ছে না, সে প্রশ্ন করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সিডওর ওই দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার না হওয়ায় নারীর পারিবারিক, বিবাহসংক্রান্ত ও ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকার নারী কিছু কিছু পাচ্ছে, কিন্তু ব্যক্তিগত অধিকার না থাকার ফলে নারী তা ভোগ করতে পারছে না। এসব অধিকার না থাকার কারণে নির্যাতনও কমছে না। পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকের কারণে নির্যাতন আবার বাড়ছে।