
যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধে দ্রুত আইন প্রণয়ন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ কমিটি কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনটি বলেছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে পূর্ণাঙ্গ আইন হয়নি। এমনকি ২০২৬ সালে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন পেলেও সেটি এখনো আইন হিসেবে প্রণীত হয়নি।
আজ বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। ‘উত্ত্যক্তকরণ, যৌন নিপীড়নকে না বলুন, ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন’ প্রতিপাদ্যে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ আইন প্রণয়নের দাবিতে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরে সংগঠনটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানায়।
সংবাদ সম্মেলনে মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের দাবি দীর্ঘদিনের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে অনেকে মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কেউ কেউ শিক্ষা বা কর্মজীবন থেকেও সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর মতে, যৌন হয়রানি শুধু শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি নয়, এটি মর্যাদা ও মানবাধিকারেরও লঙ্ঘন। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও নারীর সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
লিখিত বক্তব্যে মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদা রেহানা বেগম বলেন, ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনার পর থেকেই যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ কমিটি গঠনের দাবিতে আন্দোলন ও অ্যাডভোকেসি চলছে। ২০২৪ সালে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন পেলেও এখনো তা আইন হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যমান আইনে যৌন হয়রানির সংজ্ঞা ও দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা হালনাগাদ, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ কমিটি ও মনিটরিং ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং যৌন হয়রানিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ব্যাপক প্রচারের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি পাঠ্যসূচিতে প্রতিরোধমূলক বিষয় অন্তর্ভুক্তি এবং প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা সালমা আলী বলেন, ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ সব কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে এর যথাযথ প্রয়োগ নেই এবং এ বিষয়ে জবাবদিহিও নেই। তিনি যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি কার্যকর আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আইনটির দাবিতে আন্দোলন চললেও এখনো সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেন ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব। তিনি বলেন, নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দেওয়া সুপারিশগুলো চূড়ান্ত আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন।
ব্লাস্টের অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মাহাবুবা আক্তার বলেন, চূড়ান্ত আইনে হাইকোর্টের নির্দেশনার প্রতিফলন যেন থাকে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কমিটি গঠনের পাশাপাশি কমিটির বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল ও তা তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র স্টাফ লইয়ার সেলিনা আক্তার বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কমিটি থাকলেও তা কার্যকর নয়। অভিযোগ করার পরও অনেক নারীকে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম। তিনি বলেন, যেকোনো নিপীড়ন, হয়রানি বা সহিংসতা সমাজের অপরাধপ্রবণতার লক্ষণ। এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন। দ্রুত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি খসড়া তৈরিতে যুক্ত সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি কার্যকর আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।