ফেরদৌসী মজুমদার
ফেরদৌসী মজুমদার

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো–২১: ফেরদৌসী মজুমদার

জীবনকে যিনি দেখেন গভীর কৃতজ্ঞতায়

দিন ১৫ আগে লাভ লেটারস নামে মঞ্চনাটক দেখতে গেলাম বেইলি রোডে। রামেন্দু মজুমদার আর ফেরদৌসী মজুমদার এই দুনিয়াখ‍্যাত নাটকের বাংলা প্রযোজনায় অংশ নিলেন। চমৎকার একটা সন্ধ্যা কাটল শিল্প-প্রেম-স্মৃতির সন্নিধানে। ফেরদৌসী মজুমদারকে চিনি আমার বাল‍্যকাল থেকে, রংপুরে বসে রেডিও–নাটকে তাঁর অনবদ্য কণ্ঠ শোনার মাধ্যমে।

বাংলা নাট্যমঞ্চের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ফেরদৌসী মজুমদার। তাঁর কণ্ঠ, অভিনয়—সব মিলিয়ে তিনি যেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরই এক জীবন্ত অধ্যায়। ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ শীর্ষক নিয়মিত সাক্ষাৎকারের অংশ হিসেবে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম তাঁর। কথায় কথায় উঠে এল তাঁর শৈশব, পরিবার, প্রেম, অভিনয়জীবন, মুক্তিযুদ্ধ, মঞ্চ এবং জীবনের গভীর উপলব্ধি।

রাগ না করে মজা করে বলেছিলেন, ‘তোরা হিয়ানও যাই ফালাই দেস, কিন্তু সামনে দি ঘোমটা দি যাস।’ এই রসবোধ, এই মানবিকতা তাঁর বাবার চরিত্রের বড় বৈশিষ্ট্য।

ফেরদৌসী মজুমদারের জন্ম বরিশালে, ১৯৪৩ সালের জুন মাসে। তবে বড় হয়ে ওঠা ঢাকায়। তাঁর বাবা আবদুল হালিম চৌধুরী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। চাকরির কারণে একেক সন্তানের জন্ম একেক জেলায়। তাঁদের বাড়ির নাম ছিল ‘দারুল আফিয়া’, সেন্ট্রাল রোডে। সেটারই একাংশে এখন তাঁর বাড়ি, নাম ‘মাতৃছায়া’।

সেই বাড়ির গল্প করতে গিয়ে ফেরদৌসী মজুমদার যেন ফিরে গেলেন শৈশবে। বাবা ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক, কিন্তু কট্টর নন। মেয়েরা বাইরে গেলে মাথায় কাপড় দিতে হবে, এটাই ছিল নিয়ম। কিন্তু বাড়ির সামনের দোকান পার হয়েই তাঁরা ঘোমটা সরিয়ে ফেলতেন। একদিন বাবা তা দেখে ফেলেন। রাগ না করে মজা করে বলেছিলেন, ‘তোরা হিয়ানও যাই ফালাই দেস, কিন্তু সামনে দি ঘোমটা দি যাস।’ এই রসবোধ, এই মানবিকতা তাঁর বাবার চরিত্রের বড় বৈশিষ্ট্য।

তাঁদের পরিবার ছিল অসাধারণ। ১৪ ভাইবোনের পরিবার। বড় ভাই কবীর চৌধুরী, তারপর শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী। ফেরদৌসী মজুমদার ছিলেন ১১ নম্বর সন্তান। বাবা সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারে ছিলেন আপসহীন। তিনি বলতেন, ‘যেগুনে পড়ালেখা করে, হেগুনে পড়ালেখাই করব।’ মেয়েদেরও সমানভাবে শিক্ষিত হতে হবে—এ বিশ্বাস তাঁর ছিল গভীর।

প্রথম অভিনয়ের গল্প যেন সিনেমার দৃশ্য। বাবা ঘোষণা দিয়েছিলেন, নাটক, গানবাজনা করা যাবে না। অথচ সেই বাড়ির জানালায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখতেন ফেরদৌসী। কীভাবে হাঁটে, কীভাবে কথা বলে—সব তাঁর পর্যবেক্ষণে।

ফেরদৌসী মজুমদারের নিজের ভাষায়, তিনি খুব উচ্চাভিলাষী ছাত্রী ছিলেন না। পরীক্ষায় ৫৫ পেলে তিনি খুশি, আর তাঁর ভাই শেলি ৯৫ পেয়ে মন খারাপ করতেন। কিন্তু এই সাধারণ মেয়েটিই একসময় হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের নাট্যজগতের অনন্য নাম।

প্রথম অভিনয়ের গল্প যেন সিনেমার দৃশ্য। বাবা ঘোষণা দিয়েছিলেন, নাটক, গানবাজনা করা যাবে না। অথচ সেই বাড়ির জানালায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখতেন ফেরদৌসী। কীভাবে হাঁটে, কীভাবে কথা বলে—সব তাঁর পর্যবেক্ষণে।

একদিন মুনীর চৌধুরী এসে বললেন, তাঁর নাটকে একজন অভিনেত্রী দরকার। চরিত্রটি যন্ত্রমানবীর। শুধু হাঁটতে হবে আর সংলাপ বলতে হবে। সেই শুরু। নাটকের নাম ডাক্তার আব্দুল্লাহর কারখানা। অভিনয় শেষে মুনীর চৌধুরীর প্রশংসা তাঁকে সাহসী করে তোলে।

সংশপ্তক–এ ‘হুরমতি’ চরিত্র নিয়েও তাঁর স্মৃতি রোমাঞ্চকর। সহশিল্পী লিয়াকত আলী লাকী তাঁর চুল ধরে টেনে তুলতে ভয় পাচ্ছিলেন। কিন্তু ফেরদৌসী মজুমদার বলেছিলেন, ‘আমি ব্যথা পাই আর যা পাই, আপনি করেন। আমাকে অ্যাক্টিংটা করতে দেন।’ অভিনয়ের প্রতি এই আত্মনিবেদনই তাঁকে আলাদা করেছে।

এরপর আর থেমে থাকেননি। মঞ্চ, টেলিভিশন, রেডিও—সব জায়গায় তিনি হয়ে ওঠেন অনন্য। ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের উদ্বোধনী নাটক একতলা দোতলায় অভিনয় করেন। আর মঞ্চে তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় চরিত্র ‘কোকিলা’। আড়াই ঘণ্টার একক অভিনয়। তিনি নিজেই ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু আবদুল্লাহ আল মামুন তাঁকে বলেছিলেন,‘আপনি যদি না পারেন, তাহলে পারবে কে?’

সংশপ্তক–এ ‘হুরমতি’ চরিত্র নিয়েও তাঁর স্মৃতি রোমাঞ্চকর। সহশিল্পী লিয়াকত আলী লাকী তাঁর চুল ধরে টেনে তুলতে ভয় পাচ্ছিলেন। কিন্তু ফেরদৌসী মজুমদার বলেছিলেন, ‘আমি ব্যথা পাই আর যা পাই, আপনি করেন। আমাকে অ্যাক্টিংটা করতে দেন।’ অভিনয়ের প্রতি এই আত্মনিবেদনই তাঁকে আলাদা করেছে।

তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় প্রেম ও বিয়ে। রামেন্দু মজুমদার ছিলেন তাঁর সহপাঠী। একজন ইংরেজিতে, আরেকজন বাংলায় পড়তেন। রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের মহড়ায় তাঁদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। কিন্তু বিয়েতে ছিল প্রবল বাধা। পরিবারের সবাই বুঝেছিলেন, এই বিয়ে সহজ হবে না।

ফেরদৌসী মজুমদার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। খাওয়াদাওয়া বন্ধ। তখন কঠোর বাবা মেয়ের কষ্ট বুঝলেন। শেষ পর্যন্ত তিনিই রামেন্দুকে চিঠি লিখে ডাকলেন। ১৯৭০ সালের মার্চে তাঁদের বিয়ে হয়। কবীর চৌধুরীর বাসায়। বিয়ের পর রাতে বাড়িতে ফিরে দেখেন, বাবা কথা বলতে পারছেন না, শুধু কাঁদছেন। দুজনের মাথা একসঙ্গে করে আশীর্বাদ করলেন।

১৯৭১ সালে তাঁরা ভারতে যান। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও কিছু কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে জানতে পারেন, মুনীর চৌধুরীকে পাকিস্তানি বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। এই শোক তাঁকে অসুস্থ করে দেয়। পরে দেশ স্বাধীন হলেও ভাই আর ফেরেননি।

স্বাধীনতার পরপরই প্রতিষ্ঠিত হয় নাট্যদল থিয়েটার। ফেরদৌসী মজুমদার ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। এরপর দীর্ঘ পথচলা। শিক্ষকতাও করেছেন বহু বছর। অগ্রণী স্কুল, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার, সানবিমস, মাস্টারমাইন্ড, এমনকি সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটিতেও।

আজ ৮৩ বছরে দাঁড়িয়ে ফেরদৌসী মজুমদার জীবনকে দেখেন গভীর কৃতজ্ঞতায়। তাঁর ভাষায়, ‘আমার জীবনটা চমৎকার। আমি অনেক পেয়েছি।’

চলচ্চিত্রে খুব বেশি কাজ করেননি। সূর্য দীঘল বাড়িসারেং বউ-এর মতো চলচ্চিত্রের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ছোট মেয়ে ত্রপাকে সময় দেওয়ার জন্য। আজও সেই আক্ষেপ আছে। এমনকি সত্যজিৎ রায় তাঁকে অভিনয়ের আগ্রহের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। তখন গুরুত্ব বুঝতে পারেননি।

আজ ৮৩ বছরে দাঁড়িয়ে ফেরদৌসী মজুমদার জীবনকে দেখেন গভীর কৃতজ্ঞতায়। তাঁর ভাষায়, ‘আমার জীবনটা চমৎকার। আমি অনেক পেয়েছি।’

শেষে তিনি তরুণদের জন্য যে কথাগুলো বললেন, সেগুলো যেন জীবনের সারাংশ: ধৈর্য হারানো যাবে না, সৎ থাকতে হবে, সুন্দরে বিশ্বাস রাখতে হবে, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষকদের অসম্মান তাঁকে ব্যথিত করে।

ফেরদৌসী মজুমদারের জীবনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের ভেতরের আলো, শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা আর সম্পর্কের গভীরতাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সত্য।

  • আনিসুল হক, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক