
স্বাস্থ্য খাতকে উপেক্ষা করলে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দারিদ্র্য বিমোচনের চ্যালেঞ্জ আরও বাড়ে বলে মন্তব্য করেছেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ইউএইচসি ফোরামের আহ্বায়ক হোসেন জিল্লুর রহমান।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রতিবছর স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ অনেক মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলে। করোনা মহামারির সময়ে করা বিভিন্ন গবেষণাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব উঠে এসেছে। স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিলে একটি সুস্থ কর্মশক্তি গড়ে ওঠে, যা শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত ‘প্রায়োরিটি হেলথ রিফর্ম অ্যাকশন এজেন্ডা: বাংলাদেশ রোড টু ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ’ শীর্ষক এক নীতিনির্ধারণী সংলাপে হোসেন জিল্লুর রহমান এ কথা বলেন। বাংলাদেশের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের পথে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ বিষয়ে সংলাপটির আয়োজন করা হয়।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ইউএইচসি ফোরামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সংলাপ ‘বাংলাদেশ রোড টু ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ-নিউ ডায়ালগ সিরিজ ২০২৬’-এর অংশ। এতে সহযোগিতা করেছে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম। সংলাপে রাজনৈতিক দল, সরকারি ও বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সংস্থা এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সংলাপে ইউএইচসি ফোরামের সদস্যসচিব মো. আমিনুল হাসান ‘অ্যাডভান্সিং ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ: বাংলাদেশ হেলথ সেক্টর রিফর্ম রোডম্যাপ’ শীর্ষক প্রেজেন্টেশন দেন। তিনি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের গুরুত্বের কথা বলেন।
মো. আমিনুল হাসান থাইল্যান্ডের ইউনিভার্সাল কভারেজ স্কিমের কথা তুলে ধরে বলেন, ধারাবাহিক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে দেশটিতে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
মো. আমিনুল হাসান আরও বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে ইউএইচসি সার্ভিস কভারেজ ইনডেক্সে কমপক্ষে ৮০-এ উন্নীত করতে হবে। এই সূচকের বৈশ্বিক গড় ৭১, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান মাত্র ৫৪। দৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার শুরু করলে জিডিপি ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব জাহিরুল ইসলাম শাকিল স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা বারবার বলি স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে, কিন্তু বাস্তবে অনেক মানুষ এখনো উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়েও সেবা পাচ্ছেন না। স্পষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন বাস্তবায়িত হয়নি।’
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে এম ওয়ালিউল্লাহ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারে দলমত–নির্বিশেষে সহযোগিতা ও আইনি সংস্কার প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এখানে আমরা একে অপরের প্রতিপক্ষ নই। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, পেশাজীবী হিসেবে সবাইকে গঠনমূলক সমালোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে এগিয়ে আসতে হবে।’
স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান, চিকিৎসা ও শিক্ষা প্রসঙ্গে বিএনপির পরিবারকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক মহসিন জিল্লুর করিম ভুল রোগ নির্ণয়ের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ভুল চিকিৎসা দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সমস্যার উৎসে হস্তক্ষেপ জরুরি এবং এমন চিকিৎসক তৈরি করতে হবে, যাঁরা রোগীর সঙ্গে অন্যায় করবেন না।
জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বাংলাদেশ পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ উমর খৈয়াম বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো অতিমাত্রায় চিকিৎসাকেন্দ্রিক। প্রতিরোধ, উন্নয়ন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—এই চার দিক সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ স্বাস্থ্য খাতে দলীয় রাজনীতির প্রভাব কমিয়ে ধারাবাহিক নীতিগত অগ্রগতির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।