
সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার প্রথম আলো ভবনে চলছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে এই শিল্প-আয়োজনে দর্শনার্থীরা দেখছেন পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই, নথিপত্র ইত্যাদি।
প্রদর্শনীর ১১তম দিনে এসেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজের প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক প্রদর্শনীটি দেখেন।
বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নওশীন জাহান বলেন, ‘মব কালচারকে অ্যাপ্রিশিয়েট করার কিছু নেই। একে অবশ্যই দমন করতে হবে এবং এটাকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নুসরাত হোসেন ইমা বলেন, ‘এই ঘটনা যাঁরা ঘটিয়েছেন আমি তাঁদের বলব, আপনারা অন্যের মতামতের প্রতি আরও সহনশীল হন। পৃথিবীর সবকিছু আপনার মতো করে পরিচালিত হবে, এটি ভুল ধারণা। আমাদের উচিত অন্যের আদর্শকে সম্মান করা।’
৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জারীন তাসনীম লাবীবা বলেন, ‘একবিংশ শতাব্দীতে এসে সংবাদপত্রের প্রতি মানুষের যে ক্ষোভ সেটি মেনে নেওয়া যায় না। প্রথম আলো অতীতে যেভাবে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা করে গেছে, আশা করি ভবিষ্যতেও আরও নব উদ্যমে সাংবাদিকতা করে যাবে, সেটাই প্রত্যাশা করি।’
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষক আশফাক উল মুশফিক জানান, দুটি কোর্সের শিখন–পঠনের অংশ হিসেবে ১৫ জন শিক্ষার্থীকে তিনি নিয়ে এসেছেন।
আশফাক উল মুশফিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণমাধ্যম ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবে, কিন্তু কোনো বিশেষ অংশের পক্ষে না থাকলে নিরপেক্ষ না—এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে হামলা করা কোনোভাবেই কাম্য না।’ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও জানান এই শিক্ষক।
প্রথম আলোয় হামলার ফলে সেই রাতে প্রথম আলোর অনলাইনের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম আলোর ২৬ বছরের প্রকাশনার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১৯ ডিসেম্বর ছাপা পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ থাকে। তবে এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যেও প্রথম আলো ঘুরে দাঁড়ায়। মাত্র ১৭ ঘণ্টার মধ্যে আবার অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ ডিসেম্বর সকালে সারা দেশের পাঠকেরা ছাপা পত্রিকা হাতে পেয়ে যান।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সবকিছু সবার মতের সঙ্গে মিলবে না বলে মনে করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষার্থী রাইন ফারিহান। প্রদর্শনী দেখতে এসে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সে জন্য কোনো ধরনের হামলা, আঘাত কিংবা আক্রান্ত করা কোনোভাবেই মানা যাবে না। আর এভাবে হামলা করে প্রথম আলোর পথচলাকে ধ্বংস করা যাবে না।’
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ৩০ জনের একটি দল গতকাল এসেছিল প্রদর্শনী দেখতে। এই বিভাগের শিক্ষার্থী তৃষ্ণা রাণী শীল বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত জিনিসগুলোকে প্রথম আলো যেভাবে শৈল্পিকভাবে তুলে ধরেছে, সেটি সত্যিই প্রশংসনীয়।’
কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের প্রভাষক অর্থী নবনীতা প্রদর্শনী নিয়ে বলেন, ‘এখানে যেমন পোড়ার গন্ধ আছে, কষ্টের আবহ আছে, একই সাথে একটা প্রতিবাদের ভাষাও আছে, যেটি আমাদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষিত করেছে।’
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম, মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল কাবিল খান বলেন, প্রথম আলোকে আরও আপসহীনভাবে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ, গণমাধ্যম ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র হবে ব্যর্থ।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ডিপার্টমেন্ট অব মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনের শিক্ষার্থী ইফরিয়াত রহমান বলেন, ‘প্রথম আলোর ভেতরে যে অবস্থা দেখলাম, তা বাইরে থেকে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। যারা এ কাজ করেছে, তাদের বিচার হওয়া দরকার।’
প্রথম আলোর পুড়িয়ে দেওয়া ভবন ঘিরে শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের তৈরি করা ‘আলো’ শীর্ষক এই প্রদর্শনী শুরু হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অগ্নিদগ্ধ ভবনটিতে প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। ২ মার্চ পর্যন্ত এই প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।