মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্র হাতে সম্মুখযুদ্ধে এগিয়ে চলেছেন দিনাজপুরের হিলি অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা
মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্র হাতে সম্মুখযুদ্ধে এগিয়ে চলেছেন দিনাজপুরের হিলি অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা

স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা বদলেছে পাঁচবার

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, দেশে বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৯৮ হাজার।

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত পাঁচবার মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা বদলেছে। সর্বশেষ গত বছরের জুন মাসে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়। ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’—অন্তর্বর্তী সরকারের করা এই সংজ্ঞাও বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে এখন আবার আলোচনা শুরু হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনার পর অন্তর্বর্তী সরকার আরও ৯ মাস ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, শ্রেণিবিভাজন করার কাজটি তেমন এগোয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই–বাছাইয়ের কাজটি করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)। নতুন সংজ্ঞার আলোকে জামুকা গত ৯ মাসে ৪০ জনকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ করার সুপারিশ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, দেশে বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৯৮ হাজার। নতুন সংজ্ঞায় কে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’, আর কে ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’, সে জন্য পুরো তালিকা যাচাই–বাছাই করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের তিনজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা বলেন, নতুন সংজ্ঞা মেনে শ্রেণিবিভাজন করা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ হবে। তা ছাড়া এই সংজ্ঞা নিয়েও বিতর্ক আছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সংজ্ঞা বহাল থাকবে কি না, সে বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন তাঁরা। সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সে অনুযায়ী তাঁরা কাজ শুরু করবেন। 

► ১৯৭২ সালের ৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়।  ► মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ২০১৮ সালে, এরপর ২০২৫ সালে।

এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে ১৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সঙ্গে তাঁর দপ্তরে গিয়ে কথা বলেছে প্রথম আলো। তিনি বলেন, সবকিছু ভালোভাবে জেনে তারপর এসব বিষয়ে কথা বলবেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশ ‘দ্য বাংলাদেশ (ফ্রিডম ফাইটারস) ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অর্ডার, ১৯৭২’ এর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। এরপর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ২০১৮ ও ২০২৫ সালে। এ ছাড়া ১৯৮০ ও ২০২২ সালে সামান্য পরিবর্তন হয়। 

বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে ১৯৭২ সালের আদেশে বলা হয়, ‘ফ্রিডম ফাইটার মিনস অ্যানি পারসন হু হ্যাড সার্ভড অ্যাজ আ মেম্বার অব অ্যানি ফোর্স এনগেজড ইন দ্য ওয়ার অব লিবারেশন।’ অর্থাৎ যিনি মুক্তিযুদ্ধে যেকোনো একটি বাহিনীর সদস্য হিসেবে যুদ্ধ করেছেন, তিনিই মুক্তিযোদ্ধা। 

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৯৭২ সালের আদেশ ১৯৮০ সালে সামান্য সংশোধন করা হয়। তবে ওই সংশোধনী ছিল মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সম্মানী বা ভাতা কারা পাবেন না সে বিষয়ে। 

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনে সংশোধনী আনে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞাতেও পরিবর্তন আসে। এ–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি হয় ২০২৫ সালের ৩ জুন।

সংজ্ঞায় বড় পরিবর্তন আসে ২০১৮ সালে

২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ সরকার ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট’ আইনে মুক্তিযোদ্ধার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। এই সংজ্ঞার পরিধি বিস্তৃত। এতে বলা হয়, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে যাঁরা দেশের অভ্যন্তরে গ্রামে-গঞ্জে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ নেন, তাঁরাও মুক্তিযোদ্ধা বলে বিবেচিত হবেন। এর পাশাপাশি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর বিরুদ্ধে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন, এমন সব বেসামরিক নাগরিকেরাও মুক্তিযোদ্ধা। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনী, মুজিব বাহিনী, মুক্তিবাহিনী ও অন্যান্য স্বীকৃত বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, ইপিআর নৌ কমান্ডো, কিলো ফ্লাইট আনসার বাহিনীর সদস্যরাও মুক্তিযোদ্ধা।

২০১৮ সালের সংজ্ঞায় মুক্তিযুদ্ধের সময় যাঁদের বয়স সরকার নির্ধারিত বয়সসীমার মধ্যে ছিল, তাঁরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হন। এই সংজ্ঞায় আরও বলা হয়, যেসব ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন, যেসব বাংলাদেশি পেশাজীবী মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে অবস্থানকালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন এবং যেসব বাংলাদেশি নাগরিক বিশ্বজনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধকালীন গঠিত বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) অধীন কর্মকর্তা বা কর্মচারী বা দূত হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাঁরাও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হবেন।

এই সংজ্ঞায় আরও বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) সঙ্গে সম্পৃক্ত সব এমএনএ (জাতীয় পরিষদের সদস্য) বা এমপিএ (প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য), যাঁরা পরবর্তী সময়ে গণপরিষদের সদস্য হিসেবে গণ্য হয়েছিলেন; তাঁরাও মুক্তিযোদ্ধা বলে বিবেচিত হবেন। এতে আরও বলা হয়, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে নির্যাতিত সব নারী (বীরাঙ্গনা) মুক্তিযোদ্ধা হবেন। এ ছাড়া স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের সব শিল্পী ও কলাকুশলী এবং দেশ ও দেশের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশি সাংবাদিক; স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সব খেলোয়াড়; এবং মুক্তিযুদ্ধকালে আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া মেডিকেল টিমের সব ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসা সহকারীরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হবেন।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০২২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর নতুন একটি আইন করে। এর নাম দেওয়া হয় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন ২০২২। কেন নতুন আইন করা প্রয়োজন হলো তার ব্যাখ্যায় বলা হয়, জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সমুন্নত রাখতে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গঠন করার স্বপ্ন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই ব্যাখ্যা ২০১৮ সালের আইনে ছিল না।

মুক্তিযোদ্ধার নতুন সংজ্ঞায় ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে’ এই লাইনটি বাদ দেওয়া হয়, যা এর আগের (২০২২ সালের সংজ্ঞায়) সংজ্ঞায় ছিল। 

নতুন সংজ্ঞায় ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনে সংশোধনী আনে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞাতেও পরিবর্তন আসে। এ–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি হয় ২০২৫ সালের ৩ জুন।

মুক্তিযোদ্ধার নতুন সংজ্ঞায় ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে’ এই লাইনটি বাদ দেওয়া হয়, যা এর আগের (২০২২ সালের সংজ্ঞায়) সংজ্ঞায় ছিল। 

নতুন সংজ্ঞায় বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যাঁরা দেশের ভেতরে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং যেসব ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন, এরূপ সব বেসামরিক নাগরিক (ওই সময়ে যাঁদের বয়স সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে ছিল) তাঁরা বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন। এর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), পুলিশ বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) ও সেই সরকার স্বীকৃত অন্যান্য বাহিনী, নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স, আনসার সদস্যরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন।

এর পাশাপাশি হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে নির্যাতিত সব নারী (বীরাঙ্গনা) মুক্তিযোদ্ধা হবেন। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালে আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া ফিল্ড হাসপাতালের সব ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসা সহকারীও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হবেন।

নতুন এই সংজ্ঞায় প্রথমবারের মতো ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যাঁরা দেশের ভেতরে বা প্রবাসে অবস্থান করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করতে সংগঠকের ভূমিকা পালন, বিশ্বজনমত গঠন, কূটনৈতিক সমর্থন অর্জন এবং মনস্তাত্ত্বিক শক্তি অর্জনে বাংলাদেশের যেসব নাগরিক প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করেছিলেন, তাঁরা হবেন ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’।

কারা হবেন ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ এ জন্য পাঁচটি শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত, যেসব বাংলাদেশি পেশাজীবী মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে অবস্থানকালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন এবং বাংলাদেশের যেসব নাগরিক বিশ্বজনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, যেসব ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) অধীন কর্মকর্তা বা কর্মচারী বা দূত, মুজিবনগর সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তৃতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) সঙ্গে সম্পৃক্ত সব এমএনএ বা এমপিএ, যাঁরা পরবর্তী সময়ে গণপরিষদের সদস্য হিসেবে গণ্য হয়েছিলেন। চতুর্থত, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের সব শিল্পী ও কলাকুশলী এবং দেশ ও দেশের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে দায়িত্ব পালনকারী সব বাংলাদেশি সাংবাদিক। পঞ্চমত, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।

বিভিন্ন সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের যে তালিকা করেছে, সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে। এতে কিছু মানুষ সুবিধা পেয়েছে। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করার প্রবণতা থেকে কোনো সরকার বের হতে পারেনি। এতে দেশের কোনো লাভ হয়নি। দেশের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও কোনো লাভ হয়নি।
আফসান চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক

বয়স কমানো নিয়ে বিতর্ক

বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যেকোনো আবেদনকারীর বয়স ১৯৭১ সালে ন্যূনতম ১৫ বছর হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে আবেদনকারীদের বয়সসীমা দুই দফায় কমিয়েছে। 

২০১৪ সালের জুনে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বীর মুক্তিযোদ্ধার ন্যূনতম বয়সসীমা ১৩ বছর নির্ধারণ করা হয়। এ–সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয় ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর। এতে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে ন্যূনতম ১৩ বছর হতে হবে। এরপর ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি এটি সংশোধন করে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ন্যূনতম বয়স হতে হবে ১২ বছর ৬ মাস।

বয়স কমানোর সুযোগ দেওয়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় এমন অনেকের নাম যুক্ত হয়, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীসহ অনেকে এই সুযোগ নিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক আফসান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা পরিবর্তন করেছে, এই কাজ আওয়ামী লীগ সরকার করেছে, হয়তো সামনেও হবে। বিভিন্ন সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের যে তালিকা করেছে, সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে। এতে কিছু মানুষ সুবিধা পেয়েছে। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করার প্রবণতা থেকে কোনো সরকার বের হতে পারেনি। এতে দেশের কোনো লাভ হয়নি। দেশের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও কোনো লাভ হয়নি।