
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৫-সহ সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশসমূহ সংসদে আইনে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় যদি পরিবর্তিত হয়ে ক্ষমতা খর্ব করা হয়, তাহলে কমিশন আবারও আগের মতো দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। ফলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও প্রতিকার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই অধ্যাদেশ দুটির ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখে আইনে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
বৃহস্পতিবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) সম্মেলনকক্ষে এ কমিশনের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা থেকে এ আহ্বান জানানো হয়। পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সভায় ভুক্তভোগীরা তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে যে ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, তা কমিশনের সামনে উপস্থাপন করেন। তাঁরা বলেন, পূর্ববর্তী সময়ে আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও কার্যকর ক্ষমতার ঘাটতির কারণে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও প্রতিকার প্রদানে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান কমিশন ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারবে, এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁরা।
বিজ্ঞপ্তিতে বিভিন্ন সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। র্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৫ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করেছে। আমাদের মতো ভুক্তভোগীদের প্রতিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে এই অধ্যাদেশগুলো কমিশনকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিয়েছে। আমরা চাই অধ্যাদেশের আলোকে কমিশনকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তা অক্ষুণ্ণ থাকুক এবং ওই অধ্যাদেশসমূহ কোনো পরিবর্তন ছাড়া আইনে পরিণত হোক।’
গুমের শিকার এক ভুক্তভোগীর ছেলে জাহিদকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘বর্তমান কমিশনাররা অন্যান্য পদে থাকাকালে মানবাধিকারকর্মী হিসেবে তাঁদের কাজ দেখার সুযোগ আমাদের হয়েছে। তাই তাঁদের ওপর আমাদের আস্থা আছে।’
সভায় কমিশনের চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বর্তমান কমিশন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগীদের পক্ষে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভুক্তভোগীদের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশসমূহ অক্ষুণ্ণ রেখে তা দ্রুত আইনে পরিণত হবে।
সভায় কমিশনার মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট হবে না এবং ন্যায়সংগতভাবে কাজ করবে। কমিশনার মো. নূর খান বলেন, মানবাধিকারের ধারণা বিস্তৃত—একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবার ও সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কমিশন ভুক্তভোগীদের পাশে থাকবে এবং কোনো চাপের কাছে মাথা নত করবে না।
কমিশনার ইলিরা দেওয়ান বলেন, বর্তমান অধ্যাদেশের আলোকে কমিশন তার আইনি ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করবে। কমিশনার নাবিলা ইদ্রিস বলেন, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশসমূহ কীভাবে আইনে পরিণত হবে, অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকবে কি না, এ বিষয়ে তারা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।
মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে অংশ নেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন, অধিকারের সাজ্জাদ হোসেন, পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর মৃত্যুর শিকার জনির ভাই রকি, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর শিকার ফারুকের স্ত্রী, জুলাই অভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ীতে মাথায় গুলিবিদ্ধ কাজল মিয়া, গণপিটুনিতে হত্যার শিকার দিপু দাসের পরিবার এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনেরা। সভায় গুমের শিকার অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমানও বক্তব্য দেন।