প্রথম আলো ফ্যাক্ট চেক

বন্যায় গর্ভবতী নারীর গাছে ওঠার খবরটি ভুয়া, বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এমন আরও ভিডিও-ছবি

টানা ভারী বর্ষণের সঙ্গে পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা এখন বন্যাকবলিত। এই দুর্যোগ নিয়ে উদ্বেগের প্রকাশ ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। তার মধ্যেই একের পর এক বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে।

গর্ভবতী নারী গাছে আশ্রয় নিয়েছেন, বন্যার পানিতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে কিংবা পানিতে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা—এমন আবেগঘন দাবিতে ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিও ও ছবির সত্যতা যাচাই করে দেখা গেছে, বেশির ভাগই পুরোনো, ভিন্ন স্থানের অথবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি।

চট্টগ্রামের বন্যাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরোনো ভিডিও, ভিন্ন স্থানের দৃশ্য কিংবা এআই-তৈরি ছবি ব্যবহার করে আবেগনির্ভর বার্তা তৈরি করা হয়েছে। এগুলোয় সময় বা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রের কোনো উল্লেখ নেই।

গর্ভবতী নারী গাছে আশ্রয় নিয়েছেন—দাবিটি ভুয়া

ফেসবুকে একটি ছবি ও ভিডিও ছড়িয়েছে, যেখানে পানির ওপর একটি গাছের ডালে শুয়ে থাকা এক নারীকে দেখা যায়। ক্যাপশনে দাবি করা হয়, চট্টগ্রামের চলমান বন্যায় গর্ভে ৯ মাসের সন্তান নিয়ে নিজের ও অনাগত সন্তানের জীবন বাঁচাতে তিনি গাছের ডালে আশ্রয় নিয়েছেন।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক

অনুসন্ধানে দেখা যায়, একই ভিডিও ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকেই ভিন্ন ক্যাপশনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। পরবর্তী সময় Joynal Anjana Vlogs নামের একটি ফেসবুক পেজে মূল ভিডিওটি পাওয়া যায়। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ভিডিওটি সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের।

লিংক: এখানে

চট্টগ্রামে চলতি বছরের বন্যা পরিস্থিতি শুরু হয় জুলাইয়ের শুরুতে। ফলে ভাইরাল ভিডিওটি এই বন্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার সুযোগ নেই।

ভিডিওতে থাকা ওই নারী নিজেই ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, ঘটনাটি টাঙ্গুয়ার হাওরের।

লিংক: এখানে

এ ছাড়া কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে চট্টগ্রামের বন্যায় এমন কোনো গর্ভবতী নারীর গাছে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার দাবিতে ফেনীর পুরোনো ভিডিও

বন্যার মধ্যে আরেকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়, চট্টগ্রামে বন্যার কারণে লাশ দাফন করা সম্ভব না হওয়ায় পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

অনুসন্ধানে BitiK BaaZ নামের একটি ফেসবুক পেজে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যার শুরুতেই ভাইরাল হওয়া একই দৃশ্য রয়েছে।

লিংক: এখানে

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি ২০২৪ সালে ফেনীতে বন্যার সময় ধারণ করা ভিডিও।

অর্থাৎ পুরোনো সেই ঘটনার ভিডিওকে নতুন করে চট্টগ্রামের বন্যার দাবি করে প্রচার করা হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ফেনী, নোয়াখালীসহ দেশের ১১টি জেলা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছিল। সে সময় পানিতে ভাসমান মরদেহের একাধিক ভিডিও ও ছবি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।

চট্টগ্রামের এখনকার বন্যার সময় সাতকানিয়া উপজেলায় গত শুক্রবার এক ব্যক্তির লাশ ভেলায় তোলার একটি ঘটনা রয়েছে। ভেলায় ভাসিয়ে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে নিয়ে যাওয়া হয় লাশটি। এরপর একটি অটোরিকশায় করে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়।

লিংক: এখানে

সন্তানকে আগলে রাখার ভিডিওটিও পুরোনো

‘জলাবদ্ধতার মাঝে সন্তানকে বাবার আগলে রাখার চেষ্টা’—এমন শিরোনামে আরেকটি ভিডিও ছড়িয়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি গলাসমান পানির মধ্যে দুটি শিশুকে মাথার ওপর তুলে ধরে আছেন। ভিডিওজুড়ে করুণ আবহসংগীত ব্যবহার করে এটিকে চলমান বন্যার একটি মানবিক দৃশ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

অনুসন্ধানে ‘সার্ভেয়ার রুবেল খান’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট একই ভিডিও পাওয়া যায়। একই অ্যাকাউন্টে শিশুদের নিয়ে ধারণ করা একাধিক ভিডিও রয়েছে।

লিংক: এখানে

অর্থাৎ এটি চট্টগ্রামের বর্তমান বন্যার কোনো দৃশ্য নয়; বরং পুরোনো ভিডিও নতুন প্রেক্ষাপটে প্রচার করা হয়েছে।

বন্যার দৃশ্য দাবিতে এআই—তৈরি ছবি

চট্টগ্রামের বন্যার ভয়াবহতা দেখাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি স্থিরচিত্রও ছড়িয়ে পড়েছে।

একটি ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘আস্ত একটা শহর পানির নিচে। Keep Chittagong in your prayer।’

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

আরেকটি ছবির সঙ্গে লেখা হয়েছে, ‘আল্লাহ চট্টগ্রামকে হেফাজত করুন’।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

রিভার্স ইমেজ সার্চে এসব ছবির কোনো বাস্তব উৎস পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কিংবা জাতীয় কোনো সংবাদমাধ্যমেও এমন দৃশ্যের অস্তিত্ব মেলেনি।

বামে প্রচারিত ছবি। ডানে গুগলের SynthID প্রযুক্তির মাধ্যমে ছবিটির ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক বিশ্লেষণের ফলাফল, যেখানে Google AI-এর ওয়াটারমার্ক শনাক্ত হয়েছে

এরপর ছবিগুলো একাধিক এআই শনাক্তকারী টুলে পরীক্ষা করা হয়। বিশ্লেষণে ছবিগুলো ডিজিটালি সম্পাদিত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

অধিকতর যাচাইয়ে গুগলের সিন্থ আইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ছবির নির্দিষ্ট অংশে ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক শনাক্ত হয়। হিটম্যাপে নীল রঙে ডিটেকডেট ফলাফল পাওয়া যায়, যা গুগল এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি বা সম্পাদিত অংশের শক্তিশালী ইঙ্গিত দেয়।

বামে প্রচারিত ছবি। ডানে গুগলের SynthID প্রযুক্তির মাধ্যমে ছবিটির ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক বিশ্লেষণের ফলাফল, যেখানে Google AI-এর ওয়াটারমার্ক শনাক্ত হয়েছে

গুগলের সিন্থ আইডি একটি বিশেষায়িত প্রযুক্তি, যা গুগল এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ছবিতে সংযোজিত অদৃশ্য ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।