বইটি সম্পর্কে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান লেখক ওয়ালিউল ইসলাম।
বইটি সম্পর্কে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান লেখক ওয়ালিউল ইসলাম।

প্রকাশনা ও মোড়ক উন্মোচন

‘একাত্তরের ইতিকথা’ গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায়

বাঙালির জাতির পিতার প্রয়োজন ছিল না। জাতি হিসেবে বাঙালির পরিচয় হাজার বছরের বেশি কালের: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, পাকিস্তানের জাতির পিতার দরকার ছিল। কারণ, পাকিস্তানি বলে কোনো জাতিই ছিল না। সে জন্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে জাতির পিতা করা হয়েছিল। কিন্তু বাঙালির জাতির পিতার প্রয়োজন ছিল না। জাতি হিসেবে বাঙালির পরিচয় হাজার বছরের বেশি কালের। কাজেই শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ বলার যৌক্তিকতা ছিল না, বরং তাঁর ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিই যথেষ্ট সম্মানজনক ছিল।

আজ শনিবার বিকেলে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি (এসএমসি) মিলনায়তনে সাবেক সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউল ইসলামের লেখা একাত্তরের ইতিকথা বইয়ের প্রকাশনা ও মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এই মন্তব্য করেন। বইটি নিয়ে আলোচনায় তিনি বলেন, ইতিহাস ও ইতিকথার পার্থক্য রয়েছে। ইতিহাসে ঘটনার বিবরণ থাকে, আর ইতিকথায় থাকে গল্প। এই বইটির বৈশিষ্ট্য হলো, এতে মুক্তিযুদ্ধকালের ঘটনার বিবরণ আছে গল্প বলার ভঙ্গিতে। এ কারণে বইটি প্রশংসনীয় সাহিত্যিক মান অর্জন করেছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন, ‘বইটিতে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আছে। লেখক উপন্যাসের মতো করে মুক্তযুদ্ধের চরিত্রগুলো তুলে এনেছেন। এই মানুষগুলো আমাদের অনেকের চেনা। অনেকে বেঁচে আছেন, অনেকে নেই। মুক্তিযুদ্ধ এবং পরের অনেক ঘটনা এখনো অজানা। রাষ্ট্র, সমাজ, মানুষ সম্পর্কে তেমন অনেক অজানা ঘটনা লেখক অকপটে বর্ণনা করেছেন।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি অধ্যাপক আবুল কাশেম চৌধুরী বলেন, লেখক মুক্তিযুদ্ধকালে মাঠপর্যায়ে বেসামরিক প্রশাসনের ভূমিকা বইটিতে তুলে ধরেছেন। এতে রয়েছে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেসব বই প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে এই বই গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা শিরিন পারভীন হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধে শুধু গুটিকয় শিক্ষিত মানুষই অংশ নেননি। অনেক কৃষকের সন্তানেরাও অংশ নিয়েছেন। কিন্তু তাঁরা কোনো বই লেখেননি। বই লিখেছেন শিক্ষিতজনেরা। সে কারণে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত বেশি বই প্রকাশিত হবে, এই জনযুদ্ধ সম্পর্কে তত বেশি জানার সুযোগ সৃষ্টি হবে। মুক্তিযুদ্ধের ‘বীরাঙ্গনা’দের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের যুদ্ধ শেষ হয়নি। এখনো তাঁদের অনেকেই সরকারি ভাতাপ্রাপ্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এটি একটি ব্যতিক্রমী বই। লেখকের গভীর বিশ্লেষণ, তথ্য, তত্ত্ব ও অসাধারণ রসবোধ পাঠককে আগ্রহী করে তুলবে। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। যুদ্ধের জন্য একটি জাতি কীভাবে জেগে উঠেছিল, প্রশাসনিকভাবে কার কেমন ভূমিকা ছিল, আবার প্রশাসনে ভেতরের দ্বন্দ্ব–সংঘাত, কলকাতায় প্রবাসী সরকারের কার্যক্রম কেমন করে পরিচালিত হচ্ছিল, এসব অনেক বিষয় এতে আছে। যাঁর যা অবদান, লেখক তা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কারও প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে অসূয়া বাক্যের ব্যবহার করেননি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী । ছবিতে (বাঁ থেকে ) শিরিন পারভীন হক, ওয়ালিউল ইসলাম। (ডান থেকে) মফিদুল হক, মতিউর রহমান, মোহাম্মদ আলী ও আবুল কাশেম চৌধুরী । ১৮ এপ্রিল

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, লেখক ওয়ালিউল ইসলাম বইটিতে প্রচুর তথ্য, অনেক বইয়ের উদ্ধৃতি, অনেক মানুষের ভূমিকা, অনেক প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় সিএসপি অফিসার হিসেবে মাগুরা মহকুমা প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন। শুরুতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। পরে সরাসরি অংশ নেন। সেই দ্বিধার কথা তিনি অকপটে স্বীকারও করেছেন। এমন অনেক বিষয়েই তিনি নিরাসক্তভাবে আত্মসমালোচনা করেছেন।

মতিউর রহমান বলেন, ‘লেখক দেখিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কীভাবে রাজনীতির ভেতরে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছিল। মুজিব বাহিনীসহ একটি অংশ প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে মেনে নিতে পারেনি। এই বিভেদ–বিরোধ স্বাধীনতার পরেও চলমান ছিল। তাজউদ্দীন আহমদকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছিল। আসলে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই দেশে রাজনীতির ভেতরে, রাজনীতির সঙ্গে সেনাবাহিনীর, সেনাবাহিনীর নিজেদের ভেতরে নিজেদের, আবার বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সেনাবাহিনীর নানা রকম দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। এই দ্বন্দ্ব–সংঘাতের জের হিসেবে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটে। তারপরও এই দ্বন্দ্ব–সংঘাতের অবসান ঘটেনি। তিনি বলেন, ‘এত দ্বন্দ্ব–সংঘাত, বিভেদের ভেতর দিয়ে আমরা কত দূর পর্যন্ত যেতে পারব, সেই অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে।’

সাবেক সচিব মোহাম্মদ আলী বলেন, এটি একটি অত্যন্ত তথ্যবহুল বই। ওয়ালিউল ইসলাম দীর্ঘদিন প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে দেশের ভেতরে ও কলকাতায় প্রবাসী সরকারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বইটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক খায়রুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রায় প্রত্যেক জেনারেল ও আমলা তাঁদের অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখেছেন। সেই বইগুলোতে প্রধানতই ‘আমি করেছি’, ‘আমি করেছিলাম’ এভাবেই নিজের কৃতিত্বকে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু ওয়ালিউল ইসলাম নিজেকে প্রচ্ছন্ন রেখেছেন। তাঁর ভাষা, ‘আমি কী দেখেছি’ এমন। তাঁর এই নিরাসক্ত বর্ণনা বইটিকে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

বইটি সম্পর্কে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে লেখক ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, ‘আমি যা জেনেছি, তা যদি পরের প্রজন্মের কাছে জানিয়ে যেতে না পারি, তবে তা হারিয়ে যাবে। এই ভাবনা থেকেই বইটি লেখা। লেখক হিসেবে বিশেষ কোনো বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করিনি। যা দেখেছি, যা সত্য বলে মনে করেছি তুলে ধরেছি। তবে আমার বিবেচনায় যা সত্য, তা হয়তো অনেকের কাছে সত্য না–ও মনে হতে পারে।’

বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজক এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তসলিম উদ্দিন খান বলেন, ওয়ালিউল ইসলাম এসএমসির চেয়ারম্যান ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন বইটিতে প্রতিফলিত হয়েছে।

একাত্তরের ইতিকথা বইটি প্রকাশ করেছে মাওলা ব্রাদার্স। অনুষ্ঠানে মাওলা ব্রাদার্সের পক্ষে বক্তব্য দেন শাহরিন হক। সঞ্চালনা করেন ডা. তেহারীন ও হোসনে আরা।