বুয়েটের নকশা করা ব্যাটারিচালিত রিকশা
বুয়েটের নকশা করা ব্যাটারিচালিত রিকশা

প্রথম আলোর এক্সপ্লেইনার

ই-রিকশার নিবন্ধন কীভাবে, কারা পাবেন, আয় কেমন হতে পারে

বিধিমালা প্রকাশের পর রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আজ মঙ্গলবার থেকে আবেদন ফরম বিক্রি করবে। ঢাকা উত্তর সিটিও নিবন্ধনপ্রক্রিয়া চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন বিধিমালা অনুসারে, একজন সর্বোচ্চ পাঁচটি ই–রিকশার নিবন্ধন নিতে পারবেন।

তবে আবেদন করার পরই কোনো ব্যক্তিকে নিবন্ধন দেওয়া হবে না। আবেদনকারীকে রিকশার ফিটেনস এবং কারিগরিভাবে ত্রুটিমুক্ত কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। আর কারিগরি মান ও নিরাপত্তার শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, সেই বিষয়ে সনদ দেবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

বর্তমানে ঢাকায় যেসব ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে, সেগুলোর মালিকানা দুই ধরনের। কিছু রিকশার চালক নিজেই মালিক। ফলে তিনি যা আয় করেন তা নিজেরই থাকছে। তবে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া এবং গ্যারেজে রাখার জন্য ভাড়া দিতে হয়। অন্যদিকে কিছুটা বিত্তশালী, রাজনৈতিকভাবে প্রভাব রয়েছে এমন ব্যক্তিদের অনেকের ৫০ কিংবা ১০০টি পর্যন্ত রিকশা আছে। রিকশা রাখার গ্যারেজ ও চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা মালিকেরা করে থাকেন। তাঁরা নির্দিষ্ট পরিমাণ দৈনিক ‘জমা’র ভিত্তিতে চালকদের রিকশা ভাড়া দেন।

সংশ্লিষ্ট চালক ও রিকশামালিকদের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে ঢাকায় মোটা চাকা, সাধারণ রিকশার চাকা, আকারে বড়–ছোট নানা ধরনের রিকশা চলাচল করে। একেকটা রিকশার জমা ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। এই জমা, ব্যাটারি চার্জ এবং গ্যারেজ ভাড়া বাদ দিয়ে দৈনিক এক থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন চালক। নতুন রিকশায় বিনিয়োগ বেশি। ফলে মালিকের জমাও বেশি হতে পারে। চালকের আয় নির্ভর করবে কোন এলাকায় চালাচ্ছে তার ওপর।

দেশে মোটরযানের নিবন্ধন দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। আর রিকশার নিবন্ধন দেবে সিটি করপোরেশন। বিআরটিএ, যাত্রী অধিকার সংগঠন, পুলিশ ও অন্যান্য অংশীজনের হিসাবে, দেশে ব্যাটারি ও যন্ত্রচালিত তিন চাকার অবৈধ যানবাহন এখন ৭০ লাখের বেশি। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে প্রায় ৫০ লাখ এবং ঢাকায় ২০ লাখের মতো।

ঢাকার রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশা

বড় শহরে এখন পায়ে চালিত রিকশার জায়গা নিয়েছে ব্যাটারি রিকশা। যাত্রীদের মধ্যেও এই রিকশার জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে।

এই রিকশা নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি দীর্ঘদিনের। স্থানীয় সরকার বিভাগের বিধিমালা প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ চেষ্টার প্রথম উদ্যোগ। নতুন ব্যবস্থায় রিকশার নিবন্ধন, চলাচলের শর্ত, কারিগরি দিক কী কী রয়েছে, তা জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ, এর সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরের বিপুল যাত্রী ও চালক–মালিকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

আবেদন কবে, কোথায়, কারা পাবেন

ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান কার্যালয় নগর ভবন ও সব আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে আজ মঙ্গলবার ১০০ টাকা দিয়ে রিকশার আবেদন ফরম সংগ্রহ করা যাবে। তবে ফরম বিক্রি অর্থ সেদিনই নিবন্ধন সনদ দেওয়া নয়। আবেদন ও বাহন যাচাইয়ের পর সনদ মিলবে।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাবিবুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা নিবন্ধনের ফরম ছাপাতে দিয়েছেন। কাল সকালে এ বিষয়ে বৈঠক হবে। এরপর রিকশা নিবন্ধনের ফরম কবে বিক্রি শুরু হবে, তা ঘোষণা করা হবে।

বিধিমালা অনুসারে, আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। বয়স হতে হবে অন্তত ১৮ বছর। কোনো ব্যক্তি উপযুক্ত আদালত অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা হলে করতে পারবেন না।

ঢাকার সড়কে বিভিন্ন ধরনের রিকশা

একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একজন সর্বোচ্চ পাঁচটি ই–রিকশার নিবন্ধন নিতে পারবেন। এই সীমা এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন মিলিয়ে। অর্থাৎ আলাদা সিটিতে আবেদন করে পাঁচটির বেশি রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে না। এক সিটিতে নিবন্ধিত রিকশা অন্য সিটিতে চলতে পারবে না।

নির্ধারিত ফরম পূরণ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, সদ্য তোলা দুই কপি সত্যায়িত পাসপোর্ট আকারের ছবি, নিবন্ধন ফি জমার রসিদ ও নির্ধারিত ছকে ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে।

কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র ও রিকশার কারিগরি মান যাচাই করবে। শর্ত পূরণ হলে আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেবে। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিল করার সুযোগ রয়েছে।

বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড, নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য ও অনুমোদিত নকশার শর্ত পূরণ করা ই–রিকশা নিবন্ধন পাবে। ফিটনেস সনদে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর লাগবে।

পুরোনো সব রিকশা বাতিল করে নতুন রিকশা কিনতেই হবে—বিধিমালায় এমন শর্ত নেই। বর্তমানে চলাচলরত রিকশাও অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পরিবর্তন করে প্রয়োজনীয় ফিটনেস সনদ নিয়ে নিবন্ধনের আওতায় আসতে পারবে। পরিবর্তনের পর মানদণ্ড পূরণ করছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে।

কোনো প্রতিষ্ঠান বুয়েটের নির্দেশনা মেনে রিকশা তৈরির দাবি করলেই সেটির নিবন্ধন নিশ্চিত হবে না। সংশ্লিষ্ট মডেলের অনুমোদন ও ফিটনেস পাওয়ার উপযোগিতা যাচাই করবে বুয়েট ও ট্রাফিক পুলিশ।

ঢাকা দক্ষিণের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেছেন, শুধু ফরম সংগ্রহ করলেই নিবন্ধন পাওয়া যাবে না। নির্ধারিত শর্ত, বুয়েটের কারিগরি মানদণ্ড ও যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ বাহনকেই সনদ দেওয়া হবে।

বুয়েট যন্ত্রকৌশল বিভাগের একটি দল ব্যাটারিচালিত রিকশার এমন নকশা তৈরি করেছে

ফি ও মেয়াদ কত

দুই যাত্রীর ই–রিকশার নিবন্ধন ফি ৮ হাজার টাকা, বার্ষিক নবায়ন ফি ৪ হাজার টাকা। চার যাত্রীর ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা ও বার্ষিক নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা। ফিটনেস সনদের ফি ১ হাজার টাকা।

বিধিমালায় নিবন্ধনের মেয়াদ পাঁচ বছর। অন্যদিকে রিকশার আয়ুষ্কাল ১২ বছর। নিবন্ধনের মেয়াদ ও বাহনের আয়ুষ্কাল আলাদা বিষয়। নিবন্ধনের মেয়াদ শেষে একই নম্বরে আরেকটি রিকশা নামানো যাবে। তবে আয়ুষ্কাল শেষ হলে নম্বরপ্লেটসহ নিবন্ধন বাতিল হবে। প্রতিটি নিবন্ধিত বাহনে কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বরপ্লেট থাকবে।

ঢাকার দুই সিটি আটটি অঞ্চলে ভাগ করার কথা বলেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এই সীমানা নির্ধারণের কাজটি করবে ট্রাফিক পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা। এক অঞ্চলের রিকশা অন্য অঞ্চলে চলতে পারবে না। প্রতিটি অঞ্চলের রিকশার রং হবে আলাদা।

ই–রিকশার সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যস্ত এলাকায় সীমা ১৫ কিলোমিটার। মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট করিডর ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সড়কে চলতে পারবে না।

চার্জিং স্টেশনের জন্যও নিবন্ধন নিতে হবে। এর জন্য লাগবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অনুমোদনহীন ব্যাটারি ব্যবহার ও বিপজ্জনকভাবে রিকশা চালালে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

মিরপুর ১০ নম্বরে প্রধান সড়কে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা

রিকশার মান ও দাম

বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের গবেষক দল রিকশার একটি নকশা করেছে। দেশে প্রচলিত ১২ ধরনের ব্যাটারিচালিত রিকশার নিরাপত্তা ত্রুটি পর্যালোচনা করে এতে ১৬টি বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়েছে।

নকশায় তিন চাকায় হাইড্রোলিক ডিস্ক ব্রেক ও বিকল্প পার্কিং ব্রেক রয়েছে। পেছনের যান দেখার আয়না, মোড় নেওয়ার সংকেতবাতি, ছাউনি, সামনের কাচ ও স্থায়ী হেডলাইটও রাখা হয়েছে।

অধ্যাপক এহসান গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, অন্তত এক ডজন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাদের রিকশার ‘টাইপ’ অনুমোদন নিয়েছে। আরও ১০ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহী। তাদের অনুমোদিত নকশায় রিকশা নামলে নিরাপত্তাঝুঁকি কমবে। বিধিমালা মেনে চলাচল করলে শৃঙ্খলাও আসবে।

বুয়েটের নির্দেশনা অনুযায়ী রিকশা নির্মাণে যুক্ত একাধিক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য মতে, একটি রিকশা তৈরিতে খরচ পড়বে দেড় লাখ টাকার মতো। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ব্যাটারি কেনার খরচ। বাজারে মানভেদে ব্যাটারির দাম ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

প্রাপ্ত বাজার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় বাণিজ্যিক নিবন্ধনযুক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশার দাম ১৮ থেকে ২২ লাখ টাকা। দুই পালায় দৈনিক জমা ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা। যদিও সরকার নির্ধারিত জমা ৯০০ টাকা। ফলে এই যানের চালকদের বিরুদ্ধে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

এখন দেখার বিষয় মালিক ও চালকেরা নিবন্ধন পাওয়ার পর বিধিমালা মেনে ই-রিকশা চালান কি না। আর বিধিমালা মেনে চলাচল নিশ্চিত করতে না পারলে সিএনজি অটোরিকশার মতো নতুন রিকশাতেও হয়তো দৌরাত্ম্য চলবে।