মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোয় অনিয়ম

আওয়ামী লীগের সাবেক এমপিদের ৫টিসহ ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল

মালয়েশিয়া শ্রমবাজার নিয়ে গঠিত চক্রে ঢুকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত আওয়ামী লীগের চার সাবেক সংসদ সদস্যের (এমপি) এজেন্সিসহ মোট ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার। আদালতে এসব এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ গৃহীত হওয়ায় গতকাল রোববার প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে লাইসেন্স প্রত্যাহারের কথা জানানো হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর লাইসেন্সের শর্ত অনুসারে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান আইন–২০১৩, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) আইন–২০২৩ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন ও বিধিবিধান মেনে চলার বাধ্যবাধকতা আছে। তবে লাইসেন্স বাতিল করা এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৬, ৪২০, ৩৮৫, ৩৮৬, ৪২৭ ও ৩৪ ধারায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল এবং তা গৃহীত হয়েছে। এ কারণে অভিবাসী আইন অনুসারে লাইসেন্সগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে।

বাতিল হওয়া এজেন্সির মধ্যে আছে আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ মুস্তাফা কামালের স্ত্রী ও মেয়ের মালিকানাধীন দুটি এজেন্সি অরবিটালস এন্টারপ্রাইজ ও অরবিটাল ইন্টারন্যাশনাল। ঢাকা-২০ আসনের সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদের আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল, ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেড এবং ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদউদ্দিন চৌধুরীর ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল।

এর মধ্যে আরও আছে জনশক্তি খাতের আলোচিত ব্যবসায়ী নূর আলীর ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেড এবং মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য রুহুল আমিন ওরফে স্বপনের ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, বিভিন্ন সময় এসব এজেন্সির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে কোনো কোনোটি কয়েক দশকের পুরোনো। লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে সেটি বাতিল করা হয়। আর গুরুতর অপরাধ করলে বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হলে লাইসেন্স প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে লাইসেন্স ফেরত পেতে চাইলে আইনি লড়াইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

আরও যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রত্যাহার করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মেসার্স শাহীন ট্রাভেলস, আরভিং এন্টারপ্রাইজ, হৃদয় ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল, জাহরাত ইন্টারন্যাশনাল, ৪ সাইট ইন্টারন্যাশনাল, বিনিময় ইন্টারন্যাশনাল, আকাশভ্রমণ লিমিটেড, কিউ কে কুইক এক্সপ্রেস লিমিটেড, ইউনাইটেড এক্সপোর্ট লিমিটেড, জিএমজি ট্রেডিং প্রাইভেট লিমিটেড, সাদিয়া ইন্টারন্যাশনাল, দ্য সুপার ইস্টার্ন লিমিটেড, এলিগ্যান্টস ওভারসিজ লিমিটেড, মিডওয়ে ওভারসিজ লিমিটেড, মদিনা ওভারসিজ, আল খামিস ইন্টারন্যাশনাল, নিউ এজ ইন্টারন্যাশনাল, দামাশি করপোরেশন লিমিটেড, গ্যালাক্সি করপোরেশন, সুলতান ওভারসিজ, প্রভাতী ইন্টারন্যাশনাল, মানিসপাওয়ার করপোরেশন, আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, আইএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, দরবার গ্লোবাল ওভারসিজ, নাতাশা ওভারসিজ, অপরাজিতা ওভারসিজ, স্ট্যানফোর্ড এমপ্লয়মেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড, জান্নাত ওভারসিজ, বিএম ট্রাভেলস, বিএনএস ওভারসিজ লিমিটেড, রুবেল বাংলাদেশ লিমিটেড, ট্রান্স এশিয়া ইন্টিগ্রেট সার্ভিসেস লিমিটেড, আল ফারাহ হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড কনসালট্যান্সি, ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল, থানেক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, জেজি আলফালাহ ম্যানেজমেন্ট, ইমপিরিয়াল রিসোর্সেস লিমিটেড, পি আর ওভারসিজ লিমিটেড, এমইএফ গ্লোবাল বাংলাদেশ লিমিটেড ও অনন্য অপূর্ব রিক্রুটিং এজেন্সি।

প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের জুলাইয়ে যখন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলে, তখন কর্মী পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হয় মালয়েশিয়া সরকারকে। তাদের কাছে ১ হাজার ৫২০টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠিয়েছিল প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মালয়েশিয়া চক্র হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে দেশের সব রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয় না। সুযোগটি পায় অল্পসংখ্যক এজেন্সি। শুরুতে চক্রের সদস্য ছিল ২৫টি এজেন্সি। পরে তিন ধাপে বেড়ে ১০০টি হয়। চক্রে নাম ঢোকাতে প্রতিটি এজেন্সির কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সাবেক সংসদ সদস্যদের এজেন্সির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতা, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর এবং এ খাতের নতুন অনেক প্রতিষ্ঠান বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠিয়েছে চক্রে ঢুকে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ খরচ ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু মালয়েশিয়া যেতে গড়ে একজন বাংলাদেশি কর্মী খরচ করেছেন ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। দেড় বছরে সাড়ে চার লাখের মতো কর্মী পাঠিয়ে ২৪ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে এ খাতে।

চক্রের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও অনিয়মের দায়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানো বন্ধ হয়ে যায় ২০২৪ সালের জুনে। অনুমোদিত কর্মীদের জন্য দেশটিতে যেতে সবশেষ সময় ছিল ওই বছরের ৩১ মে। এরপর থেকে কয়েক দফায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হলেও শ্রমবাজার চালু হয়নি।