সাবেক বিচারপতিদের ক্ষেত্রে সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর আগে নতুন করে আবার গোয়েন্দা ছাড়পত্র চাওয়া আইনসংগত নয় বলে এক রায়ে উল্লেখ করেছেন হাইকোর্ট। পূর্ণাঙ্গে রায়ে বলা হয়েছে, সাধারণ পাসপোর্টের জন্য নতুন করে গোয়েন্দা ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা অযৌক্তিক ও আইনগত এখতিয়ারবহির্ভূত।
কূটনৈতিক পাসপোর্ট প্রত্যাহার ও সমর্পণের ভিত্তিতে সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুটি স্মারকের বৈধতা নিয়ে করা এক রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায় দেন। ২৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি বুধবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট কূটনৈতিক পাসপোর্ট প্রত্যাহার ও সমর্পণের ভিত্তিতে সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে নির্দেশনাসংবলিত স্মারক জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ। তাতে বলা হয়, কূটনৈতিক পাসপোর্ট গ্রহণ করা ব্যক্তি, যাঁদের নিয়োগ বা কর্মকালের ইতি ঘটেছে, তাঁদের এবং তাঁদের স্পাউসদের (স্বামী বা স্ত্রী) কূটনৈতিক পাসপোর্ট অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। উল্লিখিত ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করবেন, তাঁদের অন্তত দুটি তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু করা যেতে পারে।
সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর বিষয়ে স্পষ্টীকরণ–সংক্রান্ত একটি স্মারক চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর ভাষ্য, বিগত সরকারের সময়, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের ২২ আগস্টের নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে।
নথিপত্র থেকে জানা যায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট এবং চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি জারি করা স্মারক দুটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগের প্রটোকল অফিসার ওই রিট করেন। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের অনুমতি সাপেক্ষে রিটটি করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল দেন। রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন।
রায়ে কূটনৈতিক পাসপোর্ট প্রত্যাহার ও সমর্পণের পর সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর আগে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রতিবেদন নেওয়ার বাধ্যতামূলক বিধান এবং বিগত সরকারের সময়, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে নিয়োগপ্রাপ্তদের ওপর তা প্রযোজ্য হওয়া–সংক্রান্ত স্মারক সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতিদের এবং তাঁদের স্পাউসের (স্বামী বা স্ত্রী) ক্ষেত্রে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনগতভাবে অকার্যকর ঘোষণা করা হয়।
আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম বেলায়েত হোসেন ও মোহাম্মদ হোসেন এবং আইনজীবী এম মাহমুদুল হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মুহাম্মদ আজমী।
জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই স্মারক দুটি চ্যালেঞ্জ করে রিটটি করা হয়। কারণ, কূটনৈতিক পাসপোর্ট প্রত্যাহার ও সমর্পণের পর অনেক সাবেক বিচারপতির সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন আটকে আছে। আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীসহ সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি ও তাদের স্পাউসদের (স্বামী বা স্ত্রী) আবার গোয়েন্দা যাচাই ছাড়াই সাধারণ পাসপোর্ট দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আপিল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী ২০২২ সালের ডিসেম্বরে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর কূটনৈতিক পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি তা সমর্পণ করেন। ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন তিনি। প্রদানের সম্ভাব্য তারিখ ছিল ১৩ নভেম্বর। তবে গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে সন্তোষজনক প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি কারণ দেখিয়ে তাঁর পাসপোর্ট প্রদান করা হয়নি বলে রিটে উল্লেখ করা হয়।
রিটে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা এবং তাঁদের স্পাউস (স্বামী বা স্ত্রী) ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকারী। বিচারপতিরা অবসর গ্রহণ করলে তাঁদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণ করতে হয়। এরপর সাবেক বিচারপতিরা সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। আগে এই ধরনের সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রতিবেদন নেওয়া শর্ত হিসেবে রাখা হতো না।
রায়ে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট সাবেক বিচারপতিদের ও তাঁদের স্পাউসদের (স্বামী বা স্ত্রী) সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর আগে নতুন করে গোয়েন্দা সংস্থার ছাড়পত্র নেওয়ার বাধ্যতামূলক শর্ত আরোপ যুক্তিসংগত নয়। কারণ, বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়েই তাঁদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। এরপর তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক তথ্য পাওয়া যায়নি কিংবা আইন অনুযায়ী পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অযোগ্যতাও তৈরি হয়নি। এ অবস্থায় আবার নতুন করে গোয়েন্দা ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা স্বেচ্ছাচারী, অযৌক্তিক ও আইনগত এখতিয়ারবহির্ভূত।