
নানামুখী আগ্রাসনে দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা গত ৫০ বছরে প্রান্তিকতার শেষ সীমানায় উপনীত হয়েছেন। অস্তিত্বসংকটে ফেলে দেওয়া হয়েছে তাঁদের। রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে নিগৃহীত, নিষ্পেষিত তাঁরা। প্রায় সব ক্ষেত্রেই বঞ্চনা-লাঞ্ছনার মধ্যে জীবন কাটাতে হচ্ছে তাঁদের, এটিই এখন বাস্তবতা।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্টজনদের আলোচনায় ঘুরেফিরে এসব কথাই উঠে এসেছে। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে শুরু হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা সমাজে নিগৃহীত, নিষ্পেষিত। বঞ্চনা–লাঞ্ছনার মধ্যে তাঁরা জীবন অতিবাহিত করছেন। পানি না পেয়েও আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন, এটাই বাস্তবতা।
আজ আমাদের জীবনের জন্য কোথায় যাব আমরা? কার কাছে যাব আমরা?সন্তু লারমা, সভাপতি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি
সন্তু লারমা বলেন, ‘আজ আমাদের জীবনের জন্য কোথায় যাব আমরা? কার কাছে যাব আমরা? আজ সেই বাস্তবতায় আমাদের রাজনৈতিক দিগ্দর্শন দিয়ে তা খুঁজে পেতে হবে। আদর্শগত দিককে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’
বক্তব্যের শুরুতে সন্তু লারমা সদ্য প্রয়াত রাজনীতিক পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে প্রয়োজন ছিল।
সংবিধান প্রণয়নের সময় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের স্বীকৃতি না দেওয়ার বিষয়টি জাতীয় জীবনের জন্য লজ্জার বলে মন্তব্য করেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, ‘জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় আমরা তাদের বাঙালি হয়ে যেতে বললাম। দীর্ঘ সময় ধরে সেই লজ্জা নিয়ে চলেছি।’ তিনি বলেন, এই সমস্যা সমাধানের সুযোগ এসেছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর। সেই প্রচেষ্টাও হয়েছিল। যখন সংবিধানে স্বীকৃতির প্রশ্ন এল, তখন হোঁচট খেতে হলো। বলা হলো, দেশে ‘আদিবাসী’ নেই।
দেশে এখন পর্যন্ত ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নাম সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে উল্লেখ করে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, আরও অনেক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নাম বাদ পড়েছে। রাষ্ট্র যে সুযোগ–সুবিধা দিচ্ছে, সেখান থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে।
সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী চাষাবাদের জন্য পানি পায় না উল্লেখ করে আদিবাসী ও সংখ্যালঘুবিষয়ক ককাসের আহ্বায়ক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করতে পারলে সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ হয়ে যাবে।
অভিনেতা মামুনুর রশীদ বলেন, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নামে লুণ্ঠন হয়। কোনো একটা ইস্যু পেলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি লুট হয় এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা চলে।
গত ৫০ বছরের ইতিহাস ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বঞ্চনার, অধিকার হরণের ও প্রান্তিকীকরণের ইতিহাস বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, নানামুখী আগ্রাসনে তাদের জীবন প্রান্তিকতার শেষ সীমানায় উপনীত হয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের অস্তিত্বসংকটে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থার অবসানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে দেশের প্রত্যেক মানুষের অধিকারের আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে হবে বলে মনে করেন ইফতেখারুজ্জামান।
দেশ ছেড়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মানুষদের চলে যাওয়া কোনো সমাধান নয় বলে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, এ দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে এখানে দাঁড়িয়ে থেকে লড়াই করতে হবে। যাঁরা ভিন্নভাবে ভাবেন, ক্ষমতার বাইরে গিয়ে ভাবেন, তাঁদের সব সময় নানা রকম চ্যালেঞ্জের মুখে থাকত হয়।
অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে দেশ অনেক দূর এগিয়ে গেলেও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সমানতালে এগিয়ে যেতে পারছে না বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং।
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সমস্যা দেশের সব মানুষের সমস্যার অংশ বলে মনে করেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কোনো সমস্যার সমাধান হবে না।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বেসরকারি সংগঠন নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির; হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথ; ঐক্য ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ তারেক; বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মেসবাহ কামাল, রোবায়েত ফেরদৌস, খায়রুল ইসলাম চৌধুরী; বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল; আদিবাসী ফোরামের সহসভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, অজয় এ মৃ প্রমুখ।
সম্মেলনে যে ১২ দফা দাবি তোলা হয়, সংবিধানে ‘আদিবাসীদের’ স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি তার অন্যতম। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকারের আইনগত স্বীকৃতি, সময়সূচিভিত্তিক রোডম্যাপ ঘোষণা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন অবিলম্বে কার্যকর করা। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পূর্বসম্মতি ছাড়া ইকোপার্ক, সামাজিক বনায়ন, ট্যুরিজম, ইপিজেড বা অন্য কোনো প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন না করা। এ ছাড়া সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন, জাতীয় সংসদসহ স্থানীয় সরকার পরিষদে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কোটা সংরক্ষণ করা উল্লেখযোগ্য।