সরকারের গুদামে সার আছে, সমস্যা বিতরণে

আগস্ট মাস দেশের প্রধান ধানের মৌসুম আমনের জমি প্রস্তুত করা ও চারা রোপণের সময়। চারা রোপণের পর কয়েক ধাপে কৃষককে জমিতে সার দিতে হয়। স্বাভাবিকভাবে এ সময় সারের চাহিদা বেশি থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকেরা তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন। কোথাও কোথাও বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা। তবে সরকারের নথিপত্র অনুযায়ী, চাহিদার বিপরীতে সারের মজুত ও বরাদ্দে কোনো ঘাটতি নেই।

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, ডিলারদের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হলেও তাঁরা সার উত্তোলন না করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ডিলাররা ঠিকমতো সার উত্তোলন ও বিতরণ করছেন কি না, তা তদারক করার দায়িত্ব উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকার-নির্ধারিত পরিবেশকেরা ভর্তুকির সার বাইরে কালোবাজারে বিক্রির কারণে সংকট দেখা দিচ্ছে। পরে খোলাবাজারে সেই সার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এক এলাকার সার অন্য এলাকায় পাচার করার অভিযোগে গত তিন দিনে রাজশাহীর ৪ উপজেলায় ৪ পরিবেশককে মোট ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগে যশোরে ২ আগস্ট ২ পরিবেশককে মোট সাড়ে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা আমাদের হাত-পা। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আমরা আমদানি, বরাদ্দ সঠিক পরিমাণে ও সঠিক সময়ে করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৃষি কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশ সংকট তৈরি করছে।
আহমেদ ফয়সল ইমাম, অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ), কৃষি মন্ত্রণালয়
সারের জন্য সরকার নির্ধারিত পরিবেশকের দোকানে কৃষকের ভিড়। সম্প্রতি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ইমামগঞ্জ এলাকায়

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি মাসে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জেলাভিত্তিক সার বরাদ্দের আদেশ জারি হয়। প্রতি জেলায় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে সার বরাদ্দ ও বীজ বিতরণ মনিটরিং কমিটি ডিলারভিত্তিক সার বরাদ্দের আদেশ জারি করে। এরপর ডিলার নির্ধারিত গোডাউন থেকে সার উত্তোলন করে থাকে। বরাদ্দ দেওয়া প্রতি মাসের সার সঠিক সময়ে উত্তোলন ও কতজন কৃষককে কতটুকু সার বিতরণ করা হচ্ছে, তা তদারকের দায়িত্ব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার।

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, ১০ হাজার ডিলার সারা দেশে সার বিতরণের সঙ্গে যুক্ত। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও মাঠপর্যায়ের গাফিলতির বিষয়টি উঠে এসেছে।

জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ) আহমেদ ফয়সল ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা আমাদের হাত-পা। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আমরা আমদানি, বরাদ্দ সঠিক পরিমাণে ও সঠিক সময়ে করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৃষি কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশ সংকট তৈরি করছে।’

এসব বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্তে যাঁরা দোষী সাব্যস্ত হচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ফয়সল ইমাম বলেন, গত শনিবার জেলা পর্যায়ের তিন উপপরিচালককে বদলি করা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যখন যেখানে গাফিলতি, অবহেলা ও যোগসাজশ পাওয়া যাচ্ছে, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কারণ দর্শানো, ব্যাখ্যা তলব, প্রত্যাহার ও ক্ষেত্রবিশেষে দায়ী কর্মকর্তাদের বরখাস্তও করা হচ্ছে।

আগস্টে গাজীপুরের জন্য ইউরিয়া সারের বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ হাজার ৮৭৬ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে সার বিতরণ হয়েছে মাত্র ৮০০ মেট্রিক টন। নরসিংদী জেলায় আগস্টে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৫৫৩ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে বিতরণ হয়েছে ৯১৯ মেট্রিক টন।

বরাদ্দ আছে, উত্তোলন কম

কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আগস্ট মাসের জেলাভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, জেলাভিত্তিক সারের পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকলেও উত্তোলন হয়েছে কোথাও বরাদ্দের অর্ধেক, কোথাও তার চেয়ে কম।

ঢাকা বিভাগের কয়েকটি জেলার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আগস্টে গাজীপুরের জন্য ইউরিয়া সারের বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ হাজার ৮৭৬ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে সার বিতরণ হয়েছে মাত্র ৮০০ মেট্রিক টন। নরসিংদী জেলায় আগস্টে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৫৫৩ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে বিতরণ হয়েছে ৯১৯ মেট্রিক টন।

আগস্টে ঢাকা বিভাগের ৮ জেলায় ইউরিয়া সারের বরাদ্দ ছিল ১৯ হাজার ৯১৮ হাজার মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে ৮ হাজার ৯৬৫ হাজার মেট্রিক টন। অন্যান্য বিভাগেও একই চিত্র দেখা গেছে। যেমন ময়মনসিংহ বিভাগের ৪ জেলায় ইউরিয়া সারের বরাদ্দ ছিল ৩১ হাজার ৪২৫ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে ৯ হাজার ৯৯২ মেট্রিক টন। সিলেট বিভাগের চার জেলার জন্য আগস্টে বরাদ্দ ৯ হাজার ৫৪১ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত ২ হাজার ৬৭৯ মেট্রিক টন সার উত্তোলন করেছেন ডিলাররা।

সারের খোঁজে জড়ো হয়েছেন কৃষকেরা। তাঁদের সার সরবরাহের আশ্বাস দিচ্ছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। গতকাল দুপুরে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ধলডাঙ্গা বাজারে
টিএসপি সারের উত্তোলনও একইভাবে বরাদ্দের তুলনায় কম দেখা গেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক সার সরবরাহ ও বিতরণের প্রতিবেদনে।

সারা দেশে আগস্টের জন্য ইউরিয়া সারের বরাদ্দ আছে ২ লাখ ৭৯ হাজার ৪১২ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬১২ টন।

গত রোববার কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারীতে ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম প্রথম আলোকে বলেছিলেন, কুড়িগ্রামে আগস্টে সারের বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার ৮৭৫ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত ডিলাররা সার তুলেছেন তিন ভাগের এক ভাগ। অন্যান্য সার যেমন ডিএপি, এমওপি ও টিএসপির ক্ষেত্রেও বরাদ্দের তুলনায় উত্তোলন অনেক কম বলে জানান তিনি।

টিএসপি সারের উত্তোলনও একইভাবে বরাদ্দের তুলনায় কম দেখা গেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক সার সরবরাহ ও বিতরণের প্রতিবেদনে। কুমিল্লা জেলায় আগস্টে টিএসপি সারের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৩২৭ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে ৪৯৮ মেট্রিক টন। কুমিল্লা বিভাগের তিন জেলার জন্য টিএসপির মোট বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৭৭২ মেট্রিক টন। কৃষক পর্যায়ে ২০ আগস্ট পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ১ হাজার ১৭১ মেট্রিক টন। খুলনার চার জেলায় টিএসপির বরাদ্দ ছিল আগস্টে ৪ হাজার ৩৩৭ মেট্রিক টন। বিতরণ করা হয়েছে ২০ আগস্ট পর্যন্ত ২ হাজার ৬৩৭ মেট্রিক টন।

বাংলাদেশে সারের সংকট প্রকৃত ঘাটতির কারণে নয়, বরং সরবরাহ-চেইনের ত্রুটির কারণে সৃষ্ট। ‎
অধ্যাপক ছাদেকা হক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগ

সারের মজুত কেমন

সরকারের দুটি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও সার আমদানি করা হয়। দুই সংস্থা হলো শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। বিসিআইসি ইউরিয়া সার ও বিএডিসি নন-ইউরিয়া (ডিএপি, এমওপি, টিএসপি) আমদানি করে থাকে।

বিএডিসির আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টে সারা দেশে টিএসপির চাহিদা ৬৯ হাজার মেট্রিক টন। আর মজুত আছে ৩ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন। ডিএপির চাহিদা আগস্টে ৮৯ হাজার মেট্রিক টন, মজুত আছে ৩ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন। এমওপির চাহিদা ৭৮ হাজার মেট্রিক টন, মজুত আছে ১ লাখ ৪৮ হাজার টন। ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা ২৬ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মজুত আছে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ছাদেকা হক প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে সারের সংকট প্রকৃত ঘাটতির কারণে নয়, বরং সরবরাহ-চেইনের ত্রুটির কারণে সৃষ্ট। ‎উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, রাজশাহী ও অন্যান্য এলাকায় দেখা যাচ্ছে, অনুমোদিত ডিলারের দোকানে সার নেই বলা হলেও পাশের খুচরা দোকানে বেশি দামে তা পাওয়া যাচ্ছে। সংকটের কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ডিলাররা নির্ধারিত সময়ে বরাদ্দ করা সার উত্তোলন না করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন, এক পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে একাধিক ডিলারশিপ নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন কেউ কেউ। নিয়ম ভাঙলেও ডিলারশিপের লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে না।

সার উত্তোলনের কঠোর সময়সীমা, ডিজিটাল রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, শাস্তির প্রকৃত প্রয়োগ, পূর্ববর্তী ডিলারশিপ অডিট, কৃষকদের জন্য সহজ অভিযোগ চ্যানেল এবং সাব-ডিলার বাতিলের বিকল্প হিসেবে বিকল্প বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।