
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছিল একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। কিন্তু যে পরিবারের প্রধান মানুষটি শহীদ হয়েছিলেন, সেই পরিবারের নারীদের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল এর পর থেকে। উপার্জনক্ষম একমাত্র মানুষটিকে হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে তাঁদের। অথচ সেই নারীদের জীবনসংগ্রামের কথা উপেক্ষিত, অনালোচিতই থেকে গেছে। প্রথমবারের মতো তাঁদের নিয়ে মাঠপর্যায়ের গবেষণা করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।
আজ শনিবার সকালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সেমিনার কক্ষে ‘মুক্তিযুদ্ধে পরিবার-প্রধানহারা নারীর জীবনসংগ্রাম: নারীর আত্মশক্তি ও ক্ষমতায়নের ভিন্ন প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এই গবেষণাপত্রে বিষয়টি উঠে এসেছে। এই গবেষণা করেছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গবেষণা ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপক রেজিনা বেগম। পরে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, শহীদ পরিবারের সন্তান অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা ও অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন।
গবেষণা তথ্য তুলে ধরে রেজিনা বেগম জানান, গবেষণার জন্য ২০২৩ সালে সারা দেশের ১৬ জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। এতে ১৩০ জন শহীদজায়ার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও বিত্তবান পরিবারের নারীরা ছিলেন। তাঁদের শিক্ষার স্তর ছিল নিরক্ষর থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত। তাঁদের একাধিক সন্তান ছিল, কেউ অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। সেই নারীরা তাঁদের কঠিন সংগ্রামের গল্পগুলো তুলে ধরেছেন।
গবেষক দেখিয়েছেন, শহীদজায়াদের এই সংগ্রামে তাঁদের জীবনে তিন প্রকারের উন্নতি ঘটেছে। প্রথমত, তাঁরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। ছেলেমেয়ের বিশেষত মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং পরিবারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছেন। তৃতীয়ত, তাঁরা আত্মশক্তি অর্জন করেছেন।
গবেষক জানান, মুক্তিযুদ্ধে পরিবারের প্রধান ও একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন, এমন সংখ্যা অনেক। এ বিষয়ে কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এই পরিবারের নারীরা কীভাবে তাঁদের সন্তানদের লালন–পালন করলেন, তাঁদের বর্তমান অবস্থা কেমন, এ বিষয়েও দেশে কোনো গবেষণা হয়নি। ফলে এ বিষয়ে তিনি কোথাও কোনো তথ্য–পরিসংখ্যান পাননি। তাঁর গবেষণার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি প্রান্তিক পরিবারগুলো নিয়ে কাজ করেছেন। তবে ১৩০টি পরিবার যথেষ্ট নয়। তিনি প্রাথমিকভাবে কাজটি শুরু করলেন। এ নিয়ে আরও ব্যাপক পরিসরে গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
এই গবেষণায় গবেষক দেখিয়েছেন, পরিবারের প্রধান ব্যক্তিকে হারানোর পর শহীদজায়ারা তাঁদের জীবনসংগ্রাম করতে গিয়ে সামাজিকভাবে কেমন সমস্যার মুখে পড়েছেন। যাঁদের সম্পদ ছিল না, তাঁরা ধান ভানা, মুড়িভাজা, নারকেলের ছোবড়ার দড়ি তৈরি করা, কাগজের ঠোঙা বা মিষ্টির বাক্স তৈরি করার মতো কাজ করেছেন। কেউ গৃহপরিচারিকার কাজ করেছেন। শিক্ষিতদের মধ্যে কেউ কেউ শিক্ষকতা বা অন্য চাকরি করেছেন। আবার যাঁদের জমিজমার মতো স্থাবর সম্পদ ছিল, তাঁদের অনেকেই পরিবারের নিকট আত্মীয়দের কাছে নিগৃহীত হয়েছেন। তাঁদের কারও কারও সম্পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সামাজিকভাবেও নানা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে সরকারিভাবে শহীদ পরিবারগুলোকে প্রথম দফায় দুই হাজার টাকা ও পরে এক হাজার টাকার যে অনুদান দেওয়া হয়েছিল, তা ছাড়া আর কোনো সাহায্য তাঁরা পাননি। কোনো কোনো পরিবার প্রথমবার অনুদান পেয়েছে, কোনো পরিবার অনুদানই পায়নি। এরপরও এসব শহীদজায়া তাঁদের সন্তানদের লালন–পালন করেছেন, শিক্ষিত করেছেন। অধিকাংশ পরিবারেই আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটেছে।
অন্যদিকে শহীদ পরিবারের সন্তানেরা সবাই বলেছেন, তাঁদের লালন–পালন ও সমাজে প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাঁদের মা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তার কোনো তুলনা নেই। কেউ কেউ বলেছেন, হয়তো তাঁদের বাবা থাকলে তাঁদের শিক্ষা বা পরিবারের অবস্থান আরও উন্নত হতে পারত। তবে সবাই বলেছেন, ‘মা তাঁদের জন্য যা করেছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
রেজিনা বেগম বলেন, এই মায়েরা তাঁদের কঠিন জীবনসংগ্রামের কোনো স্বীকৃতি পাননি। তাঁদের মূল্যায়নও করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে এঁরাই হলেন আমাদের ‘মহান জননী’।
স্বাগত বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারা যাকের বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধকে আমরা অনেকভাবে দেখতে পারি। পরিবার প্রধান শহীদ হওয়ার ঘটনা সেই পরিবারের জন্য খুব নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। তবে এর ভিন্ন এক ইতিবাচক দিকও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই পরিবারগুলো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। শহীদজায়ারা আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন। স্বাবলম্বী হয়েছেন।’
প্যানেল আলোচনায় শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরে চরম অবহেলিত, উপেক্ষিত, দৃষ্টির আড়ালে থাকা প্রান্তিক নারীদের কথা প্রথমবার এই গবেষণায় উঠে এসেছে। অনেক না জানা কথা, না দেখা দৃশ্য, ভুলে যাওয়া ঘটনা সামনে এল। গবেষক মাঠপর্যায়ের সংগ্রামী নারীদের জীবনসংগ্রামের কাহিনি শুনেছেন। এই গবেষণা কেবল তথ্য–উপাত্তের বিচার–বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর একটি গভীর মানবিক তাৎপর্য রয়েছে। শহীদজায়ারা অন্তত এত দিন পরে হলেও উপলব্ধি করেছেন, তাঁদের সংগ্রামের কথা শোনার কেউ আছে। তাঁদের কথা শোনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আরও ব্যাপক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, গবেষণাটি অভিজ্ঞতাভিত্তিক। তথ্য–উপাত্ত বা পরিসংখ্যানের চেয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, আবেগের মতো মানবিক মূল্যবোধের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকার এই শহীদজায়াদের কোনো স্বীকৃতি দেয়নি। ইতিমধ্যে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। অনেক পরিবারের শহীদজায়া মারা গেছেন। ফলে এখন শহীদজায়াদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে গবেষণার সুযোগও কমে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের জন্য এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা অত্যন্ত জরুরি। তিনি কাজটি শুরু করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও গবেষক রেজিনা বেগমকে ধন্যবাদ জানান।
অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমাদের এখানে প্রায় ৮ হাজার বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে নারীদের নিয়ে লেখা বই মাত্র ১২০টি। এর মধ্যে অনেকগুলোই আবার নারীদেরই লেখা এবং নারী মুক্তিযোদ্ধা বা বীরাঙ্গনা বা স্মৃতিচারণামূলক লেখা। শহীদজায়াদের নিয়ে, বিশেষত প্রান্তিক পর্যায়ে অনুসন্ধান করে গবেষণার কাজের কোনো দৃষ্টান্ত নেই।’ রেজিনা বেগম প্রথম শুরু করলেন বলে ধন্যবাদ পাবেন। তবে এই গবেষণার অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এগুলো কাটিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা করলে তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম।
ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বলেন, জাদুঘর সাধারণত ইতিহাসের উপাদান উপাত্ত সংগ্রহ করে রাখে। এই উপমহাদেশে দেখা গেছে, এসব উপাদান রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাস রচনার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সে কারণে প্রকৃত সত্য তুলে ধরার জন্য প্রয়োজন গবেষণা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহের পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগে গবেষণার তাগিদ অনুভব করেছে। সেই তাগিদ থেকেই শহীদজায়াদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে এই গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এ নিয়ে আরও ব্যাপকভিত্তিক গবেষণা করতে আগ্রহী বলে জানান তিনি।