আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে বিদায় নেওয়ার দিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে বিদায় নেওয়ার দিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

অনিয়মে ছিলেন তাজুল ইসলাম, অভিযোগ বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতার

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেসরকারি সেলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী মোহাম্মদ সম্রাট রোবায়েত। তাঁর অভিযোগ, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে রক্ষার চেষ্টা হয়েছিল। তাজুল ইসলাম এ মামলায় ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে দেননি।

ট্রাইব্যুনালের বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের কাছে এ অভিযোগ করেছেন সম্রাট রোবায়েত। তিনি ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে হওয়া মামলার অভিযোগকারী। এর আগে তিনি চট্টগ্রামের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সম্রাট রোবায়েত প্রথম আলোকে বলেন, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে গিয়ে আমিনুল ইসলামের কাছে এ অভিযোগ দিয়ে আসেন তিনি।

সম্রাট রোবায়েতের অভিযোগ, তাজুল ইসলাম এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম, মো.মিজানুল ইসলাম ও তারেক আবদুল্লাহ মিলে একটি চক্র গড়ে চিহ্নিত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চালান। তাজুল ইসলাম আসামি ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে দেননি।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে চট্টগ্রাম-৬ আসনে (রাউজান) আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী এখন কারাগারে আছেন। গতকাল সোমবার এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল, তবে তা হয়নি। আগামী ১২ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন ধার্য হয়েছে।

ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিন করিয়ে দেওয়ার জন্য এক কোটি টাকা চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তৎকালীন প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে ‘জামিনের জন্য এক কোটি টাকা চান প্রসিকিউটর’ শিরোনামে ১০ মার্চ প্রথম আলো ও নেত্র নিউজের যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। অনুসন্ধানে উঠে আসে, ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা চেয়েছিলেন সাইমুম রেজা তালুকদার।

রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী

প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠন করা হয়। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের উদ্যোগে গঠিত এই কমিটি ইতিমধ্যে দুটি বৈঠক করেছে। সাইমুম রেজা তালুকদার এরই মধ্যে প্রসিকিউটরের পদ ছেড়েছেন।

তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা সম্রাট রোবায়েতের করা অভিযোগের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রামের ওই মামলার বিষয়ে তাঁদের তদন্ত চলমান। তাই এ নিয়ে তাঁদের বেশি কিছু বলার সুযোগ নেই। যিনি অভিযোগ দিয়েছেন, কী অভিযোগ দিয়েছেন—এ সম্পর্কে এখন আপাতত তাঁরা কোনো কিছু প্রকাশ করতে পারবেন না। তাঁরা এটা নিয়ে কাজ করছেন, সার্বিক বিষয় নিয়েই কাজ করছেন—সব বিষয় তাঁদের কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসবে।

আমি এখন দায়িত্বে নেই, সুতরাং কোথায় কে অভিযোগ করছে, সে সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। তবে বুঝতে পারি, বিচারপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করার হীন উদ্দেশ্যে এ ধরনের ভিত্তিহীন, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা সুকৌশলে চালানো হচ্ছে।
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর

কী অভিযোগ সম্রাটের

চিফ প্রসিকিউটরের কাছে দেওয়া সম্রাট রোবায়েতের লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম, মো.মিজানুল ইসলাম ও তারেক আবদুল্লাহ মিলে একটি চক্র গড়ে চিহ্নিত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চালান।

তাতে বলা হয়, চট্টগ্রামের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের তদন্তে ৫৫ জনের বেশি সাক্ষী সরাসরি ফারাজ করিমের নাম বললেও বিশেষ আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে ফারাজের নাম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থেকে বাদ দেন তাজুল ইসলাম। পারিবারিক সম্পর্কের কারণে ফারাজের মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তাঁর।

ফারাজের মা রিজওয়ানা ইউসুফ সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর সাবেক স্ত্রী। ট্রাইব্যুনালের এই মামলায় সাবেক স্বামীর হয়ে লড়ছেন তিনি।

শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকা এবং আইজি প্রিজনের ভাষ্যমতে অসুস্থতা ‘সিজনাল’ হওয়ার পরও ফজলে করিমকে জামিন দেওয়ার ষড়যন্ত্র হয় বলেও অভিযোগ করেন সম্রাট রোবায়েত।

এ অভিযোগের বিষয়ে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এখন দায়িত্বে নেই, সুতরাং কোথায় কে অভিযোগ করছে, সে সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। তবে বুঝতে পারি, বিচারপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করার হীন উদ্দেশ্যে এ ধরনের ভিত্তিহীন, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা সুকৌশলে চালানো হচ্ছে।’

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করেছে এবং প্রাথমিক তদন্তে যাঁদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তদন্ত সংস্থা তাঁদেরকেই আসামি করেছে। কাউকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আসামি করা হয়নি এবং অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকে বাদ দেওয়াও হয়নি। তা ছাড়া চট্টগ্রামের মামলার তদন্ত রিপোর্ট এখন পর্যন্ত গৃহীত হয়নি বলে জানি—আমার সময়ে অধিকতর তদন্তের জন্য বিষয়টি বিবেচনাধীন ছিল বলে মনে করতে পারি।’

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জামিন পাইয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রসংক্রান্ত বক্তব্যটি একটি ভয়াবহ মিথ্যাচার। আমার সময় উল্লিখিত ব্যক্তির জামিনের কোনো দরখাস্তই করেনি বা কোর্টে শুনানির জন্য উপস্থাপিত হয়নি। অস্তিত্বহীন বিষয়ে কল্পিত অভিযোগ এনে হাইপ তুলে গণহত্যাকারীদের বিচার প্রশ্নবিদ্ধ করার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এসব মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যমূলক অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’

তদন্ত চলমান। তাই এ নিয়ে বেশি কিছু বলার সুযোগ নেই। সব বিষয় তাঁদের কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসবে।
আমিনুল ইসলাম, চিফ প্রসিকিউটর

চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে সৎ থেকেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন দাবি করে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই গণহত্যাসহ গুম ও অন্যান্য অপরাধের বিচারের প্রশ্নে আমি ছিলাম আপসহীন, যেটা গোটা জাতি জানে। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, দুর্নীতির ন্যূনতম কোনো প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবে না। শুধু অবান্তর ও মিথ্যা অভিযোগের ধুয়া তুলে জনমনে বিভ্রান্তি এবং সর্বোপরি গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রশ্নবিদ্ধ করার অসৎ উদ্দেশ্যে এসব মিডিয়া ট্রায়ালের অপচেষ্টা হচ্ছে। আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ধরনের হীন চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করছি।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ করেছিল তাজুল ইসলামকে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে এই পদে বসানো হয় আমিনুল ইসলামকে।

এর আগে তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিলেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। তাঁর অভিযোগ, ‘চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে’ টাকা আয়ের হাতিয়ার করেছিল তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ‘সিন্ডিকেট’। তবে তাজুল সেই অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন।

অন্যদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ

প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম ও মিজানুল ইসলামের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগে সম্রাট রোবায়েত বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি যে বৃহৎ অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তামিম ও মিজান যেকোনো মূল্যেই ফারাজ ও ফজলে করিমকে বাঁচানোর শপথ নিয়েছেন। এ ধরনের কলঙ্কজনক অধ্যায় ট্রাইব্যুনালের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধ্বংস করছে।’

অভিযোগ অস্বীকার করে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন আজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের মামলার সঙ্গে আমি প্রথম থেকেই জড়িত নই। এই মামলার ঘটনাস্থল বা আসামি সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।’

অভিযোগকারী সম্রাট রোবায়েতকে চেনেন না বলে দাবি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। চট্টগ্রামের এই মামলার সঙ্গে কখনো সংশ্লিষ্ট ছিলেন না জানিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভিযোগ করার অধিকার সবারই আছে। এটুকু বলতে পারি, আমার সঙ্গে কারও এ বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। এক পয়সাও অবৈধ ইনকাম আমি আমার জীবনে করিনি।’

প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহর বিষয়ে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিল করতে চাইলেও ‘এই চক্রটি’ বারবার সময়ক্ষেপণ করেছে। তদন্ত অফিসে এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ তাঁদের (সম্রাট রোবায়েতদের) সঙ্গে অত্যন্ত বাজে ব্যবহার করেন।

এ মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বলে জানান প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ। তবে সম্রাট রোবায়েতের সঙ্গে একবার দেখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তারেক আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৫ সালের শেষের দিকে একদিন সম্রাটসহ চার–পাঁচজন ট্রাইব্যুনালে আসেন। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের কনফারেন্সকক্ষে বসেন তাঁরা। সেখানে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও মো. সহিদুল ইসলাম সরদার এবং তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটর মুহাম্মদ শহীদুল্যাহ চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন।

তারেক আবদুল্লাহ বলেন, এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে সম্রাট বলছিলেন, ‘আমরা ১৫ জনের নামে ওয়ারেন্ট দিতে বলেছি, আপনারা ১৪ জনের নামে ওয়ারেন্ট দিলেন কেন?’ জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতে দেখে এই মামলার আগাগোড়া না জানলেও একপর্যায়ে তিনি (তারেক আবদুল্লাহ) বলেন, ট্রাইব্যুনাল কয়জনের নামে ওয়ারেন্ট (পরোয়ানা) দেবেন, তা তাঁদের বলে–কয়ে দেবেন না। কথাগুলো তিনি উচ্চ স্বরে বলেছিলেন, এর বাইরে তিনি কিছু জানেন না।