
বিশ্বে প্রতিবছর তিন লাখের বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। অথচ এই মৃত্যুর বেশির ভাগই প্রতিরোধযোগ্য। দীর্ঘদিন ধরে ডুবে মৃত্যু জনস্বাস্থ্যের অন্যতম অবহেলিত সমস্যা হিসেবে থেকে গেলেও এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘ এটিকে বৈশ্বিক অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে। সেই লক্ষ্যেই গত বছর (২০২৫) প্রকাশ করা হয়েছে একটি বৈশ্বিক কৌশলপত্র। যার লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টেকনিক্যাল অফিসার (ভায়োলেন্স অ্যান্ড ইনজুরি প্রিভেনশন) ড. ক্যারোলিন লুকাজিক বলেছেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ রোধে তাদের প্রতিষ্ঠান সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করবে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে এ কাজে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও দেওয়া হবে।
ডুবে মৃত্যুরোধে কার্যকর নীতি তৈরিতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা করতে একটি দলিল তুলে ধরবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সে জন্য ঘানার রাজধানী আক্রায় গতকাল বুধবার থেকে শুরু হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন।
এখানে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ঘানা, উগান্ডা ও ভিয়েতনামের বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত হয়েছেন। বাংলাদেশসহ এই ছয়টি দেশে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে অপেক্ষাকৃত বেশি।
গতকাল এ উপলক্ষে দুটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজন করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আর এতে সহায়তা করছে ব্লুমবাগ ফিলানথ্রোপিস। পরে সন্ধ্যায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ড. ক্যারোলিন বলেন, ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বিশ্বের প্রতিটি দেশে ঘটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর প্রতি সজাগ দৃষ্টিভঙ্গির অভাব রয়েছে। এত মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। এটি অবশ্যই রোধ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চায় ২০৩৫ সালের মধ্যে অন্তত ৩৫ শতাংশ মৃত্যু রোধ হোক।
ক্যারোলিন বলেন, বিশ্বের কিছু দেশে ডুবে মৃত্যু রোধে কিছু নীতি বা আইন আছে। কিন্তু বেশির ভাগ দেশেই নেই। আবার যেসব দেশে আছে সেগুলো কতটা কার্যকর সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ।
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আফ্রিকা অঞ্চলের প্রধান কফি মেনগাকা নিয়াকো বলেন, বিশ্বে ডুবে মৃত্যুর অনেক ঘটনাই অজানা থেকে যায়। মৃত্যু রোধে তাই শক্তিশালী একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি। অনেক দেশেই সেটা নেই। আফ্রিকার দেশগুলোতে ডুবে মৃত্যু একটি বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
গত বছর প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কৌশলপত্রে বলা হয়েছিল, ২০২১ সালে বিশ্বে তিন লাখের বেশি মানুষ ডুবে মারা গেছে। প্রতি চারজনের একজনের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। প্রায় অর্ধেকের বয়স ২৯ বছরের কম। বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি ডুবে মৃত্যু ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। এসব দেশের অনেকগুলোর জন্য এটি শুধু স্বাস্থ্য নয়, উন্নয়ন ও অর্থনীতিরও বড় সমস্যা। কোনো কোনো দেশে ডুবে মৃত্যুর অর্থনৈতিক ক্ষতি বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। শিশুদের নিরাপদ তত্ত্বাবধান, জলাশয়ের চারপাশে সুরক্ষা, সাঁতার ও জলনিরাপত্তা শিক্ষা, উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ এবং নৌযান নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রাণ বাঁচানো যায়।
২০০২ সালে প্রথমবার ডব্লিউএইচও ডুবে মৃত্যুকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশে মৃত্যু রোধে একটি প্রকল্প শুরু হয়। ২০১৪ সালে ডব্লিউএইচও প্রকাশ করে বিশ্বের ডুবে মৃত্যুর অবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন। ২০২১ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ প্রথমবার ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধবিষয়ক প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং ২৫ জুলাইকে বিশ্ব ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করে। ২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদও একই বিষয়ে পৃথক প্রস্তাব গ্রহণ করে।
বাংলাদেশে ডুবে মৃত্যু নিয়ে নির্ভুল এবং নিয়মিত প্রতিবেদনের অভাব রয়েছে বলে জাতিসংঘসহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একাধিক হিসাব অনুযায়ী দেশে ১৮ হাজারের বেশি মানুষের প্রতিবছর ডুবে মৃত্যু হয়। এর মধ্যে পাঁচ বছর বয়সী কম শিশুর সংখ্যা ১১ হাজার।
এর আগে গতকাল সকালের অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ভিয়েতনাম এবং উগান্ডার ডুবে মৃত্যু নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি পেঁজা ক্লিমেন্স বলেন, দেশটির ১১ অঙ্গরাজ্যে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটে। এর মধ্যে শীর্ষে আছে আলাস্কা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হঠাৎ করেই অতিবৃষ্টিপাত এবং এ জন্য বন্যার ফলে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে থাকে বেশি।
ভারতের চাইল্ড ইন নিড ইনস্টিটিউটের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মেঘেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ডুবে মৃত্যু যেন একটা ইস্যুই নয়। এত প্রাণ চলে গেলেও এটি রোধ করতে তেমন কোনো গুরুত্ব দেখা যায় না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকার প্রতিটি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ডুবে মৃত্যুর তথ্য চেয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর কথা, ডুবে মৃত্যুরোধে সরকার কিছুটা হলেও সজাগ হয়েছে এই উদ্যোগ থেকে সেটা বোঝা যায়।